গাজা গণহত্যায় জড়িত কোম্পানিতে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গোপন বিনিয়োগের অভিযোগ
কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশাল এনডাউমেন্ট ফান্ড থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ ইসরাইলি মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে জড়িত বিতর্কিত কোম্পানিতে বিনিয়োগ করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। মার্কিন সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের কাছে জমা দেওয়া সাম্প্রতিক নথিপত্র বিশ্লেষণ করে সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছে।
বিনিয়োগের বিস্তারিত তথ্য
কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি ইনভেস্টমেন্ট ম্যানেজমেন্ট গত বছরের শেষ প্রান্তিকে 'আইশেয়ারস ইএসজি সিলেক্ট স্ক্রিনড এসঅ্যান্ডপি ৫০০' নামক একটি তহবিলে ১৪ কোটি পাউন্ডেরও বেশি অর্থ বিনিয়োগ করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪২০ কোটি পাউন্ডের এনডাউমেন্ট ফান্ড থেকে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করা হয়েছে।
এই তহবিলের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়টি পরোক্ষভাবে পালানতির টেকনোলজিস, ক্যাটারপিলার এবং জিই অ্যারোস্পেসের মতো কোম্পানির শেয়ারের মালিক হয়েছে। এই কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে গাজায় ইসরাইলি সামরিক অভিযান এবং ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে অবৈধ উচ্ছেদে সহায়তার গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।
নির্দিষ্ট কোম্পানিগুলোর ভূমিকা
- পালানতির টেকনোলজিস: কেমব্রিজ বর্তমানে এই মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৮ লাখ পাউন্ড সমমূল্যের শেয়ারের মালিক। এই প্রতিষ্ঠানটি ইসরাইলি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কৌশলগত অংশীদার এবং তাদের সফটওয়্যার লেবাননে ইসরাইলি পেজার হামলার মতো বিতর্কিত অভিযানে ব্যবহৃত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
- জিই অ্যারোস্পেস: ৯ লাখ পাউন্ডের শেয়ারের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়টি পরোক্ষভাবে ইসরাইলি বিমান বাহিনীর যুদ্ধবিমানের ইঞ্জিনের যোগানদাতা হিসেবে যুক্ত হয়েছে।
- ক্যাটারপিলার: এই কোম্পানির শেয়ারের মাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের ঘরবাড়ি ধ্বংসের কাজে ব্যবহৃত বুলডোজার প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক যোগসূত্র তৈরি হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিক্রিয়া ও বিতর্ক
দীর্ঘ সময় ধরে গোপনীয়তার অজুহাতে বিনিয়োগের তথ্য প্রকাশ করতে অস্বীকৃতি জানানোর পর এই নথিপত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের নৈতিক অবস্থান নিয়ে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। গত মাসেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৯ জন জ্যেষ্ঠ একাডেমিক কর্তৃপক্ষকে বিনিয়োগের তথ্য লুকানোর জন্য 'সর্বোচ্চ পর্যায়ের অস্পষ্টতা' তৈরির দায়ে অভিযুক্ত করা হয়েছিল।
এর আগে ২০২৪ সালে শিক্ষার্থীরা ফিলিস্তিনের সমর্থনে ক্যাম্পাসে অবস্থান ধর্মঘট পালন করলে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাদের বিনিয়োগ নীতি পর্যালোচনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। তবে রিভিউ কমিটি দাবি করেছিল যে অস্ত্র ব্যবসায় তাদের কোনো সরাসরি বিনিয়োগ নেই। বর্তমান এই তথ্য সেই দাবিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
কাউন্সিলের অবস্থান ও নৈতিক চাপ
কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি কাউন্সিল বারবার অস্ত্র উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান থেকে বিনিয়োগ প্রত্যাহারের বিষয়ে ভোট পিছিয়ে দিচ্ছে। কাউন্সিলের সদস্যরা যুক্তি দিচ্ছেন যে থার্ড-পার্টি ফান্ড ম্যানেজারের মাধ্যমে বিনিয়োগ করার কারণে নির্দিষ্ট কোম্পানি থেকে অর্থ সরিয়ে নেওয়া টেকনিক্যালি জটিল।
তবে নরওয়ের সার্বভৌম তহবিল যেখানে মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে ক্যাটারপিলার থেকে বিনিয়োগ সরিয়ে নিয়েছে, সেখানে কেমব্রিজের মতো স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের এমন বিনিয়োগ বজায় রাখা নিয়ে নৈতিক ও আইনি চাপ ক্রমেই বাড়ছে। এই বিনিয়োগের বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের নৈতিক অবস্থান এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।
