ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হত্যা মামলায় চার আসামি, স্বামীর অভিযোগে পরিকল্পিত হত্যার ইঙ্গিত
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আসমা সাদিয়া হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তাঁর স্বামী মুহা. ইমতিয়াজ সুলতান মামলা করেছেন। মামলায় চারজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, যাদের মধ্যে কর্মচারী ফজলুর রহমানকে ১ নম্বর আসামি করা হয়েছে। এ ছাড়া অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন দুই সহকর্মী শিক্ষক ও এক সহকারী রেজিস্ট্রার।
মামলার বিবরণ ও অভিযোগ
বুধবার দিবাগত রাতে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থানায় দায়ের করা মামলায় বাদী ইমতিয়াজ সুলতান অভিযোগ করেন, সমাজকল্যাণ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শ্যাম সুন্দর সরকার, হাবিবুর রহমান এবং সহকারী রেজিস্ট্রার বিশ্বজিৎ কুমার বিশ্বাসের দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা ও নির্দেশে খন্দকার ফজলুর রহমান আসমা সাদিয়াকে হত্যা করেছেন। মামলায় অজ্ঞাত ব্যক্তিদেরও আসামি করা হয়েছে, তবে তাদের সংখ্যা উল্লেখ করা হয়নি।
কুষ্টিয়া পুলিশের মুখপাত্র ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফয়সাল মাহমুদ প্রথম আলোকে নিশ্চিত করেছেন, ‘মামলায় চারজন আসামির নাম উল্লেখ করা হয়েছে। আসামিদের ধরতে ও আইনি পদক্ষেপ নিতে পুলিশ কাজ করছে।’
ঘটনার পটভূমি ও মামলার দাবি
গত বুধবার বিকেলে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজ দপ্তরে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাতে সমাজকল্যাণ বিভাগের সভাপতি ও সহকারী অধ্যাপক আসমা সাদিয়া রুনা নিহত হন। একই সময় রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের কর্মচারী ফজলুর রহমানকে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। তাঁকে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। বৃহস্পতিবার আসমার লাশ কুষ্টিয়া পৌর কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।
মামলায় বাদী উল্লেখ করেছেন, ২০১৮ সালে ফজলুর রহমান সমাজকল্যাণ বিভাগে নিয়োগ পান। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে আসমা সাদিয়া বিভাগের সভাপতি হওয়ার পর আগের সভাপতি শ্যাম সুন্দর হিসাব বুঝিয়ে দেননি। সহকারী রেজিস্ট্রার বিশ্বজিৎ কুমার আসমাকে বিভাগের টাকা অপব্যবহারের জন্য চাপ দেন, যা নিয়ে মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব শুরু হয়। ফজলুসহ তিনজন মিলে বিভাগের অর্থ আত্মসাৎ করতেন এবং আসমাকে হেনস্তা করতে থাকেন।
এসব ঘটনা সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন রোকসানা মিলিকে অবহিত করেন আসমা। পরে ফজলুরকে বদলি করা হয় এবং বিশ্বজিৎকেও গত ১৮ ফেব্রুয়ারি বদলি করা হয়। এর পর থেকে আসমাকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয় বলে মামলায় দাবি করা হয়েছে।
আহত ফজলুরের বক্তব্য ও অভিযুক্তদের প্রতিক্রিয়া
বুধবার দিবাগত রাতে ফজলুর রহমান সাড়া দিতে শুরু করেন। পুলিশ ও চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, তিনি লিখিত বক্তব্য দিতে পারছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বিভাগীয় প্রধান তাঁকে বদলি করায় এবং বেতন বন্ধ করে দেওয়ায় ক্ষোভ তৈরি হয়, যা থেকে হত্যার পরিকল্পনা করেন।
অভিযুক্ত সহকারী অধ্যাপক শ্যাম সুন্দর সরকার বলেন, ‘আমাদের এক সহকর্মী মারা গেছেন, এটা নিয়ে আমরা খুবই শোকাহত। তাঁর সঙ্গে আমাদের এমন কোনো খারাপ সম্পর্ক ছিল না যে আমরা হত্যার নির্দেশদাতা। বিষয়টি তদন্তাধীন।’ অন্যদিকে হাবিবুর রহমান জানান, তিনি সুষ্ঠু বিচার চান এবং নিজে জড়িত থাকলে শাস্তি চান।
ময়নাতদন্ত ও জানাজা
ময়নাতদন্তে আসমার শরীরে ২০টির বেশি আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের আরএমও হোসেন ইমাম বলেন, গলার নিচে সজোরে আঘাত করা হয়েছে, যা মৃত্যুর কারণ বলে ধারণা করা হচ্ছে। ধস্তাধস্তির চিহ্নও রয়েছে।
বৃহস্পতিবার জোহরের নামাজের পর কুষ্টিয়া ঈদগাহ মাঠে আসমার জানাজা হয়। সেখানে সংসদ সদস্য আমির হামজা, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নকীব মোহাম্মদ নসরুল্লাহসহ অনেকেই উপস্থিত ছিলেন। আসমার স্বামী ইমতিয়াজ সুলতান বলেন, ‘আমার স্ত্রী ছয় দিনের বাচ্চা রেখে সভাপতির দায়িত্ব নিয়েছিলেন। তাঁকে ক্ষমা করে দেবেন।’
শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ও দাবি
শিক্ষক আসমাকে হত্যার বিচারের দাবিতে বৃহস্পতিবার সকালে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা। তারা ৯ দফা দাবি জানান, যার মধ্যে রয়েছে:
- হত্যাকারীর ফাঁসি জনসমক্ষে অতি দ্রুত সময়ের মধ্যে নিশ্চিত করা
- হত্যার নেপথ্যের কেউ থাকলে জবাবদিহিতে এনে বিচার নিশ্চিত করা
- ক্যাম্পাস, হল ও ডিপার্টমেন্টে সিসি ক্যামেরা নিশ্চিত করা
- স্মার্ট আইডি কার্ড ছাড়া কাউকে ক্যাম্পাসে ঢুকতে না দেওয়া
- দৈনিক মজুরিভিত্তিক কর্মচারীদের আলাদা পোশাক ও ব্যাংক হিসাবে বেতন দেওয়া
- বিভাগীয় আয়-ব্যয়ের হিসাব পরিষ্কার রাখা
- কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জবাবদিহির আওতায় আনা
- ক্যাম্পাসে বহিরাগত ব্যক্তিদের ঢোকা নিষিদ্ধ করা
এই ঘটনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে, এবং পুলিশ তদন্ত জোরদার করেছে।
