সম্প্রতি ‘পাকিস্তান-বাংলাদেশ নলেজ করিডোর’ বা ‘জ্ঞান করিডোর’ নামের উদ্যোগটির আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়েছে। এই প্রকল্পের প্রাথমিক লক্ষ্য হলো দুই দেশের মধ্যে ছাত্র এবং শিক্ষক বিনিময়ের মাধ্যমে একটি নতুন সেতুবন্ধন তৈরি করা। জানা গেছে, এই উদ্যোগের প্রথম ধাপেই ইতোমধ্যে ৭৪ জন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে পাকিস্তানে পাড়ি জমিয়েছেন। সাধারণভাবে দেশগুলোর মধ্যে শিক্ষা সংক্রান্ত সহযোগিতা সবসময়ই একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে সমাদৃত হয়, যা পারস্পরিক বুদ্ধিবৃত্তিক আদান-প্রদান এবং জনমানুষের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধি করে। তবে যেকোনও আন্তর্জাতিক উদ্যোগের মতো এটিকেও আমাদের জাতীয় স্বার্থ, শিক্ষার গুণগত মান, নিরাপত্তা এবং দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক প্রভাবের কষ্টিপাথরে যাচাই করা প্রয়োজন।
শিক্ষা ব্যবস্থার বৈষম্য
পাকিস্তানের প্রেক্ষাপটে এই প্রকল্প নিয়ে অতি-উৎসাহী হওয়ার আগে বেশ কিছু অস্বস্তিকর কিন্তু অপরিহার্য প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন। শিক্ষা কোনও একক শ্রেণিকক্ষ বা নিছক কিছু সার্টিফিকেটের সমষ্টি নয়—এটি একটি জাতির সামগ্রিক উন্নয়নের মেরুদণ্ড। একটি দেশের সামাজিক মূল্যবোধ, লিঙ্গ সমতা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা, সহিষ্ণুতা এবং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি কেমন হবে, তা নির্ধারিত হয় তার শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে। তাই যখন দুটি দেশ একটি যৌথ ‘জ্ঞান করিডোর’ গড়ার স্বপ্ন দেখে, তখন প্রথম এবং প্রধান প্রশ্ন হওয়া উচিত—উভয় দেশের শিক্ষা ও সামাজিক ভিত্তি কি সমান্তরাল অবস্থানে আছে? সাম্প্রতিক নানা পরিসংখ্যান ও উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান এক্ষেত্রে সম্পূর্ণ বিপরীত অভিমুখে যাত্রা করছে। বিগত দুই দশকে বাংলাদেশ শিক্ষা ও মানব উন্নয়নের প্রতিটি সূচকে ঈর্ষণীয় সাফল্য দেখিয়েছে। ‘বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২৪’ এর তথ্যমতে, আমাদের দেশে প্রাপ্তবয়স্ক সাক্ষরতার হার বর্তমানে প্রায় ৭৯ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। বিশেষ করে নারী শিক্ষার জাগরণ এবং শিক্ষাক্ষেত্রে লিঙ্গবৈষম্য দূর করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় একটি রোল মডেলে পরিণত হয়েছে। এর বিপরীতে পাকিস্তানের চিত্র অত্যন্ত হতাশাজনক। সেখানে সাক্ষরতার হার এখনও দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন দেশগুলোর একটি, যা মাত্র ৬৩ শতাংশের কাছাকাছি অবস্থান করছে। পাকিস্তানের বিশেষ করে বেলুচিস্তান কিংবা পাঞ্জাবের মতো গ্রামীণ ও রক্ষণশীল এলাকাগুলোতে নারী শিক্ষার অবস্থা এতটাই ভঙ্গুর যে লাখ লাখ কন্যাশিশু সেখানে শিক্ষা গ্রহণের প্রাথমিক সুযোগটুকু থেকেও বঞ্চিত।
শিক্ষায় অন্তর্ভুক্তি ও বরাদ্দের পার্থক্য
শিক্ষায় অন্তর্ভুক্তি বা তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠত্ব স্পষ্ট। বাংলাদেশে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির হার এখন ৯০ শতাংশের ওপরে এবং মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত লিঙ্গ সমতা অর্জিত হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে—ছাত্রীদের ভর্তির হার ছাত্রদেরও ছাড়িয়ে গেছে। অথচ পাকিস্তান এখনও ভয়াবহ শিক্ষা-বিমুখতার সঙ্গে লড়াই করছে। