শাবিপ্রবিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা নিষিদ্ধ, শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ
শাবিপ্রবিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা নিষিদ্ধ

শাবিপ্রবিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে কঠোর নীতিমালা

সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয় এমন পোস্ট নিষিদ্ধ করেছে। সম্প্রতি প্রকাশিত বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৬ সালের ডায়েরিতে প্রক্টরিয়াল নীতিমালা অংশে এই নতুন নিয়ম যুক্ত করা হয়েছে। এর আগে সিন্ডিকেট সভায় এই নীতিমালা অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক সমালোচনা

গতকাল সোমবার বিকেলে বিষয়টি জানাজানি হলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ এই পদক্ষেপকে 'মুক্তমত দমন''ব্যক্তিগত স্বাধীনতা' হস্তক্ষেপ বলে অভিহিত করছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদে (শাকসু) সাধারণ সম্পাদক পদপ্রার্থী সাইফুর রহমান প্রশ্ন তুলেছেন, 'বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের প্রতি কোনো অন্যায় বা দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বললেও কিন্তু ভাবমূর্তি নষ্ট হবে, তাহলে যাঁরা এর প্রতিবাদ করবেন তাঁদের সবাইকে কি বহিষ্কার করবেন?'

নীতিমালার বিস্তারিত নির্দেশনা

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল নীতিমালায় শিক্ষার্থীদের প্রতি আবশ্যকীয় নির্দেশনাবলির ৯, ১০ ও ১২ নম্বর ধারায় স্পষ্ট বলা হয়েছে:

  • সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে কারও গঠনমূলক সমালোচনা করা যাবে
  • শব্দচয়নের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে
  • কাউকেই ব্যক্তিগত আক্রমণ করা যাবে না
  • শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে নিয়ে মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর তথ্য শেয়ার করা বা লেখার মাধ্যমে অপদস্থ করা যাবে না
  • বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয় এমন পোস্ট করা যাবে না

কেউ যদি এই নিয়ম ভঙ্গ করে তবে শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ও লোগো ব্যবহারে বিধিনিষেধ

অপরদিকে ওয়েবসাইটে কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ও লোগো ব্যবহার করে আইডি, পেজ বা ইউটিউব চ্যানেল পরিচালনা করার ক্ষেত্রেও নতুন নিয়ম চালু করা হয়েছে। প্রক্টরিয়াল বডির অনুমতিতে লোগো ও নাম ব্যবহার করে পেজ পরিচালনা করা যাবে, তবে পরিচালনাকারীদের নাম ও বিস্তারিত তথ্য প্রক্টরিয়াল বডির কাছে জমা দিতে হবে। একই সঙ্গে পেজ পরিচালনাকারী সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ শেষ হলে পরিচালনাকারী (অ্যাডমিন) হিসেবে থাকতে পারবেন না।

শিক্ষার্থীদের প্রতিক্রিয়া

ফেসবুকে বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা করে শাখা ছাত্রদল যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. আফফান লিখেছেন, 'সবই ঠিক আছে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের সমালোচনা করা যাবে না বা ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়—এমন কিছু লিখা যাবে না, এটা মানতে পারলাম না। এখানে প্রতিবাদ জানিয়ে রাখলাম।'

কেমিকৌশল ও পলিনার বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী রাশিদ আবরার আরও স্পষ্ট ভাষায় লিখেছেন, 'শিক্ষার্থীরা নিজের স্বাধীনতা মতো, ইচ্ছা মতো যা ইচ্ছা সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখবে। আপনারা ক্ষমতার চেয়ারে বসে যা ইচ্ছা তাই করবেন আর শিক্ষার্থীরা আপনাদের নম নম করবে, তা তো হবে না। শিক্ষার্থীরা যা ইচ্ছা লিখবে। যে কোনো অন্যায়, অসংগতি, দুর্নীতি, অবিচার সব কিছুর বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীরা কথা বলবে।'

প্রক্টরের ব্যাখ্যা

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর মোখলেসুর রহমান বলেন, 'শিক্ষার্থীরা যেভাবে বিষয়টি ভাবছে প্রকৃতপক্ষে তা নয়। ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার বিষয়টি মূলত শিক্ষার্থীরা যাতে গঠনমূলক সমালোচনা করে, ব্যক্তিগত আক্রমণ যেন না করে অর্থাৎ তাদের সমালোচনার শব্দচয়নে যেন সতর্ক থাকে। এটাই মূলত মেসেজ। আমরা ব্যক্তিস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করছি না। তবে যদি বিশ্ববিদ্যালয়ে দুর্নীতি বা অনিয়ম হয়, শিক্ষার্থীরা সমালোচনা করবে এটাই রীতি। এখানে কোনো বাধা নেই।'

নতুন নিয়ম পুনর্বিবেচনার সম্ভাবনা

নতুন নিয়ম সংস্কার বা পুনর্বিবেচনা করা হবে কি না—জানতে চাইলে প্রক্টর বলেন, 'নতুন নিয়ম নিয়ে শিক্ষার্থীদের আলোচনা আমরা পর্যবেক্ষণ করছি। এখনো এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।' এই মন্তব্য থেকে বোঝা যায়, শিক্ষার্থীদের ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নতুন এই নীতিমালা পুনর্বিবেচনা করতে পারে।

এই ঘটনা বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নিয়ে চলমান বিতর্কেরই একটি অংশ। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দাবি, তারা শুধুমাত্র গঠনমূলক সমালোচনার পরিবেশ নিশ্চিত করতে চাইছেন। অন্যদিকে শিক্ষার্থীরা মনে করছেন, এই নিয়ম তাদের মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে সীমিত করার চেষ্টা মাত্র।