যাদবপুরের প্রশ্নপত্র: সৃজনশীলতার মাপকাঠি বনাম যান্ত্রিক শিক্ষাব্যবস্থা
যাদবপুরের প্রশ্নপত্র: সৃজনশীলতার মাপকাঠি বনাম যান্ত্রিক শিক্ষা

সম্প্রতি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের স্নাতক প্রবেশিকা পরীক্ষার একটি প্রশ্নপত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। প্রশ্নপত্রটিতে ১০টি নিবন্ধের মধ্যে যেকোনো একটি উত্তর দেওয়ার নির্দেশনা ছিল, পাশাপাশি তিনটি বিষয়ে টীকা লেখা ও একটি উদ্ধৃতির ওপর নিজের ভাবনা জানানোর নির্দেশ ছিল। নিবন্ধের তালিকায় ছিল ‘সাহিত্যে-পড়া বা সিনেমায়-দেখা সবচেয়ে শক্তিশালী নারী-চরিত্র’, ‘তোমার ছোটবেলাকার ইচ্ছেগুলো, খামখেয়ালগুলো’, ‘পথের পাঁচালীর দুর্গার সঙ্গে তোমার এক কাল্পনিক ট্রেন-সফর’, ‘উত্তমকুমার বনাম সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়’, ‘প্রিয় সাহিত্যিকের উদ্দেশ্যে লেখা তোমার খোলা-চিঠি’, ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: সুখের কথা, ভয়ের কথা’, ‘যে-বইটি তোমার প্রিয়জনকে উপহার দিতে চাও’, ‘সাহিত্যিকের আড্ডা: বৈকুণ্ঠ মল্লিক, লালমোহন গাঙ্গুলী, সত্যজিৎ রায়’, ‘যে-জঙ্গল কেটে ফেলা হচ্ছে তার পাখিদের কথোপকথন’ এবং ‘ঈশ্বরকে যদি গুটিকয় প্রশ্ন করার সুযোগ পেতে’।

যাদবপুরের প্রশ্ন বনাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশ্ন

অনেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নের সঙ্গে যাদবপুরের প্রশ্নের তুলনা করে হাসিঠাট্টা করেছেন। কিন্তু এই তুলনা শিক্ষাব্যবস্থার একটি মৌলিক পার্থক্যকে সামনে এনেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় বাংলা বিষয়ে সন্ধি, কারক, বিভক্তি ইত্যাদি ভাষার খুঁটিনাটি বিষয়ের ওপর জোর দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে পরীক্ষার্থীর ভাষার বিশেষ শাখায় দক্ষতা মূল্যায়ন করা হয়। তবে এই পদ্ধতি শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নয়, বরং বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে ছোট ছোট দক্ষতা বা অণুদক্ষতার ওপর অধিক জোর দেওয়া হয়। ফলে শিক্ষার্থীরা সন্ধি-সমাস-কারক-বিভক্তি ভালোভাবে জানলেও শুদ্ধভাবে একটি বাংলা বাক্য লিখতে পারে না, সৃজনশীলভাবে মনের ভাব প্রকাশ তো দূরের কথা।

অন্যদিকে যাদবপুরের প্রশ্নে এই অণুদক্ষতা নিয়ে কোনো আগ্রহ নেই; বরং স্বীয় চিন্তনশক্তিকে কাজে লাগিয়ে স্বাধীনভাবে রচনাকে উৎসাহিত করা হয়েছে। সেখানে আগে থেকে মাথায় ভরে নিয়ে আসা তথ্য খাতায় ঢেলে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। ১টি প্রশ্নের জন্য ১০টি বিকল্প দেওয়া হয়েছে, যাতে কারও আগ্রহের ক্ষেত্র বাদ না পড়ে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সৃজনশীলতার অভাবে শিক্ষাব্যবস্থার সংকট

