দিলীপকুমার ভট্টাচার্য্যের স্মরণে স্মারক বক্তৃতা: সংস্কৃত সাহিত্যের বিশ্বযাত্রা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত ও পালি বিভাগের সহকর্মী দিলীপকুমার ভট্টাচার্য্য ছিলেন একজন অত্যন্ত বিনয়ী ও নিষ্ঠাবান শিক্ষক। তিনি নিজেকে সর্বদা অন্তরালে রাখতে পছন্দ করতেন, তবে যাঁরা তাঁকে জানতেন, তাঁরা তাঁর বিদ্যানুরাগ ও মহৎপ্রাণতার কথা ভালোভাবেই অবগত ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর আমরা জানতে পারি যে তিনি তাঁর জীবনের সমস্ত সঞ্চয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে দান করে গেছেন। এই মহান ব্যক্তির স্মৃতি জাগরূক রাখতে তাঁর নামে স্মারক বক্তৃতার প্রবর্তন একটি যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত। প্রথম স্মারক বক্তৃতা প্রদানের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে, যা আমার জন্য গর্বের বিষয়।
সংস্কৃত সাহিত্যের বিশ্বব্যাপী প্রসার
এই বক্তৃতায় দুটি প্রধান বিষয় আলোচনা করা হয়েছে। প্রথমত, উনিশ শতকের শেষ পর্যন্ত পাশ্চাত্য পণ্ডিতদের সংস্কৃত সাহিত্যচর্চার একটি বিস্তৃত বিবরণ। এক সময় এমন ধারণা প্রচলিত ছিল যে সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্য ব্রাহ্মণ পণ্ডিতদের জালিয়াতি মাত্র। ইংরেজ দার্শনিক ডুগাল্ড স্টুয়ার্ট এমনকি প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন যে সংস্কৃত বলে কিছুই নেই। তবে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের পণ্ডিতদের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় এই ধারণা ভেঙে যায় এবং সংস্কৃতের সত্যতা প্রতিষ্ঠিত হয়।
খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ শতকে পারস্য সম্রাট খসরু নওশেরওয়া সংস্কৃত পঞ্চতন্ত্রের একটি পাহলভি অনুবাদ করিয়েছিলেন, যা কালিলা ওয়া দিমনা নামে পরিচিত। পরবর্তীতে এই গ্রন্থটি আরবি, জার্মান, ওলন্দাজ, দিনেমার, আইসল্যান্ডিক ও ইতালীয় ভাষায় অনূদিত হয়। স্যার টমাস নর্থের ইংরেজি অনুবাদ থেকে শেক্সপিয়ার তাঁর নাটকে গল্প ব্যবহার করেছিলেন বলে ধারণা করা হয়।
ভারতীয় সাহিত্যের বহুত্ব বনাম একত্ব
দ্বিতীয় অংশে ভারতীয় সাহিত্যকে একবচনে দেখার প্রবণতা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। অনেক পণ্ডিত ভারতীয় সাহিত্য বলতে কেবল সংস্কৃত, পালি, প্রাকৃত, অপভ্রংশ ও অবহট্ট ভাষায় রচিত সাহিত্যকেই বুঝিয়েছেন, যদিও ভারতবর্ষে বহু ভাষার সাহিত্য বিদ্যমান। অলব্রেখট ওয়েবার, মরিস উইন্টারনিটজ, শিশিরকুমার দাশ প্রমুখ পণ্ডিত এই বিষয়ে তাদের মতামত ব্যক্ত করেছেন।
উইন্টারনিটজের মতে, ভারতীয় সাহিত্যে একটি অন্তর্নিহিত ঐক্য রয়েছে, যা রাজনৈতিক সীমানা পরিবর্তন সত্ত্বেও ভারতবর্ষ নামক একটি দেশের অনুভূতি জাগ্রত করে। অন্যদিকে, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ভারতের বিভিন্ন ভাষার সাহিত্যকে পৃথকভাবে দেখার পক্ষপাতী। তিনি মনে করেন, বাংলা, হিন্দি, তামিল প্রভৃতি ভাষার সাহিত্যের স্বাতন্ত্র্য অগ্রাহ্য করে এক সাহিত্যের অন্তর্ভুক্ত করা সমীচীন নয়।
ভারতীয় উপমহাদেশ বহু ভাষা ও সাহিত্যের ভূখণ্ড। সংস্কৃত, পালি, প্রাকৃত প্রভৃতি প্রাচীন ভাষার সাহিত্য এক ঐতিহাসিক পর্বের ফসল, অন্যদিকে বাংলা, হিন্দি, মারাঠি প্রভৃতি আধুনিক ভাষার সাহিত্য অন্য পর্বের সৃষ্টি। প্রতিটি ভাষা ও তার সাহিত্যের স্বাতন্ত্র্য স্বীকার করে এর সমষ্টিকে ভারতীয় সাহিত্য হিসেবে দেখা উচিত।
দিলীপকুমার ভট্টাচার্য্যের মতো মহান ব্যক্তির স্মরণে এই বক্তৃতা সংস্কৃত সাহিত্যের গৌরবময় ইতিহাস ও ভারতীয় সাহিত্যের জটিলতা সম্পর্কে আমাদের জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করেছে।
