অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক ৮২ বছর পেরিয়ে ৮৩-তে পা দিয়েছেন। জন্মদিনে প্রথম আলোর পক্ষ থেকে তাঁকে শুভেচ্ছা জানানো হলে তিনি নিজের অনুভূতি ও দেশের বর্তমান প্রসঙ্গে কথা বলেন। তিনি বলেছেন, জন্মদিনের আনুষ্ঠানিক আয়োজন তিনি পছন্দ করেন না, তবে ঘরোয়া আয়োজনে দেশ, জাতি, রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হবে। তাঁর সারাজীবনের লেখালেখির উদ্দেশ্য দেশ ও জনগণের কল্যাণ।
হতাশা নয়, সংকট মোকাবিলাই মানবতার কাজ
জীবন নিয়ে হতাশ না হওয়ার পরামর্শ দিয়ে অধ্যাপক হক বলেন, ইতিহাসে মানুষ বারবার সংকটে পড়েছে, কিন্তু সেগুলো অতিক্রম করেই এগিয়েছে। তাঁর মতে, সংকট কেটে গেলে নতুন সংকট আসে, আর সমস্যার সমাধান করাই মানুষের কাজ।
বিশ্ব সংঘাতের মূল কারণ মানবিকতার অভাব
বর্তমান বিশ্বের সংঘাত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রযুক্তির উন্নতিতে সম্পদ বেড়েছে, কিন্তু ন্যায্যতা নিশ্চিত না হওয়ায় সব মানুষ সম্মানজনকভাবে বাঁচতে পারছে না। তিনি শীতল যুদ্ধ শেষেও উপসাগরীয় যুদ্ধ, বসনিয়া, ইরাক, আফগানিস্তান, লিবিয়া ও ইউক্রেন যুদ্ধের কথা উল্লেখ করে বলেন, বৃহৎ শক্তিগুলো অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে শক্তিশালী হলেও মানবিক দিক থেকে অগ্রসর হয়নি। ইউক্রেন যুদ্ধে পশ্চিমাদের উসকানি ও পুতিনের পথ দুটোই ভুল বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বাংলাদেশের প্রধান সংকট রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক
বাংলাদেশের বর্তমান প্রধান সংকট প্রসঙ্গে অধ্যাপক হক বলেন, রাজনৈতিক সংকটই প্রধান, তবে সাংস্কৃতিক সংকটও রয়েছে। তিনি ১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় নির্বাচন ও ডাকসু নির্বাচনে কারচুপির ঘটনা তুলে ধরে বলেন, স্বাধীনতার পর থেকেই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সংহত করা যায়নি।
তরুণ নেতৃত্বের বিকল্প নেই
তরুণদের মধ্যে আশা দেখেন কি—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তরুণেরা বর্তমানে প্রবীণদের দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে, যাদের মধ্যে উন্নত রাজনৈতিক, সামাজিক বা সাংস্কৃতিক চরিত্র নেই। তিনি ষাটের দশকে তাঁর 'কালের যাত্রার ধ্বনি' পুস্তিকার কথা স্মরণ করে বলেন, সে সময় তরুণদের মধ্যে জাগরণ সৃষ্টি হয়েছিল। এখন তরুণরা জনসংখ্যার বড় অংশ, তাই তরুণ নেতৃত্ব সামনে এলে দেশের সম্ভাবনা তৈরি হবে এবং গণতন্ত্র সংহত হবে।
প্রবীণদের অভিজ্ঞতা, তরুণদের দায়িত্ব
তরুণদের নেতৃত্বে আসার সম্ভাবনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মানুষের গড় আয়ু বাড়ায় প্রবীণরাই মন্ত্রী হচ্ছেন, যা ভুল। তিনি ইয়ং বেঙ্গল ও তিরিশের দশকের বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের উদাহরণ দিয়ে বলেন, পরিবর্তনের জন্য তরুণ প্রজন্ম গড়ে ওঠা জরুরি।
আকবর আলি খানের সঙ্গে একমত
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আকবর আলি খানের বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করে তিনি বলেন, আকবর আলি খান স্বাধীনচেতা ও বিবেকসম্পন্ন মানুষ ছিলেন। তাঁর মতে, পুরোনো নেতৃত্বের পরিচালনায় তরুণেরা নতুন কিছু করতে পারবে না; তাদের স্বাধীনভাবে গড়ে উঠতে হবে, তবে প্রবীণদের অভিজ্ঞতা ও বইপত্র থেকে শিক্ষা নিতে পারে।
রাজনৈতিক সংকটের কারণ ও সমাধান
বর্তমান রাজনীতির সংকটের কারণ হিসেবে তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা ও যুক্তফ্রন্টের ২১ দফার মতো জনঘনিষ্ঠ কর্মসূচি আর দেওয়া হয়নি। নব্বইয়ের আন্দোলনও শহরকেন্দ্রিক ছিল এবং এতে জনগণের সমস্যার সমাধানের কর্মসূচি ছিল না। খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনার আমলেও একই ঘটনা পুনরাবৃত্তি হয়েছে। তিনি বিএনপির বর্তমান আন্দোলনকেও জনগণের সমস্যার সমাধানহীন বলে মন্তব্য করেন।



