দারিদ্র্যের মাঝে স্বপ্নের আলো: চরের মেধাবী পলাশের চিকিৎসক হওয়ার লড়াই
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার ঘোগাদহ ইউনিয়নের একটি চরে বাস করে মো. পারভেজ আহমেদ পলাশ। এই চরটি দুধকুমার ও ব্রহ্মপুত্র নদীর মাঝে জেগে ওঠা এক ভূখণ্ড, যেখানে চারদিকে জলরাশি আর দারিদ্র্যের লড়াইয়ের মাঝেও পলাশের চোখে এখন এক আকাশ সমান স্বপ্ন। সে সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী এবং চিকিৎসক হতে চায়, যাতে সেবা করতে পারে চরের অবহেলিত মানুষের।
অভাবের সংসারে স্বপ্নের জন্ম
পলাশের বাবা মো. সিদ্দিক আলী পেশায় একজন খেয়াঘাটের মাঝি। দুই নদীর মোহনায় নৌকা চালিয়ে যা আয় হয়, তা দিয়ে সংসার চালানোই যেখানে দায়, সেখানে সন্তানদের পড়াশোনা করানো ছিল এক দুঃসাধ্য কল্পনা। তার ওপর ঘরে বৃদ্ধ বাবা-মায়ের অসুস্থতা যেন মরার ওপর খাঁড়ার ঘা। অভাবের তাড়নায় একসময় ছেলের পড়াশোনার আশা ছেড়েই দিয়েছিলেন সিদ্দিক আলী।
কিন্তু ভাগ্যের চাকা ঘুরতে শুরু করে যখন পলাশ ভর্তি হয় প্রথম আলো চর আলোর পাঠশালায়। সেখানে বিনা মূল্যে মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ পলাশের সুপ্ত প্রতিভাকে জাগিয়ে তোলে। বর্তমানে সে এই বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী এবং তার স্বপ্নের পেছনে রয়েছে এক গল্প।
চিকিৎসক হওয়ার বাসনা ও প্রত্যয়
একদিন খেয়া পারাপার শেষে বাড়ি ফিরে সিদ্দিক আলী দেখেন, তার মা অসুস্থতায় কাতরাচ্ছেন আর পাশে বসে সেবা করছে ছোট ছেলে পলাশ। দাদির অসুস্থতার করুণ দৃশ্য ও বাবার অসহায়ত্ব দেখে ছোট্ট মনের মধ্যে চিকিৎসক হওয়ার বাসনা জন্মে। তখন থেকেই মনের ভেতর এই স্বপ্ন বিরাজ করছে পলাশের।
যেভাবেই হোক, ভালোভাবে পড়াশোনা করে চিকিৎসক হবে, চরের মানুষের সেবা করবে—এটাই পলাশের দৃঢ় প্রত্যয়। ছেলের মুখে এমন প্রত্যয় দেখে নতুন করে আশার আলো দেখতে পান মাঝি সিদ্দিক আলী। তিনি বলেন, ‘অভাবের সংসারে যেখানে দুবেলা ভাত জোটানো কঠিন, সেখানে ছেলে ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন দেখে—এটা ভাবলেই বুক ভরে যায়। চর আলোর পাঠশালা না থাকলে হয়তো এই স্বপ্ন অঙ্কুরেই শেষ হয়ে যেত।’
শিক্ষকদের সমর্থন ও পলাশের মেধা
পলাশের স্বপ্ন পূরণে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরাও। বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. হাবিবুর রহমান বলেন, ‘পলাশ অত্যন্ত মেধাবী এবং পরিশ্রমী। প্রতিকূল পরিবেশেও তার পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ আমাদের মুগ্ধ করে। আমরা শিক্ষকরা সাধ্যমতো চেষ্টা করছি যাতে তার লক্ষ্য পূরণ হয়।’
চর আলোর পাঠশালা শুধু পলাশকেই নয়, আরও অনেক দরিদ্র শিশুকে বিনা মূল্যে শিক্ষার সুযোগ দিয়ে তাদের স্বপ্ন দেখার সাহস জোগাচ্ছে। এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পলাশের মতো শিক্ষার্থীরা দারিদ্র্যের বেড়াজাল ভেঙে এগিয়ে যাচ্ছে নিজেদের লক্ষ্যের দিকে।
পলাশের গল্প শুধু একটি ব্যক্তির সংগ্রাম নয়, এটি দারিদ্র্যের মাঝেও শিক্ষার আলো ছড়ানোর একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। চরের এই মেধাবী ছাত্রের স্বপ্ন পূরণে পরিবার, শিক্ষক ও সমাজের সমর্থন জরুরি, যাতে সে একদিন সত্যিই চিকিৎসক হয়ে সেবা করতে পারে তার চরের মানুষদের।