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানে বর্তমানে ২ কোটি ৫০ লক্ষেরও বেশি শিশু স্কুলের বাইরে রয়েছে, যা বিশ্বে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। বেলুচিস্তানের মতো প্রদেশগুলোতে শিক্ষা বঞ্চিত হওয়ার হার এখন চরম আশঙ্কাজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। শিক্ষা খাতে রাষ্ট্রীয় বরাদ্দের অগ্রাধিকারের দিকে তাকালে দুই দেশের নীতিনির্ধারণী পার্থক্যের বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যদিও বাংলাদেশ এখনও বিশ্বমান অনুযায়ী শিক্ষা খাতে কাঙ্ক্ষিত বরাদ্দ দিতে পারছে না, তবু পাকিস্তানের তুলনায় আমাদের সক্ষমতা অনেক বেশি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে বাংলাদেশ শিক্ষা খাতের জন্য জাতীয় বাজেটের ১২ শতাংশের বেশি বরাদ্দ রেখেছে। অপরদিকে পাকিস্তান তাদের জিডিপির ১ শতাংশেরও কম শিক্ষা খাতে ব্যয় করে, যা এই অঞ্চলে অন্যতম সর্বনিম্ন হার। এই দীর্ঘমেয়াদি অর্থসংকটের ফলে পাকিস্তানের শিক্ষা কাঠামোতে বড় ধরনের কাঠামোগত দুর্বলতা তৈরি হয়েছে। এমনকি সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, ২০২৫ সালে কেবল পাঞ্জাব প্রদেশেই হাজার হাজার স্কুল ভবনকে ঝুঁকিপূর্ণ ও অনিরাপদ ঘোষণা করতে হয়েছে। পাকিস্তানের অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধার অভাব রয়েছে এবং সেখানে ‘লার্নিং পভার্টি’ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। একটি বড় অংশের পাকিস্তানি শিশু ১০ বছর বয়সেও সাধারণ পাঠ্যবই পড়তে বা বুঝতে পারছে না। যদিও বাংলাদেশের শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে নিজেদের অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তবু পাকিস্তানের তুলনায় আমাদের সূচকগুলো অনেক বেশি শক্তিশালী এবং আশাব্যঞ্জক। যাদের নিজেদের শিক্ষা ব্যবস্থা এতটা ভঙ্গুর তারা আসলে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের কী শিক্ষা প্রদান করবে?
পাঠ্যপুস্তকের বিতর্ক ও ঐতিহাসিক বিকৃতি
তবে নলেজ করিডোর নিয়ে এই বিতর্কের পরিধি কেবল পরিসংখ্যান বা সাক্ষরতার হারেই সীমাবদ্ধ নয়। পাকিস্তানের শিক্ষা ব্যবস্থার ভেতরের পরিবেশটি আরও বেশি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ডন পত্রিকায় প্রকাশিত একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় ১৫০টি পাঠ্যপুস্তক বিশ্লেষণ করে সেখানে ব্যাপক ধর্মীয় পক্ষপাতিত্ব, লিঙ্গ বৈষম্যমূলক উপস্থাপনা এবং ঐতিহাসিক বিকৃতির প্রমাণ পাওয়া গেছে। দেশটির শীর্ষস্থানীয় শিক্ষাবিদ এবং মানবাধিকার কর্মীরা সতর্ক করেছেন— সেখানকার কিছু পাঠ্যপুস্তক শিক্ষার্থীদের মধ্যে মুক্তচিন্তা বা বহুত্ববাদ বিকাশের পরিবর্তে অসহিষ্ণুতা ও সংকীর্ণ চিন্তাধারা ছড়িয়ে দিচ্ছে। যে দেশের শিক্ষাবিদরাই সতর্ক করে দিচ্ছে তাদের শিক্ষা মান সম্পর্কে, সেখানে আমরা অবিবেচকের মতো আমাদের শিক্ষার্থীদের পাঠাতে উদগ্রীব হয়ে আছি!
একজন বাংলাদেশির জন্য বিষয়টি আরও বেশি সংবেদনশীল এবং বেদনাদায়ক হয়ে ওঠে যখন ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সেখানে উঠে আসে। পাকিস্তানের পাঠ্যক্রমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসকে অত্যন্ত বিকৃত এবং সংকীর্ণ রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে উপস্থাপন করা হয়। আমাদের যে মহান মুক্তিযুদ্ধ, যে দীর্ঘ গণতান্ত্রিক আন্দোলন ছিল লক্ষ্য, সেটিকে অনেক ক্ষেত্রে ‘বিদেশি ষড়যন্ত্র’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। এমনকি বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সেখানে দেশদ্রোহী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই ধরনের মিথ্যা বয়ান কেবল ঐতিহাসিকভাবে ভুলই নয়, বরং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও মর্যাদার ওপর চরম আঘাত। এখানে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক—যে শিক্ষা ব্যবস্থায় বাংলাদেশের জন্ম ইতিহাসকেই তুচ্ছ করা হয়, সেখানে পড়াশোনা করে আমাদের শিক্ষার্থীরা আসলে কী শিখবে? তারা কীভাবে মুক্তিযুদ্ধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবে?
