আইনস্টাইনের শিক্ষকতা জীবন: পেটেন্ট অফিস থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে উত্তরণের গল্প
১৯০৫ সালে সেই ঐতিহাসিক চারটি গবেষণাপত্র প্রকাশের পর কেটে গেছে বেশ কয়েক বছর। আলবার্ট আইনস্টাইন তখনো সুইজারল্যান্ডের পেটেন্ট অফিসের সেই চেয়ার-টেবিলেই বন্দী। কিন্তু বাইরের বৈজ্ঞানিক মহল তখন তাঁর প্রতিভা নিয়ে ফিসফাস শুরু করেছে। বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারছিলেন, এক অসামান্য মেধার জন্ম হয়েছে। এমন হিরের টুকরোকে কি আর কেরানির চাকরিতে আটকে রাখা যায়? তাঁকে তো থাকতে হবে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হিসেবে, গবেষণাগারে!
প্রাইভেটডোজেন্ট থেকে সহযোগী অধ্যাপক
অবশেষে ১৯০৮ সালে ডাক এল বার্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। তবে সরাসরি অধ্যাপক হিসেবে নয়, তিনি প্রাইভেটডোজেন্ট বা অবৈতনিক শিক্ষক হিসেবে যোগ দিলেন। এই পদটি কোনো সরকারি পদ নয়, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কোনো বেতনও নেই। শিক্ষার্থীরা ক্লাসে যে ফি দিত, সেটাই ছিল তাঁর একমাত্র আয়ের উৎস। যেহেতু নিশ্চিত আয় নেই, তাই পেটেন্ট অফিসের চাকরিটা তিনি ছাড়লেন না। সংসার চালানোর তাগিদ তো রয়েই গেছে!
তবে খুব বেশি দিন আর দুই নৌকায় পা দিয়ে চলতে হলো না। ১৯০৯ সালে জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ দিল। এর আগেই ১৯০৫ সালে তিনি ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেছেন। আইনস্টাইন থেকে হয়েছেন ডক্টর আইনস্টাইন। তারপর অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে এলেন জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয়ে।
পূর্ণকালীন অধ্যাপক হওয়ার সংগ্রাম
অবশেষে আইনস্টাইন পুরোদস্তুর শিক্ষক হলেন। কিন্তু এখানেও নতুন সমস্যা দেখা দিল। তাঁকে প্রচুর ক্লাস নিতে হতো, ছাত্রদের খাতা দেখতে হতো। গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত সময় বের করা কঠিন হয়ে পড়ছিল। ১৯১১ সালে তিনি প্রাগের চার্লস-ফার্ডিনান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পূর্ণকালীন অধ্যাপক হিসেবে যোগ দিলেন। সেখানে ছিলেন মাত্র ১৬ মাস। প্রাগের পরিবেশ ও ভাষা তাঁর মনে ধরেনি। তাই ১৯১২ সালে তিনি আবার নিজের পুরোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জুরিখ পলিটেকনিকে ফিরে এলেন।
বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বপ্নের প্রস্তাব
১৯১৩ সাল। বিজ্ঞানজগতে তখন তোলপাড় চলছে। বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী ম্যাক্স প্লাঙ্ক ও ওয়াল্টার নার্নস্ট জুরিখে এলেন আইনস্টাইনের সঙ্গে দেখা করতে। তাঁরা আইনস্টাইনকে জার্মানির বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব দিলেন। এই অফারটা ছিল স্বপ্নের মতো! আইনস্টাইন চাইলে ক্লাস নেবেন, না চাইলে নেবেন না। বেতন পাবেন সর্বোচ্চ পর্যায়ের। সঙ্গে প্রুশিয়ান একাডেমি অব সায়েন্সেসের সদস্য করা হবে। পাশাপাশি পরিচালক করা হবে কাইজার উইলহেম ইনস্টিটিউট অব ফিজিকসের।
আইনস্টাইন ভাবার জন্য সময় চাইলেন। তিনি কথা দিলেন, কয়েক দিন পর স্টেশনে গিয়ে তাঁর সিদ্ধান্ত জানাবেন। সিদ্ধান্ত জানানোর কায়দাটা ছিল সিনেমার মতো। প্লাঙ্ক ও নার্নস্ট যখন স্টেশনে ফিরবেন, তখন আইনস্টাইন যদি লাল গোলাপ হাতে দাঁড়িয়ে থাকেন, তার মানে তিনি রাজি। কিন্তু হাতে সাদা গোলাপ থাকলে বুঝতে হবে, তিনি যাবেন না।
