উচ্চশিক্ষায় ওয়েলবিয়িং: বিশ্ব এগোচ্ছে, বাংলাদেশ কোথায়?
উচ্চশিক্ষায় ওয়েলবিয়িং: বিশ্ব এগোচ্ছে, আমরা কোথায়?

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা আজ এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি। একদিকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থী ভর্তির হার, গবেষণা কার্যক্রম এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন বৃদ্ধি পাচ্ছে; অন্যদিকে উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে মানসিক চাপ, হতাশা, আত্মহত্যার প্রবণতা, নৈতিক অবক্ষয় এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা। উচ্চশিক্ষার মূল লক্ষ্য কেবল দক্ষ জনশক্তি তৈরি নয়; বরং মানবিক, দায়িত্বশীল ও সুস্থ নাগরিক গড়ে তোলা। কিন্তু যদি একজন শিক্ষার্থী অ্যাকাডেমিক সাফল্য অর্জনের পরও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত থাকে কিংবা নৈতিক মূল্যবোধের সংকটে ভোগে, তাহলে সেই শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য কতটা পূরণ হচ্ছে—সে প্রশ্ন উঠতেই পারে।

ওয়েলবিয়িং ধারণার বিশ্বায়ন

এ প্রেক্ষাপটে বিশ্বব্যাপী ‘ওয়েলবিয়িং’ (Wellbeing) বা সার্বিক কল্যাণের ধারণা ক্রমেই গুরুত্ব পাচ্ছে। উন্নয়নের প্রচলিত সূচক হিসেবে দীর্ঘদিন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বা জিডিপিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হলেও বর্তমানে মানুষের জীবনমান, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা, মানসিক সুস্থতা এবং পরিবেশগত ভারসাম্যকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ কারণেই বিশ্বের অনেক দেশ উন্নয়ন পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে ওয়েলবিয়িং নীতিকে স্থান দিচ্ছে।

সরকারের ওয়েলবিয়িং নীতি মূলত এমন একটি দৃষ্টিভঙ্গি, যার লক্ষ্য নাগরিকদের শারীরিক, মানসিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক কল্যাণ নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ওয়েলবিয়িং বলতে কেবল অ্যাকাডেমিক সাফল্য নয়; বরং শিক্ষার্থীদের মানসিক সুস্থতা, নৈতিক বিকাশ, দেশপ্রেম, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং জীবনদক্ষতার বিকাশকেও বোঝায়।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

উচ্চশিক্ষায় নীরব সংকটের সতর্কবার্তা

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যা এবং নৈতিক অবক্ষয় বর্তমানে দুটি গুরুতর সামাজিক ও শিক্ষাগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। এগুলো শুধু ব্যক্তির জীবনের জন্য নয়, পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রের জন্যও গভীর উদ্বেগের কারণ।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

শিক্ষার্থীরা দেশের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব ও মানবসম্পদ। আত্মহত্যা একটি সম্ভাবনাময় জীবনের অকাল সমাপ্তি ঘটায় এবং জাতীয় উন্নয়নের জন্য মূল্যবান সম্পদের ক্ষতি করে। একই সঙ্গে এটি মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক সহায়তা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতার ঘাটতিরও ইঙ্গিত বহন করে।

অন্যদিকে নৈতিক অবক্ষয়ের ফলে পরীক্ষায় অসদুপায়, প্লেজিয়ারিজম, সহিংসতা, র্যাগিং, মাদকাসক্তি এবং শৃঙ্খলাভঙ্গের মতো সমস্যার বিস্তার ঘটে। সততা, দায়িত্ববোধ, সহমর্মিতা ও ন্যায়পরায়ণতার মতো মূল্যবোধ দুর্বল হয়ে পড়লে তার প্রভাব শুধু বিশ্ববিদ্যালয় নয়, পুরো সমাজেই পড়ে। একজন শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা যেমন পরিবার ও সহপাঠীদের গভীর মানসিক আঘাত দেয়, তেমনি নৈতিক অবক্ষয় সমাজে আস্থার সংকট সৃষ্টি করে।

উচ্চশিক্ষার লক্ষ্য কেবল জ্ঞান প্রদান নয়; বরং সৎ, দক্ষ ও দায়িত্বশীল নাগরিক তৈরি করা। ফলে আত্মহত্যা ও নৈতিক অবক্ষয়ের মতো প্রবণতা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার মৌলিক লক্ষ্য অর্জনের ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

ওয়েলবিয়িংভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয়: বৈশ্বিক বাস্তবতা

বর্তমানে উন্নত বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে কেবল উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়; বরং স্বাস্থ্য, মানসিক সুস্থতা, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের Okanagan Charter এবং Health Promoting University (HPU) ধারণা আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।

