উচ্চশিক্ষা সংস্কার: বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণে অপরিহার্য পদক্ষেপ
উচ্চশিক্ষা সংস্কার: বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণে অপরিহার্য

বাংলাদেশ আজ এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে তরুণ প্রজন্মের বিশাল সম্ভাবনা, অপরদিকে একটি দুর্বল ও অপরিকল্পিত উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার বাস্তবতা। দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ তরুণ—এই জনশক্তিকে যদি সঠিকভাবে শিক্ষিত ও দক্ষ করে গড়ে তোলা না যায়, তবে জনমিতিক লভ্যাংশ পরিণত হবে জনমিতিক বোঝায়। তাই উচ্চশিক্ষা খাতকে শক্তিশালী করা আজ আর কোনও বিকল্প নয়, এটি একটি জাতীয় অপরিহার্যতা।

মানের অবক্ষয় ও দৃষ্টিভঙ্গির সংকট

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো মানের অবক্ষয়। বিশ্বের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র‌্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের কোনও প্রতিষ্ঠানের নাম খুঁজে পাওয়া কষ্টকর। এর কারণ কেবল অর্থের অভাব নয়, বরং দৃষ্টিভঙ্গির সংকট। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখনও মুখস্থনির্ভর শিক্ষার চর্চা করে চলেছে—যেখানে সৃজনশীলতা, সমালোচনামূলক চিন্তা ও গবেষণার সংস্কৃতি প্রায় অনুপস্থিত। একজন শিক্ষার্থী চার বছর পড়ে স্নাতক হওয়ার পরেও বাস্তব সমস্যা সমাধানের দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না— এটি আমাদের পাঠ্যক্রমের ব্যর্থতা।

পাঠ্যক্রম ও শিল্প খাতের সংযোগ

পাঠ্যক্রমকে আধুনিক ও শিল্পমুখী করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্প খাতের মধ্যে একটি শক্তিশালী সেতুবন্ধন গড়ে তোলা জরুরি। ইন্টার্নশিপ, প্রজেক্টভিত্তিক শিক্ষা এবং ইন্ডাস্ট্রি পার্টনারশিপ—এগুলোকে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। জ্ঞান কেবল শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না, তাকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রয়োগযোগ্য হতে হবে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

গবেষণায় বিনিয়োগের অভাব

উন্নত দেশগুলোতে জিডিপির ২ থেকে ৩ শতাংশ গবেষণা ও উন্নয়নে ব্যয় করা হয়। বাংলাদেশে এই হার এখনও অতি নগণ্য। ফলে আমরা প্রযুক্তির উদ্ভাবক নই, কেবল ভোক্তা। আমরা ওষুধ তৈরির পেটেন্ট ধরে রাখতে পারি না, কারণ আমাদের ফার্মাসিউটিক্যাল গবেষণা দুর্বল। আমরা কৃষি উদ্ভাবনে পিছিয়ে আছি, কারণ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণাগারে পর্যাপ্ত অর্থ পায় না। সরকারকে উচ্চশিক্ষায় বাজেট বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে হবে। পাশাপাশি বেসরকারি খাত ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের গবেষণা তহবিলে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণাকেন্দ্র স্থাপন, তরুণ গবেষকদের বৃত্তি এবং প্রকাশনার জন্য প্রণোদনা—এগুলো একটি গবেষণামুখী সংস্কৃতি গড়ার প্রাথমিক পদক্ষেপ। মনে রাখতে হবে, আজকের গবেষণাই আগামীকালের উদ্ভাবন— এই সরল সত্যটি উপলব্ধি না করলে উন্নয়নের পথ দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হবে।

