নরফোক-১৭: বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে এক সাহসী যুদ্ধের ইতিহাস
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া প্রদেশের নরফোক শহরটি আটলান্টিকের কোল ঘেঁষে গড়ে উঠেছে। এই ছোট শহরটি ইতিহাসের নানা অধ্যায়ের সাক্ষী। শহরের নীতি ও কর্মপন্থা বোঝার জন্য তার ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংগ্রাম ও সাফল্য জানা অত্যন্ত জরুরি। এমনই একটি গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস হলো নরফোক-১৭।
বর্ণবৈষম্যমূলক শিক্ষাব্যবস্থার পটভূমি
১৯৫৪ সালের আগে যুক্তরাষ্ট্রে কৃষ্ণাঙ্গ ছাত্রছাত্রীরা শ্বেতাঙ্গদের স্কুলে ভর্তি হতে পারত না। শুধুমাত্র বর্ণের ভিত্তিতে পৃথক স্কুলব্যবস্থা চালু ছিল। কৃষ্ণাঙ্গদের স্কুলগুলোর জন্য বরাদ্দ অর্থ ছিল অপ্রতুল, ফলে ভালো শিক্ষক ও শিক্ষার উপকরণের অভাব ছিল প্রকট। ১৯৫৪ সালে ব্রাউন বনাম শিক্ষা বোর্ড বিধি পাস হওয়ার পর সুপ্রিম কোর্ট এই বর্ণবৈষম্যমূলক ব্যবস্থা বন্ধের পক্ষে রায় দেয়। কিন্তু এর ফলে বর্ণবাদী শ্বেতাঙ্গদের তীব্র প্রতিবাদ শুরু হয়।
স্ট্যানলি প্ল্যান ও স্কুল বন্ধের সিদ্ধান্ত
ভার্জিনিয়ার তৎকালীন গভর্নর থমাস স্ট্যানলি ১৯৫৬ সালে বর্ণবাদী জনতার পক্ষ নিয়ে স্ট্যানলি প্ল্যান পাস করেন। এই পরিকল্পনার মূল বার্তা ছিল যে, যেসব স্কুল বর্ণবৈষম্য বন্ধের উদ্যোগ নেবে, তাদের জন্য প্রদেশের অর্থায়ন বন্ধ করা হবে। তবে ইউএস সিনেটর হ্যারি বার্ড ও নরফোকের মেয়র কেভিন ডাকওয়ার্থের মতো রাজনীতিবিদরা পাল্টা পদক্ষেপ নেন। স্কুল বোর্ড শেষ পর্যন্ত কৃষ্ণাঙ্গ শিক্ষার্থীদের প্রবেশ ঠেকাতে না পেরে ১৯৫৮ সালে পুরো স্কুল সিস্টেম বন্ধ করে দেয়। প্রায় ১০ হাজার শিক্ষার্থী ক্লাসরুম থেকে ছিটকে পড়ে এবং অনেকে শিক্ষা সম্পন্ন না করেই কাজে যোগ দেয়।
প্রবেশন পরীক্ষার প্রহসন ও ১৭ শিক্ষার্থীর ভর্তি
১৯৫৯ সালে সুপ্রিম কোর্ট স্কুল বন্ধ করাকে সংবিধানবিরোধী ঘোষণা করলে স্কুল খুলতে শুরু করে। কিন্তু নরফোক স্কুল বোর্ড একটি নতুন কৌশল আঁটে। তারা ঘোষণা করে যে ভর্তির জন্য শিক্ষার্থীদের একটি প্রবেশন পরীক্ষায় পাস করতে হবে। এই পরীক্ষা ছিল কৃষ্ণাঙ্গ শিক্ষার্থীদের প্রতিহত করার একটি চতুর প্রচেষ্টা। তবুও ১৭ জন কৃষ্ণাঙ্গ শিক্ষার্থী ১৯৫৯ সালে নরফোক পাবলিক স্কুল সিস্টেমে ভর্তির সুযোগ পায়।
অসহযোগিতা ও মানসিক সংগ্রাম
এই ১৭ জন শিক্ষার্থী, যাদের বয়স ছিল ১২ থেকে ১৬ বছর, তারা ভয়ানক অসহযোগিতা, অসম্মান, বুলিং ও হুমকির মুখোমুখি হন। অনেকে শারীরিক আক্রমণেরও শিকার হন। পরবর্তী সাক্ষাৎকারে জানা যায়, তাদের প্রায় সবাই দীর্ঘস্থায়ী মানসিক সমস্যায় ভুগেছেন। কিন্তু তারা কেউই ফিরে যাওয়ার কথা ভাবেননি। তাদের জন্য এটি ছিল একটি মরণপণ যুদ্ধ, যেখানে জয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
ইতিহাসের প্রাসঙ্গিকতা ও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট
এই সংগ্রাম ভবিষ্যতের অসংখ্য কৃষ্ণাঙ্গ শিক্ষার্থীর পথ সুগম করেছে। আজ নরফোকে প্রায় ৫৬ শতাংশ কৃষ্ণাঙ্গ শিক্ষার্থী মর্যাদার সঙ্গে পড়াশোনা করছেন। এই ইতিহাস বাংলাদেশের জন্যও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। দাঙ্গাবাজ জনতার দাবি মেনে নেওয়া বা চতুর কৌশলে বৈষম্য টিকিয়ে রাখার প্রবণতা এখনও চলমান। যেমন, নারীদের কর্মঘণ্টা কমানোর প্রস্তাব ১৯৫৯ সালের প্রবেশন পরীক্ষার মতোই একটি কৌশল, যা নারীদের কর্মক্ষেত্রে প্রবেশকে কঠিন করে তোলে।
২০২৬ সালেও নীতিনির্ধারণের ফাঁকফোকর চিহ্নিত করা জরুরি। ইতিহাস প্রমাণ করে যে ন্যায়বিচার সহজে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। অনেকের সংগ্রাম, আত্মত্যাগ ও সাহসের বিনিময়ে অধিকার অর্জিত হয়েছে। আমাদের উচিত ছলচাতুরির ফাঁদে পড়ে এসব অধিকার হারানো থেকে সতর্ক থাকা।
