সাত সরকারি কলেজের আন্দোলন: উচ্চশিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নে কাঠামোগত সংকট
দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের কলেজ পর্যায়ে উচ্চশিক্ষার ঈপ্সিত মানোন্নয়ন কাঠামোগত দুর্বলতা ও প্রশাসনিক অদক্ষতার কারণে বাধাগ্রস্ত। নীতিনির্ধারণে অসামঞ্জস্যতা, অর্থায়নে বৈষম্য, মানবসম্পদের অপর্যাপ্ততা, একাডেমিক তত্ত্বাবধানের শৈথিল্য এবং সমন্বিত পরিকল্পনার অভাব—এসব উপাদান সম্মিলিতভাবে একটি স্থায়ী সংকটের জন্ম দিয়েছে। এই প্রাতিষ্ঠানিক ঘাটতির প্রথম দৃশ্যমান উপসর্গ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে রাজধানী ঢাকার সাতটি কলেজকে কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের আন্দোলন। প্রকৃতপক্ষে, এটি কেবল সাত কলেজের প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের দাবি নয়; বরং মানসম্মত প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা, একাডেমিক পরিবেশ, কার্যকর পরীক্ষার পদ্ধতি, সময়মতো ফল প্রকাশ, পর্যাপ্ত গবেষণার সুযোগ এবং স্বতন্ত্র একাডেমিক পরিচয়ের প্রত্যাশা থেকে উদ্ভূত একটি কাঠামোগত পুনর্গঠনের আকাঙ্ক্ষা।
শিক্ষকসংকট: একটি জাতীয় সমস্যা
রাজধানী ঢাকার ঐতিহ্যবাহী সাতটি সরকারি কলেজে প্রায় ১ লাখ ৩২ হাজার শিক্ষার্থীর বিপরীতে মাত্র ১ হাজার ১০০ শিক্ষক কর্মরত আছেন। শিক্ষক–শিক্ষার্থীর অনুপাত এখানে মারাত্মকভাবে ভারসাম্যহীন। উদাহরণস্বরূপ, ফেনী সরকারি কলেজে প্রায় ২২ হাজার শিক্ষার্থীর বিপরীতে শিক্ষক পদ মাত্র ৮৯টি, যার ফলে অনুপাত দাঁড়ায় ১:২৪৭। রাজধানীর বাইরে পরিস্থিতি ভিন্নতর নয়—বরিশালের ব্রজমোহন কলেজ, রংপুরের কারমাইকেল কলেজ, নোয়াখালী সরকারি কলেজ কিংবা সিলেটের মুরারিচাঁদ কলেজে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১৩ থেকে ২৭ হাজার, বিপরীতে শিক্ষকের সংখ্যা মাত্র ১০০ থেকে ১৮০।
ব্যানবেইসের রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০১৮ সালে কলেজগুলোয় শিক্ষক–শিক্ষার্থীর অনুপাত ছিল ১:৭৯, যা ২০২৪ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১:৯৭। জনবলসংকটের কারণে একজন শিক্ষককে ৬ থেকে ১০টি ভিন্ন ভিন্ন কোর্স পড়াতে হয়, যা প্রত্যাশিত মানের পাঠদানকে দুরূহ করে তোলে।
অর্থায়নের বৈষম্য: বিশ্ববিদ্যালয় বনাম কলেজ
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২২ সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত কলেজগুলোর শিক্ষার্থীপ্রতি গড় ব্যয় ছিল মাত্র ৭০২ টাকা, যা মাসিক হিসাবে আনুমানিক ৫৮ টাকার সামান্য অধিক। অপরদিকে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থীপ্রতি ব্যয়ের চিত্র একেবারেই ভিন্নতর। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীপ্রতি বার্ষিক ব্যয় সর্বোচ্চ ৪ লাখ ৬৬ হাজার টাকা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২ লাখ ১৮ হাজার ৫৫৭ টাকা, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ২ লাখ ১ হাজার ৭৭৮ টাকা এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩ লাখ ১৪ হাজার ৪৭৭ টাকা।
কলেজগুলোয় শিক্ষার্থীপ্রতি বরাদ্দের এই নিম্নমাত্রা উচ্চশিক্ষার গুণগত উৎকর্ষ, গবেষণার পরিসর, অবকাঠামোগত সক্ষমতা ও একাডেমিক উদ্ভাবনের ধারাবাহিকতাকে সীমাবদ্ধ করেছে। অতএব, কলেজগুলোর জন্য একটি সমন্বিত, প্রমাণভিত্তিক ও ন্যায়সংগত অর্থায়নের কাঠামো প্রণয়ন অনিবার্য।
ঐতিহাসিক সুপারিশ ও বর্তমান প্রাসঙ্গিকতা
