দৃষ্টিহীন শরীফের অদম্য স্বপ্ন: শ্রুতিলেখকের সহায়তায় এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ
ঠাকুরগাঁও শহরের গোবিন্দনগর মুন্সিরহাট মহল্লার এক সাধারণ পরিবারে জন্ম থেকেই দুই চোখে ঘুটঘুটে অন্ধকার নিয়ে বেড়ে উঠেছেন ১৯ বছর বয়সি তরুণ শরীফ আলী। কিন্তু সেই অন্ধকারকেও হার মানিয়ে মনের গভীরে এক ফালি উজ্জ্বল স্বপ্ন লালন করছেন তিনি। দারিদ্র্য ও শারীরিক প্রতিবন্ধকতা—কোনোটিই তার অদম্য ইচ্ছাশক্তিকে দমাতে পারেনি। সব বাধা অতিক্রম করে তিনি ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন, যা তার জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।
পরীক্ষার হলে এক অনন্য দৃশ্য
মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) সকাল ১০টায় ঠাকুরগাঁও সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে শুরু হয় বাংলা প্রথমপত্রের পরীক্ষা। পরীক্ষার হলে চারদিকে ছিল পিনপতন নীরবতা। পরীক্ষার্থীদের কলমের খসখস শব্দের মাঝেই শরীফ আলী প্রমাণ করলেন—দৃষ্টিশক্তি না থাকলেও কেবল মনের শক্তিতেই সফলতা অর্জন সম্ভব। তিনি মুখে উত্তর বলে যাচ্ছেন, আর শ্রুতিলেখক তা লিখে দিচ্ছেন খাতায়। এই দৃশ্য দেখে অনেকের চোখেই পানি এসে গিয়েছিল, কারণ এটি ছিল অদম্য মানবিক সংগ্রামের এক জীবন্ত উদাহরণ।
সংগ্রামী জীবন ও পারিবারিক সমর্থন
শরীফের বাবা রমজান আলী পেশায় ইজিবাইকচালক। সীমিত আয়ের সংসারে সন্তানের চিকিৎসার সামর্থ্য না থাকলেও শিক্ষার আলো থেকে তাকে বঞ্চিত করেননি তিনি। পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে শুনে শুনেই শরীফ পড়া মুখস্থ করতেন। এভাবেই প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে ২০২১ সালে ভর্তি হন ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ে। তার এই শিক্ষাজীবন ছিল নানা চ্যালেঞ্জে ভরা, কিন্তু প্রতিটি পদক্ষেপেই তিনি পরিবারের অকুণ্ঠ সমর্থন পেয়েছেন।
শ্রুতিলেখকের সন্ধানে যাত্রা
নিজে লিখতে না পারায় শরীফের জন্য শ্রুতিলেখক পাওয়া ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। পরীক্ষার আগে উপযুক্ত সহায়তা না পাওয়ায় তার অংশগ্রহণ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে এগিয়ে আসেন অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী শায়লা আক্তার। দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের ‘পাবলিক ও শ্রেণি পরীক্ষায় শ্রুতিলেখক সেবা গ্রহণসংক্রান্ত নীতিমালা-২০২৫’ অনুসরণ করে শায়লাকে শরীফের শ্রুতিলেখক হিসেবে অনুমোদন দেওয়া হয়। তার হাতের লেখায় এখন সাদা খাতায় রূপ নিচ্ছে শরীফের স্বপ্ন, যা একটি সুন্দর মানবিক সহযোগিতার নিদর্শন।
শায়লা আক্তারের আবেগঘন বক্তব্য
পরীক্ষার আগে আবেগঘন কণ্ঠে শায়লা আক্তার বলেন, “শরীফ ভাই বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখেন। আমার লেখা যদি সেই স্বপ্ন পূরণে একটু হলেও সাহায্য করে, সেটাই আমার সার্থকতা। আমি চাই তিনি দেশসেরা ফলাফল করুক।” তার এই কথাগুলো শুনে অনেকেই অনুপ্রাণিত হয়েছেন, কারণ এটি দেখিয়েছে কীভাবে একজন তরুণী অপরের স্বপ্নপূরণে নিজেকে নিয়োজিত করতে পারে।
এক অনন্য উদাহরণ ও সামাজিক প্রভাব
ঠাকুরগাঁওয়ের মানুষের মুখে মুখে এখন শরীফ আলীর এই সংগ্রামের গল্প। তার এই লড়াই কেবল ব্যক্তিগত নয়; বরং শারীরিক সীমাবদ্ধতাকে জয় করে এগিয়ে যাওয়ার এক অনন্য উদাহরণ। শরীফ আজ প্রমাণ করেছেন—চোখের আলো না থাকলেও স্বপ্নের আলোয় পৃথিবী জয় করা সম্ভব। তার এই যাত্রা শুধু ঠাকুরগাঁও নয়, সারাদেশের জন্য একটি অনুপ্রেরণাদায়ক গল্প হয়ে উঠেছে।
এসএসসি পরীক্ষায় শরীফের অংশগ্রহণ শারীরিক প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য আশার আলো দেখাচ্ছে। এটি প্রমাণ করে যে সঠিক সহায়তা ও দৃঢ় মনোবল থাকলে কোনো বাধাই সফলতার পথে অন্তরায় হতে পারে না। শরীফের এই সংগ্রামী গল্প আগামী দিনে আরও অনেককে স্বপ্ন দেখতে ও তা বাস্তবায়নে সাহস জোগাবে।



