বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে সহপাঠীর ব্যক্তিগত ছবি-ভিডিও ধারণের অভিযোগ, উত্তেজনা ও তদন্ত
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন বিভাগের এক শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে সহপাঠী নারী শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত ছবি ও ভিডিও ধারণের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ ও উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। বুধবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিলের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা তাদের প্রতিবাদ জানিয়েছে।
অভিযোগ ও তদন্ত কমিটি গঠন
বুধবার দুপুরে সাধারণ শিক্ষার্থী ও সনাতন ধর্মাবলম্বী ছাত্রীদের পক্ষ থেকে পৃথক দুটি লিখিত অভিযোগ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, ওই শিক্ষার্থী দীর্ঘদিন ধরে সহপাঠী নারী শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত ছবি নিজের ডিভাইসে সংরক্ষণ করে আসছিলেন। সম্প্রতি তাঁর মুঠোফোন জব্দ করে সেখানে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন শিক্ষার্থীর আপত্তিকর ছবি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে সম্পাদিত ছবি ও ভিডিও পাওয়া গেছে।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, এসব ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তে পারে, যা তাদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ও নিরাপত্তাহীনতায় ফেলেছে। তাঁদের মতে, বিষয়টি শুধু ব্যক্তিগত গোপনীয়তার লঙ্ঘন নয়; বরং এর সঙ্গে কোনো সংগঠিত চক্র জড়িত থাকতে পারে—এমন সন্দেহও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। প্রক্টর রাহাত হোসাইন ফয়সাল ভিডিও কলে শিক্ষার্থীদের জানিয়েছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌন নিপীড়নবিরোধী সেলকে তিন দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি অভিযুক্ত শিক্ষার্থী ছবি বা ভিডিও অন্য কোথাও ছড়িয়েছেন কি না এবং কোনো চক্রের সঙ্গে যুক্ত আছেন কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে। প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়াও গ্রহণ করা হবে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।
শিক্ষার্থীদের প্রতিক্রিয়া ও বিক্ষোভ
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সনাতন ধর্মাবলম্বী এক ছাত্রী বলেন, পূজার সময় বিভিন্ন সাংগঠনিক কাজে একসঙ্গে থাকতে হয়। ফলে ব্যক্তিগত ও দলীয় অনেক ছবি তাঁর ফোনে থাকতে পারে। সেসব ছবি বিকৃত বা অপব্যবহার করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে তাঁরা উদ্বিগ্ন। তিনি নিরপেক্ষ তদন্ত ও দোষী প্রমাণিত হলে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
রসায়ন বিভাগের শিক্ষার্থী মো. মিরাজ জানান, গতকাল মঙ্গলবার রাতে অভিযুক্ত শিক্ষার্থী অনুমতি ছাড়া তাঁর এক নারী সহপাঠীর কিছু আপত্তিকর ছবি ধারণ করেন। বিষয়টি টের পেয়ে ওই শিক্ষার্থী তাঁর ফোন পরীক্ষা করেন। তখন অভিযুক্তের ফোনে আরও অনেকের আপত্তিকর ছবি পাওয়া যায়। খবরটি ছড়িয়ে পড়লে একই ব্যাচের অন্য শিক্ষার্থীরা জড়ো হন এবং তাঁরাও ফোনে সংরক্ষিত ছবিগুলো দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। পরে অভিযুক্তকে আটকে রেখে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল টিম ও বিভাগের শিক্ষকদের খবর দেওয়া হয়। শিক্ষকদের উপস্থিতিতে রাতেই করণীয় নিয়ে আলোচনা হয়। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর অভিভাবককে বিষয়টি জানায়।
বুধবার সকাল থেকে বিভাগের শিক্ষার্থীরা এ ঘটনার প্রতিবাদে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের নিচতলায় মানববন্ধনে সাধারণ শিক্ষার্থীরা অংশ নেন। এ সময় তাঁদের হাতে ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানিকারীর ঠাঁই নাই’, ‘ধর্ষকদের সনদ বাতিল করতে হবে’, ‘যৌন হয়রানির বিচার চাই’ স্লোগান লেখা প্ল্যাকার্ড দেখা যায়।
কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়া
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক তৌফিক আলম প্রথম আলোকে বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। প্রক্টরিয়াল বডি তদন্ত চালাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, সাইবার–সংক্রান্ত কারিগরি সীমাবদ্ধতার কারণে প্রয়োজন হলে বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হবে।
এ ঘটনা বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা রক্ষার বিষয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। কর্তৃপক্ষের দ্রুত ও কার্যকরী পদক্ষেপের দাবি জানাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