কলেজ শিক্ষার মানোন্নয়নে ও জনবলসংকট কাটাতে ১৯৮৩–৮৪ সালে গঠিত এনাম কমিটি এবং ১৯৮৭ সালের সমীক্ষা কমিটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ প্রণয়ন করে। এনাম কমিটির সুপারিশমতে, কলেজের ধরনভেদে প্রতিটি বিষয়ে ১২ থেকে ১৬টি শিক্ষক পদের প্রস্তাব করা হয়। সমীক্ষা কমিটি কলেজগুলোকে এ, বি, সি ও ডি ক্যাটাগরিতে বিভক্ত করে প্রতিটি বিষয়ে শিক্ষক পদের সংখ্যা নির্ধারণ করে। ইংরেজি ও বাংলা বিষয়ের জন্য অতিরিক্ত প্রভাষক পদ এবং তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিষয়ের জন্য তিন থেকে সাতটি পদের প্রস্তাব করা হয়।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে, কলেজ পর্যায়ে উচ্চশিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করতে হলে এই সুপারিশকৃত স্টাফিং প্যাটার্ন অনুযায়ী শিক্ষকসংখ্যা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো কলেজে নির্দিষ্ট জনবলসংকট থাকলে, সেখানে অনার্স–মাস্টার্স না রাখাই শ্রেয়। জনবল বৃদ্ধি সময়সাপেক্ষ ও অর্থসংশ্লিষ্ট হওয়ায়, পাশাপাশি অবস্থিত কলেজগুলোর জনবল সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর চালু রাখা যেতে পারে।
সাত কলেজ আন্দোলন: একটি গভীরতর প্রতিফলন
সাত কলেজ আন্দোলনকে বিচ্ছিন্ন ঘটনাপ্রবাহ হিসেবে বিবেচনা না করে কলেজ পর্যায়ে উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার গভীরতর নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতার প্রতিফলন হিসেবে অনুধাবন করা অধিক যুক্তিসংগত। ২০১৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধিভুক্তির পর ফল প্রকাশ ও নিয়মিত পরীক্ষা নেওয়ার দাবিতে আন্দোলন শুরু হয়। পরবর্তীতে, লক্ষাধিক শিক্ষার্থীর অধিভুক্তির চাপে নুইয়ে পড়া প্রশাসনিক ব্যবস্থার কারণে শিক্ষার্থীরা ২০২৪ সালের শেষ দিকে ঢাবি অধিভুক্তি বাতিল করে স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবিতে রাজপথে নামেন।
একই সমস্যা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান অধিভুক্ত কলেজগুলোয়ও প্রকট। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যর্থতায় সাত কলেজ ঢাবি অধিভুক্ত করা হয়েছিল। কয়েক লক্ষাধিক শিক্ষার্থীর ভারে ভারাক্রান্ত জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ফি বাবদ উত্তোলিত অর্থ মানবসম্পদ উন্নয়ন, গবেষণা খাত বা অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যয় না করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেয়, যা অভিভাবকমহলে নেতিবাচক বার্তা দিয়েছে।
সমাধানের পথ: বিকেন্দ্রীকরণ ও প্রশাসনিক সংস্কার
বিরাজমান বৈষম্য নিরসন না হলে বিভাগীয় ও জেলা শহরের কলেজগুলোয় অদূর ভবিষ্যতে স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আন্দোলন শুরু হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। সে জন্য কলেজগুলোর অস্তিত্ব রক্ষায় প্রয়োজন সমন্বিত ও কার্যকর পরিকল্পনা। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আঞ্চলিক ক্যাম্পাসগুলোর নিষ্ক্রিয়তা কাটিয়ে উঠতে যথাযথ বিকেন্দ্রীকরণ অর্থাৎ বিভাগীয় পর্যায়ে কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এখন সময়ের দাবি।
কলেজ পর্যায়ের উচ্চশিক্ষা গতিশীল ও যুগোপযোগী করতে কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রশাসনিক পদগুলোয় শিক্ষা প্রশাসন পরিচালনার জন্য নিয়োগপ্রাপ্ত অভিজ্ঞ কলেজের শিক্ষকদেরই দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে। বিসিএস জেনারেল এডুকেশন অ্যাসোসিয়েশনের দাবি অনুযায়ী, ঢাকা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক পদগুলোয় বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডার থেকে পদায়নের বিষয়টি আমলে নেওয়া যেতে পারে। ইতিমধ্যে, ঢাকা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৪–২৫ সেশনের ভর্তি পরীক্ষা সফলভাবে পরিচালনা করে শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তারা নিজেদের সক্ষমতার জানান দিয়েছেন।
সাত কলেজকে নিতান্ত বাধ্য হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ফেরত নিতে হলে সাত কলেজের জন্য স্বতন্ত্র ভবন নির্মাণ করে সেখানে বিদ্যমান প্রশাসক নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থাপনার আদলে সরকারি কলেজ শিক্ষকদের সমন্বয়ে প্রশাসক, রেজিস্ট্রার, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকসহ স্বতন্ত্র ইউনিট গঠন করা যেতে পারে।
লেখক: সচিব তালুকদার ও মনিরুজ্জামান, শিক্ষক