কানাডা উচ্চশিক্ষায় ওয়েলবিয়িং ধারণা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিশ্বের অন্যতম অগ্রগামী দেশ। বিশেষ করে ২০১৫ সালে ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলাম্বিয়ায় (UBC) প্রণীত Okanagan Charter বিশ্বব্যাপী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে স্বাস্থ্য ও কল্যাণকেন্দ্রিক নীতিমালা প্রণয়নের ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়। এ সনদে বিশ্ববিদ্যালয়কে কেবল জ্ঞানচর্চার প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়; বরং এমন একটি পরিবেশ হিসেবে দেখার আহ্বান জানানো হয়েছে, যেখানে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মচারীদের শারীরিক, মানসিক, সামাজিক এবং আবেগীয় সুস্থতা সমান গুরুত্ব পায়।

Okanagan Charter-এর মূল দর্শন হলো—স্বাস্থ্য ও কল্যাণকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা, গবেষণা, প্রশাসন এবং ক্যাম্পাস সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। এর আলোকে কানাডার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ, অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা পরিবেশ নিশ্চিতকরণ, স্বাস্থ্যকর জীবনধারার প্রসার এবং শিক্ষার্থীদের সার্বিক বিকাশে সহায়ক নীতিমালা গ্রহণ করেছে। ফলে ওয়েলবিয়িং এখন সেখানে কোনো অতিরিক্ত কর্মসূচি নয়; বরং বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা ও উন্নয়নের একটি মৌলিক দর্শনে পরিণত হয়েছে।

যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়ার উদ্যোগ

কানাডার পাশাপাশি যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও শিক্ষার্থীদের সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিত করতে উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। দেশটির Healthy Universities Network এবং Whole University Approach বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার প্রতিটি স্তরে স্বাস্থ্য, মানসিক সুস্থতা, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি এবং জনস্বাস্থ্যকে সংযুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেয়। শুধু নীতিমালা প্রণয়নেই সীমাবদ্ধ না থেকে নিয়মিত Wellbeing Audit-এর মাধ্যমে এসব উদ্যোগের কার্যকারিতা মূল্যায়ন ও তদারকির ব্যবস্থাও গড়ে তোলা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ওয়েলবিয়িংকে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছে। Wellbeing Policy, Tele-counselling এবং Diversity, Equity and Inclusion (DEI)-ভিত্তিক কর্মসূচির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য, সমতা, বৈচিত্র্য এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যকর ও সহায়ক ক্যাম্পাস সংস্কৃতি গড়ে তোলার ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

অস্ট্রেলিয়ায় Student Wellbeing Framework-এর আওতায় শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, ক্যারিয়ার উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের সহায়তা এবং স্বাস্থ্যসম্মত শিক্ষা পরিবেশ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সমন্বিত কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে। অন্যদিকে মালয়েশিয়া সরকারের MADANI দর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশটির বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মানসিক সুস্থতার পাশাপাশি নৈতিকতা, মূল্যবোধ, নাগরিক দায়িত্ববোধ, উদ্যোক্তা দক্ষতা এবং সামাজিক সম্পৃক্ততার বিষয়গুলোকে উচ্চশিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচনা করছে।

এছাড়া ফিনল্যান্ডসহ নর্ডিক দেশগুলোতে ওয়েলবিয়িং শিক্ষানীতির অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। সেখানে শিক্ষার্থীদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা, মনোসামাজিক সহায়তা, শিক্ষা ও ব্যক্তিগত জীবনের মধ্যে ভারসাম্য এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের এসব অভিজ্ঞতা একটি বিষয় স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে—আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাফল্য আর শুধু পাঠদান, গবেষণা বা সনদ প্রদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং শিক্ষার্থীদের শারীরিক, মানসিক, সামাজিক ও নৈতিক কল্যাণ নিশ্চিত করাও এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব।

ওয়েলবিয়িং সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার চ্যালেঞ্জ

ওয়েলবিয়িং নীতি বাস্তবায়নের জন্য শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়নই যথেষ্ট নয়; বরং বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি সামগ্রিক ওয়েলবিয়িং সংস্কৃতি গড়ে তোলাও জরুরি। প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মচারীদের মতামতের প্রতি সম্মান প্রদর্শন এই সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। একই সঙ্গে বৃত্তি, শিক্ষাঋণ, জরুরি সহায়তা তহবিল এবং ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং সেবার সম্প্রসারণও শিক্ষার্থীদের সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণাগত চ্যালেঞ্জও রয়েছে। মানসিক সুস্থতা, নৈতিকতা, সততা, দেশপ্রেম কিংবা সামাজিক দায়বদ্ধতার মতো বিষয়গুলোকে কীভাবে পরিমাপ করা যাবে? প্রচলিত শিক্ষা মূল্যায়ন পদ্ধতিতে এসব বিষয়কে পরিমাপ করা সহজ নয়। কিন্তু এও সত্য যে, বিদ্যমান শিক্ষা কাঠামো শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার প্রবণতা, মানসিক সংকট কিংবা নৈতিক অবক্ষয়ের মতো সমস্যাগুলো কার্যকরভাবে মোকাবিলা করতে পারছে না।