স্টেশনে গিয়ে প্লাঙ্ক দেখলেন, আইনস্টাইনের হাতে টকটকে লাল গোলাপ! খুশিতে তাঁরা আত্মহারা হলেন! পেশাগত জীবনে আইনস্টাইন তখন সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছেছেন।
ব্যক্তিগত জীবনের সংকট ও বৈজ্ঞানিক সাফল্য
পেশাগত সাফল্যের চূড়ায় থাকলেও ব্যক্তিগত জীবন তখন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ছে। স্ত্রী মিলেইভা এই যাযাবরের মতো জীবন মেনে নিতে পারছিলেন না। স্বামীর সঙ্গে তাঁর দূরত্ব বাড়ছিল। ১৯১৪ সালের এপ্রিলে পরিবার নিয়ে বার্লিনে এলেন আইনস্টাইন। কিন্তু মাত্র কয়েক মাস পরেই বিচ্ছেদ হয়ে গেল। মিলেইভা দুই ছেলেকে নিয়ে জুরিখে ফিরে গেলেন। আইনস্টাইন বার্লিনের ফ্ল্যাটে পড়ে রইলেন একা।
এর মধ্যেই ১৯১৪ সালে শুরু হলো প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। আইনস্টাইন যুদ্ধের ঘোর বিরোধী ছিলেন। জার্মানির ৯৩ জন বিখ্যাত বিজ্ঞানী যুদ্ধের পক্ষে একটি ইশতেহার প্রকাশ করেন। এর পাল্টা জবাব হিসেবে আইনস্টাইন ‘মেনিফেস্টো টু দ্য ইউরোপিয়ানস’ নামে শান্তিচুক্তিতে সই করেন, যেখানে মাত্র চারজন বিজ্ঞানী সই করার সাহস দেখিয়েছিলেন।
জেনারেল থিওরি অব রিলেটিভিটি ও বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি
যুদ্ধ ও একাকিত্বের মধ্যেও আইনস্টাইন থামেননি। ১৯১৫ সালে তিনি শেষ করলেন তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ কাজ—‘জেনারেল থিওরি অব রিলেটিভিটি’। বুধ গ্রহের কক্ষপথের একটি অদ্ভুত আচরণ নিউটনের সূত্র দিয়ে মেলানো যাচ্ছিল না। আইনস্টাইন তাঁর নতুন সূত্র দিয়ে সেটা নিখুঁতভাবে মিলিয়ে দিলেন। এই সাফল্যের খুশিতে তিনি তিন দিন ঠিকমতো খেতেই পারেননি!
নতুন আবিষ্কৃত এই তত্ত্বে আইনস্টাইন বললেন, ভারী বস্তুর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় আলো বেঁকে যায়। একে বলে গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিং। নিউটন বলেছিলেন, মহাকর্ষ হলো বল বা শক্তি। আইনস্টাইন বললেন, না! মহাকর্ষ হলো স্থান-কালের বাঁক। সূর্যের মতো ভারী নক্ষত্র তার আশপাশের মহাশূন্যকে বাঁকিয়ে দেয়। সেই বাঁকা পথ দিয়ে যখন আলো আসে, তখন আলোও বেঁকে যায়।
তত্ত্ব তো দেওয়া হলো, কিন্তু প্রমাণ কই? ১৯১৭ সালে আইনস্টাইন একটি বই লিখলেন, নাম দিলেন ‘অন দ্য স্পেশাল অ্যান্ড জেনারেল থিওরি অব রিলেটিভিটি’। বইটি তিনি এমনভাবে লিখেছিলেন যেন মোটামুটি বিজ্ঞান জানা সাধারণ মানুষও তা বুঝতে পারে।
প্রমাণের সুযোগ এল ১৯১৯ সালের ২৯ মে। সেদিন পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ হওয়ার কথা। ব্রিটেনের দুই বিজ্ঞানী আর্থার এডিংটন ও ফ্রাঙ্ক ডাইসন অভিযানে নামলেন। এডিংটন গেলেন আফ্রিকার প্রিন্সিপ দ্বীপে। আরেকটি দল গেল ব্রাজিলের সোবরালে।
সূর্যগ্রহণের সময় দিনের বেলায় আকাশে তারা দেখা গেল। সূর্যের পাশ দিয়ে আসা নক্ষত্রের আলো সত্যিই বাঁকছে কি না, তা দেখার জন্য তাঁরা ছবি তুললেন। কয়েক মাস ধরে সেই ছবি বিশ্লেষণ করে দেখা গেল, আইনস্টাইনই ঠিক বলেছেন! নিউটনের ২০০ বছরের রাজত্ব শেষ হলো।
৭ নভেম্বর ১৯১৯। লন্ডনের টাইমস পত্রিকায় বিশাল করে শিরোনাম হলো ‘বিজ্ঞানে বিপ্লব: মহাবিশ্বের নতুন তত্ত্ব, নিউটনের পতন’। নিউইয়র্ক টাইমস শিরোনাম করল ‘স্বর্গের সব আলো বেঁকে গেছে’। রাতারাতি এক সাধারণ প্রফেসরের নাম ছড়িয়ে পড়ল পৃথিবীর আনাচকানাচে। আইনস্টাইন হয়ে উঠলেন বিজ্ঞানের রকস্টার!