শিক্ষকতা পেশার সংকট

একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ হলো তার শিক্ষকমণ্ডলী। কিন্তু বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা পেশা অনেক ক্ষেত্রে মেধাবী তরুণদের প্রথম পছন্দ নয়। কম বেতন, রাজনৈতিক নিয়োগ প্রক্রিয়া এবং পেশাদার বিকাশের সুযোগের অভাব—এই তিনটি কারণ মিলে শিক্ষকতাকে একটি কম আকর্ষণীয় পেশায় পরিণত করেছে। শিক্ষকদের নিয়োগ প্রক্রিয়া হতে হবে সম্পূর্ণ মেধাভিত্তিক ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত। তাদের বেতন ও সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করতে হবে—যাতে মেধাবীরা শিক্ষকতায় আগ্রহী হন। শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, বিদেশে উচ্চতর শিক্ষার সুযোগ এবং গবেষণা প্রকাশে উৎসাহ দিতে হবে। একজন ভালো শিক্ষক হাজার শিক্ষার্থীর জীবন পরিবর্তন করতে পারেন—এই সত্যকে নীতিনির্ধারকদের মনে রাখতে হবে।

ছাত্ররাজনীতির বিষাক্ত প্রভাব

উচ্চশিক্ষার আরেকটি বড় অন্তরায় হলো বিষাক্ত ছাত্ররাজনীতি। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলো প্রায়ই দলীয় কোন্দল, সংঘাত ও অস্থিরতার কেন্দ্রে পরিণত হয়। এই পরিবেশে একজন সাধারণ শিক্ষার্থী নিরাপদ বোধ করেন না, তার মেধা বিকাশের সুযোগ সংকুচিত হয়ে পড়ে। হলগুলোতে সিট বাণিজ্য থেকে শুরু করে ভর্তি প্রক্রিয়ায় অনিয়ম পর্যন্ত—রাজনৈতিক প্রভাব শিক্ষার প্রতিটি স্তরকে কলুষিত করছে। ক্যাম্পাসকে রাজনৈতিক রণক্ষেত্র নয়, জ্ঞানচর্চার নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত করতে হবে। শিক্ষার্থীদের ইউনিয়ন থাকতে পারে, তবে তা হতে হবে শিক্ষামুখী ও গণতান্ত্রিক—দলীয় লেজুড়বৃত্তির বাইরে।

চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ

চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা বিজ্ঞান, রোবোটিক্স ও সাইবার নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলো বৈশ্বিক চাকরির বাজার নতুনভাবে নির্ধারণ করছে। বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনও পুরোনো সিলেবাস পড়ানো হচ্ছে—যা দশ-পনেরো বছর আগের বাজারের চাহিদার কথা মাথায় রেখে তৈরি। ডিজিটাল বাংলাদেশের অবকাঠামো ব্যবহার করে ই-লার্নিং, হাইব্রিড ক্লাসরুম এবং ওপেন এডুকেশনাল রিসোর্স চালু করতে হবে। প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনকেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের স্টার্টআপ মানসিকতা ও উদ্যোক্তা দক্ষতা গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষা ও প্রযুক্তির সংমিশ্রণই পারে বাংলাদেশকে ভবিষ্যতের অর্থনীতিতে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে রাখতে।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মান নিয়ন্ত্রণ

গত তিন দশকে বাংলাদেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। এটি একদিক থেকে ইতিবাচক— উচ্চশিক্ষার সুযোগ বিস্তৃত হয়েছে। কিন্তু অনেক প্রতিষ্ঠান শিক্ষার মান নিশ্চিত না করে ব্যবসায়িক মনোভাবে পরিচালিত হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকে (ইউজিসি) আরও স্বাধীন, শক্তিশালী ও কার্যকর করতে হবে। নিয়মিত মান মূল্যায়ন, অ্যাক্রেডিটেশন ব্যবস্থা এবং মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