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে সৃজন ও উদ্ভাবন ছাড়া এগিয়ে যাওয়া আরও কঠিন হয়ে গেছে। যে ব্যক্তি শুধু একটি পড়ালেখার বৃত্তের বাইরে যায়নি, সে কখনো বহুমুখী বুদ্ধির দরজাগুলো চিনতে পারবে না। তাই শিক্ষাক্রম তৈরি, মূল্যায়নপদ্ধতি নির্ণয় ও শিক্ষাসামগ্রী প্রস্তুতিতে সৃজনশীল মানুষদের সংযুক্ত করা জরুরি। বর্তমানে আমরা প্রশ্ন সৃজনশীল করতে গিয়ে উত্তরগুলো যান্ত্রিক করে ফেলছি।

বাংলাদেশের যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন দেখলে শিক্ষার্থীর মনে অপরাধবোধ জাগ্রত হয়। প্রশ্ন পরীক্ষার্থীর চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় তার জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা। অন্যদিকে যাদবপুরের প্রশ্নে একজন শিক্ষার্থী স্বাভাবিক জীবনযাপনের অভিজ্ঞতা থেকেই যেকোনো একটি বিষয়ে অনায়াসে লিখতে পারে। তার মধ্যে অজ্ঞানতার অপরাধবোধ জাগ্রত হয় না। এই স্বাধীন লিখনের মাধ্যমেই একজন প্রকৃত জ্ঞাত ও সৃজনশীল ব্যক্তিকে চিহ্নিত করা সম্ভব।

শিক্ষায় ব্লুমের ট্যাক্সোনমির অপ্রয়োগ

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা এখনও ১৯৫৬ সালে বেঞ্জামিন ব্লুমের দেওয়া ট্যাক্সোনমির কাঠামোতে আবদ্ধ। ২০০১ সালে অ্যান্ডারসন এই কাঠামো পরিবর্তন করে সৃজনকে সর্বোচ্চ জ্ঞানীয় স্তর হিসেবে বিবেচনা করেন, যা সর্বমহলে স্বীকৃতিও পেয়েছে। এরপর মারজানো ও ফ্লিঙ্কের মতো শিক্ষাবিদেরা ব্লুমের কাঠামো নিয়ে অনেক কাজ করেছেন, কিন্তু সেসবের কোনো ছোঁয়া আমাদের শিক্ষায় লাগেনি।

সন্ধি-কারক-বিভক্তি না লিখে কোনো শিক্ষার্থী যদি একটি গান লিখে দেয় পরীক্ষার খাতায়, সেটা হবে শিক্ষার ইতিহাসে সবচেয়ে গর্হিত কাজ। কেউ সালোকসংশ্লেষণের প্রক্রিয়াটি না লিখে ছবি এঁকে দেখালে সে নিশ্চিত নিন্দিত হবে। আর গান, নাচ বা নাটিকার মাধ্যমে কিছু প্রকাশের সুযোগ নেই। আইনস্টাইন বেহালা হাতে ঘুরতেন; আমরা সেই বেহালা ছাড়াই ‘ই ইজ ইকুয়াল টু এমসি স্কয়ার’ চাই, যা সম্ভব নয়।

বহুমুখী বুদ্ধির গুরুত্ব

গার্ডনারের বহুমুখী বুদ্ধির তত্ত্ব অনুসারে মানুষের ৮ রকমের বুদ্ধিমত্তা থাকে (বর্তমানে ৯ রকম বলা হয়)। আমাদের শিক্ষায়তনগুলো লেখার ক্ষমতা ছাড়া অন্য সব বুদ্ধিমত্তাকে নিষ্ঠুরভাবে খারিজ করে দেয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে সৃজন ও উদ্ভাবন ছাড়া সামনে এগোনো কঠিন। তাই শিক্ষাক্রম, মূল্যায়নপদ্ধতি ও শিক্ষাসামগ্রী প্রস্তুতিতে সৃজনশীল মানুষদের সংযুক্ত করা জরুরি। এখন উত্তরে শিক্ষার্থীরা যেন সৃজনশীলতা দেখাতে ও বহুমুখী বুদ্ধির প্রয়োগ ঘটাতে পারে, সেই আয়োজন করা জরুরি।

জয়দীপ দে, সহকারী অধ্যাপক, সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ, কুমিল্লা। মতামত লেখকের নিজস্ব।