প্রবাদ আছে, ‘প্রয়োজনই আবিষ্কারের জননী’। অর্থাৎ যখন কোনো সমস্যা গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী হয়ে ওঠে, তখন তা সমাধানের জন্য নতুন ধারণা ও নতুন পথ অনুসন্ধান করা অপরিহার্য হয়ে পড়ে। সেই বিবেচনায় উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় ওয়েলবিয়িংকে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত বিষয় হিসেবে বিবেচনা করার সময় এসেছে।

প্রয়োজনে শিক্ষার্থীদের ‘ভালো থাকা’ বা Wellbeing-কে উচ্চশিক্ষার একটি নীতিসূচক (Policy Indicator) হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ‘Wellbeing Campus’ ধারণা বাস্তবায়নের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ এবং প্রয়োজনীয় বিষয়গুলোকে মূল পাঠ্যক্রমের সঙ্গে সংযুক্ত করার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। কারণ একবিংশ শতাব্দীর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাফল্য শুধু জ্ঞান বিতরণে নয়, বরং সুস্থ, মানবিক, নৈতিক ও দায়িত্বশীল নাগরিক গড়ে তোলার মধ্যেই নিহিত।

আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর করণীয়

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা থেকে স্পষ্ট যে, ওয়েলবিয়িং কোনো অতিরিক্ত বা বিচ্ছিন্ন কর্মসূচি নয়; বরং এটি আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার একটি অপরিহার্য দর্শনে পরিণত হয়েছে। এই বাস্তবতায় সরকারের ওয়েলবিয়িং (Wellbeing) নীতি বাস্তবায়নে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। শিক্ষা, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং সামাজিক সম্পৃক্ততার মাধ্যমে তারা এ নীতিকে কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে পারে।

প্রথমত, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য ও মনোসামাজিক সহায়তার বিষয়ে আরও গুরুত্ব দিতে হবে। এজন্য কাউন্সেলিং সেন্টার প্রতিষ্ঠা ও সম্প্রসারণ, মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক কর্মসূচি, স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট প্রশিক্ষণ এবং আত্মহত্যা প্রতিরোধ কার্যক্রমকে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর আওতায় আনতে হবে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে মানসিক চাপ, উদ্বেগ ও হতাশার প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়ায় বিষয়টি এখন আর উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

দ্বিতীয়ত, একটি স্বাস্থ্যকর ও সহায়ক ক্যাম্পাস পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব ক্যাম্পাস গড়ে তোলার পাশাপাশি খেলাধুলা, ব্যায়াম, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং সৃজনশীল চর্চায় শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়াতে হবে। কারণ শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা একে অপরের পরিপূরক।

তৃতীয়ত, উচ্চশিক্ষাকে আরও যুগোপযোগী ও কর্মমুখী করতে হবে। পাঠ্যক্রমে কর্মসংস্থানমুখী দক্ষতা, উদ্যোক্তা শিক্ষা, ডিজিটাল সক্ষমতা এবং বাস্তব জীবনের সমস্যা সমাধানভিত্তিক শিক্ষাকে অধিক গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতা অর্জনে সহায়তা করতে হবে।

চতুর্থত, জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ, সামাজিক উন্নয়ন, মানসিক স্বাস্থ্য এবং টেকসই উন্নয়নবিষয়ক গবেষণাকে উৎসাহিত করতে হবে এবং গবেষণার ফলাফলকে নীতিনির্ধারণ ও বাস্তব প্রয়োগের সঙ্গে সংযুক্ত করতে হবে। কেননা, ওয়েলবিয়িংভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয় গঠনে গবেষণা ও উদ্ভাবনের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

পঞ্চমত, নারী, প্রতিবন্ধী, আর্থিকভাবে অসচ্ছল এবং অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের জন্য সহায়ক ব্যবস্থা নিশ্চিত করে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। বৈষম্য, হয়রানি এবং বঞ্চনামুক্ত ক্যাম্পাস সংস্কৃতি ওয়েলবিয়িংয়ের অন্যতম পূর্বশর্ত।

এছাড়া টেকসই উন্নয়নের চর্চাকে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের অংশ করে তুলতে হবে। পরিবেশবান্ধব ক্যাম্পাস পরিচালনা, জ্বালানি সাশ্রয়, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। স্বেচ্ছাসেবামূলক কর্মকাণ্ডে শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ততাও সামাজিক দায়বদ্ধতা ও মানবিক মূল্যবোধ বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।

লেখক: উপাচার্য, বগুড়া বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়