সুযোগের বৈষম্য দূরীকরণ

উচ্চশিক্ষার সুবিধা এখনও শহরকেন্দ্রিক ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ। প্রত্যন্ত অঞ্চলের মেধাবী শিক্ষার্থী, নারী, সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা প্রায়শই উচ্চশিক্ষা থেকে বঞ্চিত থাকছেন। এই বৈষম্য কেবল ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, এটি জাতীয় মেধার অপচয়। একটি দেশ তখনই সত্যিকারের উন্নত হয়, যখন তার প্রতিটি নাগরিক তার মেধা বিকাশের সুযোগ পায়, পটভূমি বা আর্থিক অবস্থা নির্বিশেষে। বৃত্তি কার্যক্রম সম্প্রসারণ, দূরশিক্ষার মান উন্নয়ন, শিক্ষার্থী ঋণ ব্যবস্থা প্রবর্তন এবং নারীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা—এই পদক্ষেপগুলো উচ্চশিক্ষার গণতন্ত্রীকরণে সহায়তা করবে।

আন্তর্জাতিকীকরণ ও মেধা পাচার রোধ

বিশ্বের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে অংশীদারত্ব, শিক্ষক ও শিক্ষার্থী বিনিময় কার্যক্রম এবং যৌথ গবেষণা প্রকল্প—এগুলো আমাদের উচ্চশিক্ষাকে বৈশ্বিক মানে নিয়ে যেতে সাহায্য করবে। প্রবাসী বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞ ও গবেষকদের দেশের উচ্চশিক্ষায় সংযুক্ত করার সুযোগ তৈরি করতে হবে—তাদের জ্ঞান ও নেটওয়ার্ক অমূল্য সম্পদ। বিদেশে অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের দেশে ফিরে আসার জন্য আকর্ষণীয় সুযোগ ও প্রণোদনা দিতে হবে, যাতে মেধা পাচার রোধ করা সম্ভব হয় এবং দেশ তার সেরা মস্তিষ্কগুলোকে ধরে রাখতে পারে। আঞ্চলিক পর্যায়ে সার্ক দেশগুলোর সঙ্গে উচ্চশিক্ষা সহযোগিতা জোরদার করাও একটি কার্যকর পদক্ষেপ হতে পারে।

প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসন

উচ্চশিক্ষার উন্নয়নে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসন একটি মূল শর্ত। সরকারি হস্তক্ষেপ, দলীয় নিয়োগ এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনী শক্তিকে নষ্ট করে দেয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগ থেকে শুরু করে পাঠ্যক্রম প্রণয়ন পর্যন্ত প্রতিটি সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষাবিদদের নেতৃত্বে। স্বচ্ছ আর্থিক ব্যবস্থাপনা, নিয়মিত অডিট এবং ফলাফলভিত্তিক বরাদ্দ নীতি প্রবর্তন করলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আরও দায়িত্বশীল ও কার্যকর হয়ে উঠবে।

সম্মিলিত প্রচেষ্টার প্রয়োজন

উচ্চশিক্ষার সংস্কার কোনও একটি সরকারের একার কাজ নয়, এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় প্রকল্প। রাজনৈতিক সদিচ্ছা, পর্যাপ্ত বিনিয়োগ, মেধাভিত্তিক প্রশাসন এবং সমাজের সম্মিলিত প্রচেষ্টা—এই চারটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়েই সম্ভব একটি শক্তিশালী উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা। শুধু নীতি প্রণয়ন নয়, সেই নীতির বাস্তবায়নও নিশ্চিত করতে হবে। অতীতে অনেক সুন্দর পরিকল্পনা কাগজে থেকে গেছে; এবার তা মাঠে নামাতে হবে। বাংলাদেশ যদি ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশের কাতারে যোগ দিতে চায়, তবে সেই স্বপ্নের ভিত্তি গড়তে হবে আজকের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। কারণ জাতির ভবিষ্যৎ নির্মিত হয় শ্রেণিকক্ষে, গবেষণাগারে এবং একজন মেধাবী তরুণের স্বপ্নের মধ্যে। সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার দায়িত্ব আমাদের সবারই।

লেখক: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক-প্রশাসন বিভাগের প্রফেসর