ঝগড়ার মধ্য দিয়ে ক্যান্সার শনাক্তের অসাধারণ ঘটনা
দুই সপ্তাহ আগের একটি ঘটনা এখনো চিকিৎসক ফারহানার মনে গভীর রেখাপাত করেছে। হাসপাতালে চরম ব্যস্ততার মধ্যেও একদিন সকালে তিনি একটি কল পেলেন। ইমার্জেন্সি থেকে একজন চিকিৎসক তাকে জানালেন, ৪৮ বছর বয়সী এক রোগী বাসায় ফিরতে চাইছেন, কিন্তু সব ল্যাব টেস্টের ফল অস্বাভাবিক আসছে। ফারহানা রোগীকে দেখতে গেলেন।
অপ্রত্যাশিত অভিযোগ ও গম্ভীর পরিস্থিতি
রোগীর রুমে ঢুকেই ফারহানা দেখলেন, রোগী গম্ভীর ভঙ্গিতে বসে আছেন। তাঁর পাশে কান্নাকাটি করছেন তাঁর স্ত্রী। ফারহানাকে দেখে স্ত্রী মেরি বলে উঠলেন, “একটু দেখুন, কী হয়েছে ওর। আমাদের বিয়ে হয়েছে এতগুলো বছর, কোনো দিন এত বাজে ঝগড়া করেনি ও আমার সাথে।” ফারহানা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, শুধু ঝগড়ার জন্য কি হাসপাতালে নিয়ে এসেছেন? মেরি উত্তর দিলেন, “হ্যাঁ। আমরা হাইস্কুল সুইটহার্ট। বিয়ের পর থেকে সকালের কফি কোনো দিন নিজে বানিয়ে খাইনি। সবকিছু একসাথে করি। এক মাস আগেও কাজের তাড়ায় কফি না নিয়ে চলে যাচ্ছিলাম। রিয়ার ভিউ মিররে দেখি, খালি পায়ে ও দৌড়ে রাস্তা পর্যন্ত চলে এসেছে কফি হাতে। আর এই ফেব্রুয়ারি মাসের শুরুতে ও আমাকে প্রথম বকা দিল। বলল, ‘নিজের কফি নিজে বানিয়ে খাও। সব সময় এত অলসতা কেন করো?’” ফারহানা হাসি চেপে রাখতে পারলেন না।
চিকিৎসা পরীক্ষায় উদ্বেগজনক ফল
তারপর ফারহানা রোগীর মাথার সিটি স্ক্যানের অর্ডার দিলেন। স্ক্যানের ফল দেখে তিনি হতবাক হয়ে গেলেন। নাকের গভীরে একটি অস্বাভাবিক বৃদ্ধি দেখা গেল। সঙ্গে সঙ্গে তিনি বায়োপসির জন্য যোগাযোগ করলেন, কিন্তু নাকের অত্যন্ত গভীর ও বেকায়দা জায়গায় হওয়ায় বায়োপসি করা সম্ভব হলো না। ফারহানা রোগীকে বিষয়টি জানাতে গিয়ে দেখলেন, মেরি কাঁদছেন। রোগী বললেন, “মেরি, কেন যে এতটা ঝামেলা করে! ডাক্তার, আমাদের চলে যেতে দিন।” ফারহানা আরেকজন চিকিৎসকের মতামত নেওয়ার কথা বললেন।
অনকোলজিস্টের ভয়াবহ সতর্কবার্তা
ফারহানা তাঁর বন্ধু ও মেধাবী অনকোলজিস্টকে ফোন করলেন। তারা একসাথে সিটি স্ক্যান রিভিউ করলেন। অনকোলজিস্ট বললেন, “ফারহানা, ভীষণ অ্যাগ্রেসিভ একটা ক্যান্সার মনে হয়। আমরা খুব আর্লি স্টেজে ধরে ফেলেছি। দেখতে আসছি রোগীকে।” এরপর রোগীকে ভর্তি করা হলো। জরুরি ভিত্তিতে পুরো শরীর স্ক্যান করা হলো। পরের কয়েক দিন তিনি রেডিয়েশন ও কেমোথেরাপি পেলেন।
ভালোবাসা দিবসে আনন্দের মুহূর্ত
দুই সপ্তাহ পর ভ্যালেন্টাইনস ডের সকালে ফারহানা রোগীকে দেখতে গেলেন। রোগীকে ঝলমলে ও আনন্দিত অবস্থায় দেখে তিনি খুশি হলেন। কিছুক্ষণ পর মেরি নার্সের সাথে কথা-কাটাকাটি করতে করতে এলেন। ফারহানার দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, “দেখুন তো ডাক্তার, জীবনে এই প্রথম ভালোবাসা দিবসে আমার স্বামীর জন্য ফুল এনেছি। নার্স ফুল রুমের ভেতরে আনতে দেবে না।” কেমোথেরাপি নেওয়া রোগীদের ফুল, ফল বা সবজি দেওয়া যায় না বলে নার্স বাধা দিচ্ছিলেন। রোগী হাসছিলেন। ফারহানা বললেন, “আপনি তো ওনাকে সুস্থ করে বাসায় নিয়ে যেতে চান, তা-ই না?” মেরি সম্মতি জানালেন।
আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ও আশাবাদ
রোগী মজা করে বললেন, “তাহলে ডাক্তার, আপনার বাসায় নিয়ে যান না কেন!” মেরি চোখ মুছতে মুছতে বললেন, “নিয়ে যান বাসায়, ডাক্তার। আপনাকে ধন্যবাদ, আমার হাবিকে আগের মতো করে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য।” ফারহানা মনে মনে আল্লাহকে ধন্যবাদ জানালেন। তারপর হেসে বললেন, তাঁর বাসায় দুটো বিড়ালছানা আছে এবং অনেক ফুল তাদের জন্য ক্ষতিকর। তিনি রমজান আসার কথা উল্লেখ করে বললেন, “আমি আপনাদের জন্য মন খুলে দোয়া করব, আপনি সুস্থ হলেই আমার সবকিছু পাওয়া হবে।” ওরা দুজনই খুব হাসলেন। রোগীর রুম থেকে বের হয়ে ফারহানা দেখলেন, অপূর্ব কিছু ফুল সাজানো। ভালোবাসার রঙে রাঙানো সেই দৃশ্য তাঁকে গভীরভাবে স্পর্শ করল।
