বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা: সংকট ও সংস্কারের পথে নতুন সরকারের চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা সংকট ও নতুন সরকারের চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা: সংকটের গভীরে ও পুনর্গঠনের আহ্বান

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা আজ এমন এক বাস্তবতার সম্মুখীন, যেখানে আত্মপ্রবঞ্চনার কোনো সুযোগই অবশিষ্ট নেই। বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরের অভ্যন্তরে দীর্ঘকাল ধরে পুঞ্জীভূত সংকটসমূহ এখন রাষ্ট্রের সামগ্রিক কাঠামো, অর্থনৈতিক সক্ষমতা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের গুণমানকে সরাসরি প্রভাবিত করছে। গত দুই দশক ধরে পরিকল্পনাবিহীন সম্প্রসারণ, নীতিমালার ঘনঘন পরিবর্তন, রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার, মান নির্ধারণে দুর্বলতা এবং জবাবদিহিতার অভাব উচ্চশিক্ষাকে একটি অস্থির ও অনিশ্চিত পথে ঠেলে দিয়েছে।

নতুন সরকারের সামনে শিক্ষা খাতের পুনর্গঠন

২০২৪ সালের জুলাই মাসে গণআন্দোলনের পর রাষ্ট্রীয় রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল নেতৃত্বাধীন নতুন প্রশাসন দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। এই সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষাগুলোর একটি হলো শিক্ষা খাতকে একটি স্থিতিশীল, ন্যায়ভিত্তিক ও মানসম্মত কাঠামোয় পুনর্গঠন করা। কারণ শিক্ষা কেবল একটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নয়, এটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রধান উপকরণ হিসেবে বিবেচিত।

শিক্ষানীতির অনুকরণ ও বাস্তবায়নের সংকট

বাংলাদেশে শিক্ষানীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়, সেটি হলো দ্রুত উন্নতির আশায় উন্নত বিশ্বের কাঠামো অনুকরণ করা। সেমিস্টার পদ্ধতি, ক্রেডিট সিস্টেম, জিপিএ মূল্যায়ন, প্রকল্পভিত্তিক শিক্ষা কিংবা প্রযুক্তিনির্ভর শ্রেণিকক্ষ ব্যবস্থা কাগজে-কলমে আকর্ষণীয় হলেও বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন দৃঢ় অবকাঠামো, প্রশিক্ষিত শিক্ষক, শক্তিশালী গবেষণা সংস্কৃতি এবং পর্যাপ্ত অর্থায়ন। এসব পূর্বশর্ত নিশ্চিত না করেই কাঠামোগত পরিবর্তন আনা হয়েছে, ফলে নীতির চেয়ে বিভ্রান্তি বেড়েছে বেশি।

নীতির ধারাবাহিকতার অভাব ও মূল্যায়ন ব্যবস্থা

নীতির ধারাবাহিকতার অভাব উচ্চশিক্ষার অন্যতম বড় সংকট হিসেবে চিহ্নিত। এক সরকারের সময় যে কাঠামো চালু হয়েছে, অন্য সরকারের সময় তা বাতিল বা সংশোধিত হয়েছে। পরীক্ষা ব্যবস্থায় বারবার পরিবর্তন, মূল্যায়ন পদ্ধতিতে অনিশ্চয়তা এবং ফলাফলে অস্বাভাবিক উত্থান শিক্ষার্থীদের মধ্যে পরিশ্রমের পরিবর্তে শর্টকাট মানসিকতা তৈরি করেছে। গণহারে পাসের সংস্কৃতি শিক্ষার্থীদের কাছে ডিগ্রিকে সহজলভ্য করেছে, কিন্তু জ্ঞানের গভীরতা নিশ্চিত করেনি। নতুন সরকারকে মূল্যায়ন ব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে হবে, যেখানে পরীক্ষা ভয় নয় বরং দক্ষতার পরিমাপক হয়।

অবকাঠামোগত সম্প্রসারণ ও গুণগত উন্নয়নের অসামঞ্জস্য

উচ্চশিক্ষার মান অবক্ষয়ের আরেকটি কারণ হলো অবকাঠামোগত সম্প্রসারণের সঙ্গে গুণগত উন্নয়নের অসামঞ্জস্য। গত দুই দশকে বহু বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, কিন্তু পর্যাপ্ত সংখ্যক যোগ্য শিক্ষক, আধুনিক গবেষণাগার, সমৃদ্ধ লাইব্রেরি ও আন্তর্জাতিক মানের একাডেমিক পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়নি। অনেক প্রতিষ্ঠান কেবল নামমাত্র কাঠামো নিয়ে কার্যক্রম শুরু করেছে। নতুন সরকারের উচিত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মান নির্ধারণে কঠোর মানদণ্ড প্রণয়ন করা এবং একটি কার্যকর স্বায়ত্তশাসিত অ্যাক্রেডিটেশন ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

