মধ্যপ্রদেশে আদিবাসী নেতাদের নামাঙ্কিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষকশূন্য, হাজার হাজার শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত
ভারতের মধ্যপ্রদেশ রাজ্যে উচ্চশিক্ষার এক চরম নাজুক চিত্র সামনে এসেছে, যেখানে নির্বাচনের মৌসুমে আদিবাসী নেতাদের নামে বড় বড় তোরণ ও ব্যানার সাজানো হলেও তাদের নামাঙ্কিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন শিক্ষকশূন্য অবস্থায় ধুঁকছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই সংকট হাজার হাজার শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তুলেছে।
খড়গোনের ক্রান্তিসুর্য তান্তিয়া ভিল বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৫ হাজার শিক্ষার্থী, কিন্তু স্থায়ী শিক্ষক শূন্য
খড়গোন জেলার ক্রান্তিসুর্য তান্তিয়া ভিল বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ২৫ হাজার শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত থাকলেও সেখানে কোনও স্থায়ী শিক্ষক নেই। রাজ্য বিধানসভায় উচ্চশিক্ষা মন্ত্রী ইন্দর সিং পারমারের দেওয়া লিখিত তথ্য থেকে জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়টিতে অনুমোদিত ১৪০টি পদের সব কটিই বর্তমানে শূন্য অবস্থায় রয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, তান্তিয়া ভিল বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক পদে ২০টি, সহযোগী অধ্যাপক পদে ৪০টি এবং সহকারী অধ্যাপক পদে ৮০টি পদ থাকলেও কোনোটিতেই নিয়োগ হয়নি। বর্তমানে কৃষি, কলা, বাণিজ্য ও বিজ্ঞান বিভাগের স্নাতক এবং বাণিজ্যের স্নাতকোত্তর কোর্সগুলো চলছে কেবল প্রেষণে আসা কর্মকর্তা বা অস্থায়ী ব্যবস্থার মাধ্যমে। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়টির নিজস্ব কোনও স্থায়ী ভবনও নেই, যা শিক্ষার পরিবেশকে আরও জটিল করে তুলেছে।
ছিন্দওয়ারার রাজা শঙ্কর শাহ বিশ্ববিদ্যালয়েরও একই অবস্থা
কেবল খড়গোন নয়, ছিন্দওয়ারা জেলার রাজা শঙ্কর শাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থাও তথৈবচ। আদিবাসী নেতার নামে গড়া এই প্রতিষ্ঠানের ১০০টি শিক্ষক পদের সব কটিই খালি। প্রথম বর্ষের বিটেক শিক্ষার্থী বিশ্বজিৎ পাল জানান, নিয়মিত ক্লাস হচ্ছে না এবং অনেক বিষয় পড়ানোই হচ্ছে না। আরেক শিক্ষার্থী যশ পাওয়ার বলেন, বিষয়ের তুলনায় শিক্ষকের সংখ্যা এতটাই কম যে মাত্র দুইজন শিক্ষক পুরো চাপ সামলাচ্ছেন, যা শিক্ষার গুণগত মানকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করছে।
রাজ্যের ১৭টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭৪% সহকারী অধ্যাপক পদ খালি
রাজ্য সরকারের দেওয়া তথ্যমতে, মধ্যপ্রদেশের ১৭টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০৬৯টি সহকারী অধ্যাপক পদের মধ্যে ৭৯৩টিই খালি। অর্থাৎ, ৭৪ শতাংশ পদই পূরণ করা হয়নি। এর মধ্যে পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়ে একজনও সহকারী অধ্যাপক নেই। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হলো:
- রাজা শঙ্কর শাহ বিশ্ববিদ্যালয় (ছিন্দওয়ারা)
- ক্রান্তিবীর তান্তিয়া টোপে বিশ্ববিদ্যালয় (গুনা)
- ক্রান্তিসুর্য তান্তিয়া ভিল বিশ্ববিদ্যালয় (খড়গোন)
- মহারাজা ছত্রসাল বুন্দেলখণ্ড বিশ্ববিদ্যালয় (ছাতারপুর)
- রানী অবন্তীবাই লোধি বিশ্ববিদ্যালয় (সাগর)
রাজনৈতিক গুরুত্ব সত্ত্বেও শিক্ষায় চরম অবহেলা
মধ্যপ্রদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২২ শতাংশ আদিবাসী। রাজ্যের ২৩০টি বিধানসভা আসনের মধ্যে ৪৭টি আদিবাসীদের জন্য সংরক্ষিত। ফলে আদিবাসী বীরদের নামে এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়া রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও শিক্ষার গুণগত মান রক্ষায় সরকারের চরম অবহেলার অভিযোগ রয়েছে। কংগ্রেস বিধায়ক ড. ঝুমা সোলাঙ্কির এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী এই তথ্য স্বীকার করেছেন। সোলাঙ্কি অভিযোগ করেছেন, শিক্ষক ও প্রশাসনিক কাঠামোর অভাবে পরীক্ষা সময়মতো হচ্ছে না, ফলাফল প্রকাশে বিলম্ব হচ্ছে এবং অনেক সময় মার্কশিট না পাওয়ায় শিক্ষার্থীরা বৃত্তি থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে।
নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বিলম্ব ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা
যদিও উচ্চশিক্ষা মন্ত্রী ইন্দর সিং পারমার দাবি করেছেন, আগামী ৪-৫ মাসের মধ্যে নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ হবে এবং নতুন ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হবে। তবে রাজা শঙ্কর শাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ইন্দ্র প্রসাদ ত্রিপাঠী জানিয়েছেন, নিয়োগের জন্য ২০২৭ সাল পর্যন্ত লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে এবং সাক্ষাৎকার শুরু হতে পারে ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে। এই বিলম্ব শিক্ষার্থীদের জন্য আরও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভারতের নতুন জাতীয় শিক্ষানীতি (এনইপি) বাস্তবায়নে মধ্যপ্রদেশ শীর্ষস্থানে থাকার দাবি করলেও, বাস্তবে স্থায়ী শিক্ষক আর সঠিক পরিকাঠামোর অভাবে হাজার হাজার শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত। এই সংকট কাটাতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া না হলে রাজ্যের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা আরও সংকটাপন্ন হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন।
