সাংবাদিকতা শিক্ষার পথিকৃৎ অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খানের চিরবিদায়
বাংলাদেশে সাংবাদিকতা শিক্ষার অন্যতম পথিকৃৎ অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খান চিরনিদ্রায় শায়িত হয়েছেন। তিনি গতকাল রবিবার রাতে রাজধানী ঢাকার একটি হাসপাতালে ৮৫ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। কিছুদিন আগে স্ট্রোকের পর চিকিৎসা নেওয়া সত্ত্বেও তার স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটে, যা শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
দাফন ও জানাজা অনুষ্ঠান
সোমবার বেলা আড়াইটার দিকে নরসিংদীর শিবপুর উপজেলার মাছিমপুর ইউনিয়নের ধানুয়া গ্রামে নিজ বাড়িতে মা খালিকা আক্তারের কবরে তাকে দাফন করা হয়। এর আগে সেখানে দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে নরসিংদী জেলা বিএনপির সভাপতি ও সংসদ সদস্য খায়রুল কবির খোকন, জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও সংসদ সদস্য মনজুর এলাহী, বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল মান্নান খানসহ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ, আত্মীয়স্বজন ও শুভানুধ্যায়ীরা অংশ নেন।
প্রথম জানাজা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে
দাফনের আগে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে তার প্রথম জানাজা সম্পন্ন হয়। এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়াজ আহমেদ খানসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা। এরপর তার মরদেহ নরসিংদীর শিবপুরে নিয়ে যাওয়া হয়।
শোক প্রকাশ ও শ্রদ্ধা নিবেদন
জানাজায় অংশগ্রহণকারী নেতারা মরহুমের স্ত্রী সমাজকর্মী মালেকা খান, মেয়ে সুমনা শারমীন ও ছেলে নওশাদ আলী খানকে সমবেদনা জানান। সংসদ সদস্য খায়রুল কবির খোকন তার বক্তব্যে বলেন, "সাখাওয়াত আলী খান অত্যন্ত ভদ্র, বিনয়ী, গুণী একজন বুদ্ধিজীবী ছিলেন। তিনি ছিলেন নেতার নেতা, তা অনেকেই জানেন না। তার মেধা, প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতা খুবই কাছে থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে।"
আরেক সংসদ সদস্য মনজুর এলাহী দোয়া করেন, "আল্লাহপাক দুনিয়াতে সাখাওয়াত আলী খান স্যারকে যে সম্মান দিয়েছেন, আখিরাতে ওনাকে সে সম্মানটুকু দিন।" বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল মান্নান খান বলেন, "আমরা একজন অভিভাবক হারালাম। সক্রিয় রাজনীতি না করলেও তিনি ছিলেন বিচক্ষণ বামপন্থী রাজনৈতিক বিশ্লেষক। মুক্তিযুদ্ধের সময় তার এই বাড়ি আমাদের আশ্রয়স্থল ছিল।"
মরহুমের ছেলে নওশাদ আলী খান বলেন, "বাবা আমাদের ছায়া ছিলেন। যদি কারও মনে তিনি কষ্ট দিয়ে থাকেন, ক্ষমা করে দেবেন। তার জন্য দোয়া করবেন।"
জীবন ও কর্ম
সাখাওয়াত আলী খান ১৯৪১ সালে শিবপুর উপজেলার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। শিক্ষকতা পেশায় আসার আগে প্রায় এক দশক বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে সাংবাদিকতা করেছেন। ২০০৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে অবসরে যান এবং পরবর্তীতে পাঁচ বছর সংখ্যাতিরিক্ত অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মৃত্যুর আগপর্যন্ত তিনি বিভাগটির ‘অনারারি প্রফেসর’ ছিলেন।
তার উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপগুলোর মধ্যে রয়েছে:
- ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সাংবাদিকতা বিভাগের খণ্ডকালীন উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন।
- ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ (ইউল্যাব)-এর সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন হিসেবে কাজ করা।
- কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হওয়া।
- সোসাইটি ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট-এর চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন।
তার অসংখ্য মেধাবী শিক্ষার্থী তৈরি করেছেন, যারা দেশের সাংবাদিকতা ও শিক্ষা ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তার ক্ষুরধার লেখনী কলামিস্ট হিসেবে সমাদৃত ছিল, এবং তিনি পুরো বাংলাদেশের কৃতী সন্তান হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