গবেষণা খাতের অবহেলা ও তহবিল সংকট

দেশের গবেষণা খাত ধারাবাহিকভাবে প্রয়োজনীয় গুরুত্ব ও পৃষ্ঠপোষকতা থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছে। উন্নত বিশ্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল শক্তি তার গবেষণা সক্ষমতা। অথচ আমাদের দেশে গবেষণা অনেক ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ। আন্তর্জাতিক মানের প্রকাশনা, উদ্ভাবন বা পেটেন্টের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম। গবেষণা তহবিলের স্বল্পতা যেমন একটি সমস্যা, তেমনি বিদ্যমান তহবিল ব্যবহারে স্বচ্ছতার অভাবও রয়েছে। নতুন সরকারকে গবেষণায় পৃথক ও পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ দিতে হবে এবং প্রতিযোগিতামূলক পদ্ধতিতে প্রকল্প অনুমোদনের ব্যবস্থা করতে হবে।

শিক্ষক সংকট ও পেশাগত মর্যাদার অবনতি

শিক্ষক সংকট ও পেশাগত মর্যাদার অবনতি শিক্ষা ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিয়েছে। মেধাবী শিক্ষার্থীরা শিক্ষকতা পেশায় আগ্রহ হারাচ্ছে, কারণ আর্থিক প্রণোদনা ও সামাজিক স্বীকৃতি পর্যাপ্ত নয়। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা প্রশাসনিক জটিলতা, রাজনৈতিক চাপ এবং সীমিত গবেষণা সুযোগের মধ্যে কাজ করছেন। নতুন সরকারের উচিত শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও মেধাভিত্তিক করা এবং শিক্ষকদের জন্য একটি পৃথক বেতন কাঠামো প্রণয়ন করা।

কোভিড পরবর্তী পাঠাভ্যাস ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ক্যাম্পাস

কোভিড পরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থীদের পাঠাভ্যাসে যে পরিবর্তন এসেছে, তা পুনরুদ্ধারে বিশেষ উদ্যোগ প্রয়োজন। অনলাইন নির্ভরতা ও দ্রুত ফল পাওয়ার মানসিকতা গভীর অধ্যয়নকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ক্যাম্পাস নিশ্চিত করা নতুন সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। ছাত্ররাজনীতি গণতান্ত্রিক চর্চার অংশ হতে পারে, কিন্তু সহিংসতা, দখলদারিত্ব বা দলীয়করণ শিক্ষার পরিবেশকে ধ্বংস করে।

ডিজিটাল রূপান্তর ও কারিগরি শিক্ষার গুরুত্ব

ডিজিটাল রূপান্তর শিক্ষাকে আধুনিক করতে পারে, তবে তা প্রদর্শনমূলক হলে ফল পাওয়া যাবে না। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, গবেষণা ডাটাবেস ও ভার্চুয়াল ল্যাব সুবিধা সম্প্রসারণ করতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষকদের প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ করে তুলতে প্রশিক্ষণ জরুরি। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, যাতে সব শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়মুখী না হয়ে কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র তৈরি করে।

শিক্ষায় দুর্নীতি রোধ ও জাতীয় ঐকমত্য

শিক্ষায় দুর্নীতি ও অর্থ অপচয় রোধে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো একটি জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তোলা, যেখানে শিক্ষা নীতি রাজনৈতিক পালাবদলের শিকার না হয়। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করে তা ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।

বাংলাদেশ আজ সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। উচ্চশিক্ষার বর্তমান দুর্বলতা দূর করা সহজ নয়, কিন্তু সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং পেশাগত দক্ষতা থাকলে তা সম্ভব। নতুন সরকার যদি শিক্ষা খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয় এবং পৃথক পে স্কেল, গবেষণা তহবিল বৃদ্ধি, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও মাননির্ভর সংস্কার বাস্তবায়ন করে, তবে উচ্চশিক্ষা আবারও জাতির আশার আলো হয়ে উঠতে পারে। অন্যথায় আমরা সনদপ্রাপ্ত কিন্তু অদক্ষ প্রজন্ম তৈরি করবো, যা উন্নয়নের গতি দীর্ঘদিনের জন্য থামিয়ে দিতে পারে। এখন সময় সাহসী সিদ্ধান্তের, সময় পূর্ণাঙ্গ সংস্কারের, সময় ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার। শিক্ষা জাতির ভাগ্য নির্ধারণ করে, আর সেই ভাগ্য নির্মাণের দায়িত্ব আজকের সরকারের হাতে ন্যস্ত।

লেখক: অধ্যাপক, পরিসংখ্যান বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট।