একাডেমিয়া ডায়ালগ ২০২৬: বিশ্ববিদ্যালয়ে সামাজিক ব্যবসা অন্তর্ভুক্তির উপায় নিয়ে আলোচনা
একাডেমিয়া ডায়ালগ ২০২৬: বিশ্ববিদ্যালয়ে সামাজিক ব্যবসা নিয়ে আলোচনা

সামাজিক ব্যবসার ধারণাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠক্রম ও প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রমে আরও গভীরভাবে অন্তর্ভুক্ত করার উপায় নিয়ে আলোচনা করতে সোমবার (২৯ জুন) মিরপুরের টেলিকম ভবনে অনুষ্ঠিত হলো অ্যাকাডেমিয়া ডায়ালগ ২০২৬। সোশ্যাল বিজনেস ডে ২০২৬-এর অন্যতম প্রধান এই আয়োজনে অংশ নেন শিক্ষাবিদ, গবেষক এবং সামাজিক ব্যবসা-সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

প্যানেল আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা

দুটি প্যানেল আলোচনা ও সমাপনী পর্বে অনুষ্ঠিত এই সংলাপে বিশ্বব্যাপী ইউনূস সোশ্যাল বিজনেস সেন্টার (ওয়াইএসবিসি) নেটওয়ার্কের প্রতিনিধিদের পাশাপাশি বাংলাদেশ, জাপান, তাইওয়ান, মেক্সিকো, ইতালি, স্পেন ও থাইল্যান্ডের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাবিদরা অংশ নেন। অ্যাকাডেমিয়া ডায়ালগ ২০২৬-এর সূচনা ও সমাপনী বক্তব্য প্রদান করেন নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সামাজিক ব্যবসার ধারণাকে শিক্ষা, গবেষণা ও উদ্ভাবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানান।

প্রথম প্যানেল: সামাজিক ব্যবসাকে মূলধারায় আনা

সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটির ড. ফারহানা ফেরদৌসীর সঞ্চালনায় প্রথম প্যানেলে আলোচনা হয় কীভাবে সামাজিক ব্যবসাকে শুধু বিজনেস স্কুলের একটি বিষয় হিসেবে সীমাবদ্ধ না রেখে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার মূলধারায় নিয়ে আসা যায়। গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুহাম্মদ ইব্রাহিম বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে একটি নির্দিষ্ট অনুষদের গণ্ডি পেরিয়ে উদ্যোক্তা তৈরির দিকে অগ্রসর হতে হবে। তিনি প্রচলিত এমবিএর পরিবর্তে ‘মাস্টার অব এন্টারপ্রেনিউরিয়াল আর্টস’ চালুর ধারণা তুলে ধরেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আইইউবিএটির অধ্যাপক ড. আবদুর রব বলেন, উদ্যোক্তা উন্নয়ন কর্মসূচিতে সামাজিক ব্যবসা বিষয়ে অন্তত তিনটি বাধ্যতামূলক কোর্স অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। তিনি উল্লেখ করেন, ক্ষুদ্রঋণ ইতোমধ্যে বাংলাদেশের লাখো মানুষের জীবন বদলে দিয়েছে। এখন একাডেমিয়ার দায়িত্ব হলো সামাজিক উদ্দেশ্যভিত্তিক ব্যবসায়িক মডেলকে আর্থিকভাবে টেকসই ও লাভজনক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা এবং এ বিষয়ে মানুষের আস্থা তৈরি করা।

নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. রফিউদ্দিন আহমেদ বলেন, ক্যানভা, উদেমি ও এডএক্স-এর মতো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম শিক্ষার্থীদের বিশ্বমানের শিক্ষা ও আয়ের সুযোগের সঙ্গে যুক্ত করছে। তিনি মনে করেন, উদ্যোক্তা শিক্ষা দশ বছর বয়স থেকেই শুরু হওয়া উচিত। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেন, সময়ের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে ব্যর্থ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অচিরেই প্রাসঙ্গিকতা হারাবে। তিনি উল্লেখ করেন, দেশে প্রায় ৪০ লাখ স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী বেকার রয়েছেন, অথচ ঘরে বসে পরিচালিত ক্ষুদ্র উদ্যোগগুলো ক্রমেই সফলতা অর্জন করছে।

গ্রামীণ ফাউন্ডেশনের অ্যালেক্স কাউন্টস বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় ও অলাভজনক প্রতিষ্ঠানের অংশীদারিত্ব নতুন সেবা ও উদ্যোগের সামাজিক মূল্য নিয়ে গভীরভাবে ভাবার সুযোগ তৈরি করে। অন্যদিকে মেক্সিকোর ইউনিভার্সিদাদ অটোনোমা দে বাজা ক্যালিফোর্নিয়ার সান্তোস জুডিথ মার্টিনেজ রামোস আন্তর্জাতিক সহযোগিতাকে পারস্পরিক জ্ঞান বিনিময়ের একটি কার্যকর মাধ্যম হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও মেক্সিকোর বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণাগারগুলো একসঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর নানা সমস্যা মোকাবিলায় কাজ করতে পারে।