বিকল্প গন্তব্যের প্রাসঙ্গিকতা
আদর্শগতভাবে একটি শিক্ষা বিনিময় কর্মসূচির লক্ষ্য হওয়া উচিত উন্নত গবেষণা, অন্তর্ভুক্তিমূলক চিন্তাধারা এবং আধুনিক উদ্ভাবনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া। বাংলাদেশের মেধাবী শিক্ষার্থীরা আজ ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়াসহ বিশ্বসেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সফলতার সঙ্গে পড়াশোনা করছে। আমাদের ছাত্রছাত্রীরা বিশ্বের প্রতিযোগিতামূলক শিক্ষাঙ্গনে নিজেদের মেধা ও খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতার প্রমাণ দিয়ে চলেছে। এই প্রেক্ষাপটে একটি যৌক্তিক প্রশ্ন উত্থাপিত হয় যে যেখানে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা বিশ্বের শ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে স্থান করে নিচ্ছে, সেখানে পাকিস্তান—যারা নিজেই শিক্ষা সংকট এবং সামাজিক অসহিষ্ণুতায় জর্জরিত, তাদের সঙ্গে এই বিনিময় কেন এত অগ্রাধিকার পাচ্ছে?
নিরাপত্তা ও মানব উন্নয়ন
নিরাপত্তার বিষয়টিও কোনোভাবেই এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। ‘গ্লোবাল টেরোরিজম ইনডেক্স ২০২৫’ অনুযায়ী, পাকিস্তান এখনও সন্ত্রাসবাদ ও চরমপন্থা দ্বারা বিশ্বের অন্যতম ক্ষতিগ্রস্ত দেশ। সেখানে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা এবং প্রাণহানি আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশ নিজের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে শান্তি ও স্থিতিশীলতা আনয়ন করতে সক্ষম হয়েছে। এই অস্থির পরিবেশে পাকিস্তানে অবস্থানরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থী, বিশেষ করে নারী এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থীদের জীবন ও নিরাপত্তার বিষয়টি একটি বড় দুশ্চিন্তার কারণ।
মানব উন্নয়নের সামগ্রিক সূচকগুলোও দুই দেশের ক্রমবর্ধমান ব্যবধানকে স্পষ্ট করে। ২০২৫ সালের ‘ইউএনডিপি মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন’ অনুযায়ী, বাংলাদেশ পাকিস্তানের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে এগিয়ে রয়েছে। নারীর ক্ষমতায়ন, স্বাস্থ্যসেবা, ডিজিটাল সংযোগ এবং দারিদ্র্য বিমোচনে বাংলাদেশের যে ধারাবাহিক সাফল্য, তার বিপরীতে পাকিস্তানের স্থবিরতা দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে একটি বড় ব্যবধান তৈরি করেছে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশ পাকিস্তানের সঙ্গে সব ধরনের সম্পর্ক ছিন্ন করবে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে কূটনীতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গঠনমূলক আলোচনা অনেক সময় ভুল বোঝাবুঝি কমাতে এবং সুসম্পর্ক তৈরি করতে সহায়তা করে। কিন্তু শিক্ষা বিনিময় বা এই ধরনের অংশীদারত্ব হতে হবে স্বচ্ছ নীতি, বাস্তবসম্মত মূল্যায়ন এবং জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে। একটি প্রকৃত ‘জ্ঞান করিডোর’ তখনই সার্থক হয়, যখন তা শিক্ষার্থীদের শ্রেষ্ঠত্ব, উন্মুক্ত চিন্তা এবং ভবিষ্যতের যোগ্য করে গড়ে তোলার সুযোগ দেয়।
উপসংহার
একে নিছক কোনও রাজনৈতিক প্রতীকী প্রকল্পে রূপ দেওয়া উচিত নয়, যা বাস্তব শিক্ষার পরিবেশের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। বাংলাদেশকে আরও গভীরভাবে ভাবতে হবে যে এই ধরনের নীতি আমাদের তরুণ প্রজন্মের কাছে কী বার্তা দিচ্ছে। যদি বিশ্বমানের শিক্ষাই আমাদের নীতিনির্ধারকদের লক্ষ্য হয়, তবে আমাদের শিক্ষা-কূটনীতিও সেই দেশগুলোর সাথেই হওয়া উচিত—যারা উন্নত গবেষণা ব্যবস্থা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা সংস্কৃতির চর্চা করে।
পরিশেষে বলতে চাই, ‘পাকিস্তান-বাংলাদেশ নলেজ করিডোর’ নিয়ে এই বিতর্ক কোনও বিদ্বেষপ্রসূত বিষয় নয়। এটি আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বুদ্ধিবৃত্তিক সুরক্ষা, নিরাপত্তা এবং আত্মমর্যাদার সাথে জড়িত। শিক্ষা একটি জাতির চরিত্র গঠন করে। তাই এই খাতের যেকোনও সিদ্ধান্ত আবেগ বা প্রতীকের ওপর ভিত্তি করে না নিয়ে বরং তথ্য-প্রমাণ, কৌশলগত দূরদর্শিতা এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে নেওয়া প্রয়োজন। এই উদ্যোগ আরও বিস্তৃত করার আগে আমাদের বিবেকের আয়নার সামনে দাঁড়াতে হবে এবং প্রশ্ন করতে হবে—এই করিডোর কি আমাদের অগ্রগতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে, নাকি পেছনের কোনও অন্ধকারে ঠেলে দিচ্ছে?
লেখক: পিএইচডি গবেষক, ইউনিভার্সিটি অব লুইভেল, যুক্তরাষ্ট্র