দ্বিতীয় প্যানেল: ওয়াইএসবিসি নেটওয়ার্কের কার্যক্রম

জাপানের কিউশু বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. আশির আহমেদের সঞ্চালনায় দ্বিতীয় প্যানেলে বিশ্বব্যাপী ইউনূস সোশ্যাল বিজনেস সেন্টার (ওয়াইএসবিসি) নেটওয়ার্কের কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা হয়। তিনি জানান, বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ১১৬টি ওয়াইএসবিসি কার্যক্রম পরিচালনা করছে এবং ১১৭তম কেন্দ্রটি প্রতিষ্ঠিত হবে গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয়ে।

মালয়েশিয়ার আলবুখারি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ড. ইউসনিদাহ ইব্রাহিম সামাজিক ব্যবসা বিষয়ে পৃথক পাঠক্রম প্রণয়ন এবং আন্তর্জাতিক গবেষণা নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার উদ্যোগ তুলে ধরেন। তাইওয়ানের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক চিয়েন-ওয়েন মার্ক শেন স্থানীয় সরকারকে ক্ষুদ্র-ঋণভিত্তিক তহবিলের মাধ্যমে সামাজিক ব্যবসায় সহায়তা দেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, আগামী দশকে ওয়াইএসবিসিগুলোর কার্যকারিতা মূল্যায়নে ইএসজি সূচক ও সনদায়ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

জাপানের রিউকোকু ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক নাওকো ওইশি জানান, স্থানীয় জনগণের আগ্রহের ভিত্তিতে তরুণ শিক্ষার্থীদের জন্য সোশ্যাল বিজনেস এক্সপোজার প্রোগ্রাম চালু করা হয়েছে। তিনি গ্রামীণ ইউগ্লেনাকে বহুমাত্রিক সহযোগিতার একটি সফল উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন। ইতালির ইউনিভার্সিটি অব বোলোনিয়ার অধ্যাপক জিউসেপ্পে তোরলুচ্চিও এবং স্পেনের ইউনিভার্সিটি অব মুর্সিয়ার অধ্যাপক আলিসিয়া মারিয়া রুবিও বানিওন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং নতুন প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা কীভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে সামাজিক প্রভাব শিক্ষা ও মূল্যায়নের পদ্ধতিকে পরিবর্তন করছে, সে বিষয়ে আলোচনা করেন।

স্পেনের ইউনিভার্সিটি অব কান্তাব্রিয়ার অধ্যাপক আনা ফার্নান্দেজ লাভিয়াদা বলেন, ২০১৫ সালের আগে সামাজিক ব্যবসার প্রভাব নিয়ে বৈশ্বিক তথ্যভাণ্ডার প্রায় ছিল না বললেই চলে। বর্তমানে এই ঘাটতি পূরণে একটি আন্তর্জাতিক উদ্যোগ চলছে, যা নেটওয়ার্কের সম্মিলিত প্রভাব তুলে ধরতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

নেতৃত্ব বিকাশ ও সমাপনী বক্তব্য

আলোচনায় নেতৃত্ব বিকাশের বিভিন্ন দিকও উঠে আসে। অ্যালেক্স কাউন্টস বলেন, নেতা জন্মগতভাবে প্রাপ্ত গুণ নয়; দক্ষ শিক্ষক ও পরামর্শকদের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে নেতৃত্বের গুণাবলি অর্জন করে। সমাপনী বক্তব্যে এআইটি/ইউনূস থাইল্যান্ডের ড. ফয়েজ শাহ বলেন, কাউকে সাইকেল চালানো শেখানো যেমন প্রয়োজন, তেমনি বাস্তব পরিস্থিতিতে টিকে থাকার সক্ষমতা অর্জনের জন্য বাস্তব অভিজ্ঞতাও অপরিহার্য। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শিল্পখাতের অভিজ্ঞতা, বাস্তবমুখী শিক্ষা ও গবেষণাভিত্তিক প্রকাশনার পাশাপাশি উদ্ভাবনের অর্থায়ন নিশ্চিত করতে সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানান।

গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নিয়াজ আহমেদ খান বলেন, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ধারাবাহিক দক্ষতা উন্নয়ন, বাংলাদেশের বাস্তবতার সঙ্গে সামাজিক ব্যবসার ধারণার সামঞ্জস্য এবং ওয়াইএসবিসি নেটওয়ার্কের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা আরও জোরদার করা প্রয়োজন। ওয়াইএসবিসি নেটওয়ার্কের কার্যক্রম দ্রুতই আরও সম্প্রসারিত হবে বলে আশা প্রকাশ করেন ইউনূস সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক লামিয়া মোরশেদ। তিনি জানান, আগামী বৈশ্বিক ওয়াইএসবিসি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে ২০২৬ সালের অক্টোবরে। এছাড়া, এ বছরের আলোচনায় উত্থাপিত উদ্যোগগুলো বাস্তবায়নে একটি বিশেষ ভেঞ্চার টিম গঠনের পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।