নাচোলের ঐতিহ্যবাহী বালিকা বিদ্যালয়ের সুবর্ণজয়ন্তী উদ্যাপন, মন্ত্রীর উপস্থিতিতে মিলনমেলা
নাচোল বালিকা বিদ্যালয়ের সুবর্ণজয়ন্তী, তিন প্রজন্মের মিলনমেলা

নাচোলের ঐতিহ্যবাহী বালিকা বিদ্যালয়ের সুবর্ণজয়ন্তী উদ্যাপন

চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল উপজেলার খুরশেদ মোল্লা সরকারি উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে সুবর্ণজয়ন্তীর আনন্দে মেতেছে তিন প্রজন্মের হাজারো ছাত্রী। গত রবি ও সোমবার দুই দিনব্যাপী এই অনুষ্ঠানে ঈদের আমেজের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় প্রতিষ্ঠানটির পঞ্চাশ বছর পূর্তির উৎসব।

মাটির দেয়াল থেকে সুরম্য ভবনের যাত্রা

নাচোলের প্রথম বালিকা উচ্চবিদ্যালয় হিসেবে খুরশেদ মোল্লা সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয়েছিল মাটির দেয়াল আর খড়ের ছাউনি দিয়ে। সময়ের ব্যবধানে আজ তা পরিণত হয়েছে সুরম্য ভবনে। গতকাল সোমবার সকাল আটটা থেকে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে জড়ো হতে থাকেন নবীন ও প্রবীণ ছাত্রীরা। সাড়ে ৯টায় আনন্দ শোভাযাত্রার মধ্য দিয়ে শুরু হয় মূল অনুষ্ঠানের আয়োজন।

সকাল ১০টায় জাতীয় সংগীতের সঙ্গে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। এরপর থিম সংয়ের সঙ্গে নৃত্য পরিবেশন করে বিদ্যালয়ের বর্তমান ছাত্রীরা। উন্মোচন করা হয় স্মৃতিস্মারক। আকাশি রঙের শাড়ি পরে নবীন-প্রবীণ ছাত্রীদের হাস্যোজ্জ্বল বসে থাকার দৃশ্য ছিল সকলের নজর কাড়ার মতো।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ভূমিমন্ত্রীর উপস্থিতি ও বিশেষ বক্তব্য

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু। তাঁর উপস্থিতি অনুষ্ঠানে যোগ করে ভিন্নমাত্রা। চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোলের বিপ্লবী ইলা মিত্রের কথা স্মরণ করে তিনি বক্তব্য দেন। ভূমিমন্ত্রী ছাত্রীদের উদ্দেশে বলেন, ‘একদিন এই বিদ্যালয়ের কোনো ছাত্রী এমন কিছু আবিষ্কার করবে, যাতে দেশে-বিদেশে এই বিদ্যালয়ের মুখ উজ্জ্বল হবে। ছাত্রীর নাম পরিচিত হবে। আমরা সেই দিনের প্রত্যাশায় থাকলাম।’ তিনি উল্লেখ করেন যে তাঁর পূর্বপুরুষ এ নাচোলের বাসিন্দা ছিলেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা পরিষদের নবনিযুক্ত প্রশাসক ও সাবেক সংসদ সদস্য হারুনুর রশীদ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আমিনুল ইসলাম, নাচোল মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ ওবায়দুর রহমান প্রমুখ। নাচোলের রত্নগর্ভা মা রওশন আরা বেগমসহ নাচোলে নারীশিক্ষা ও বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রাখার জন্য ৪৫ জনের হাতে সম্মাননা স্মারক তুলে দেওয়া হয়।

তিন প্রজন্মের আবেগময় মিলন

নারীশক্তি–বিষয়ক গীতিনাট্য পরিবেশন করেন বিদ্যালয়ের বর্তমান ছাত্রীরা। স্মৃতিচারণায় বিদ্যালয়ে নিজেদের শৈশবের সোনালি দিনের স্মৃতির ঝাঁপি খুলে আবেগাপ্লুত হন প্রবীণ ছাত্রীরা। ১৯৯১ সালের এসএসসি ব্যাচের ছাত্রী খাদিজাতুল খাতুন ও তাজ কেরা অনুষ্ঠানে যোগ দিতে যথাক্রমে ঢাকা ও দিনাজপুর থেকে এসেছেন। তাঁরা বলেন, বাবার বাড়িতে ঈদ উদ্যাপন ও সুবর্ণজয়ন্তীর আনন্দ মিলেমিশে একাকার। তবে অনুষ্ঠানের আনন্দই বেশি পেয়েছেন। অনেক পুরোনো বান্ধবীর সঙ্গে দেখা হয়েছে। গত দুই দিনের আয়োজনকে কেন্দ্র করে তাঁরা শৈশবে ফিরে গিয়েছিলেন।

মা রিতা রানী মণ্ডল এসেছিলেন দুই মেয়েকে নিয়ে। তিনিও এই বিদ্যালয়ে পড়েছেন। এখন এক মেয়ে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে। অন্য মেয়েও প্রাক্তন ছাত্রী, যিনি বর্তমানে রাজশাহী সিটি কলেজে স্নাতক পড়ছেন। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ুয়া শ্রেয়া মণ্ডল বলে, ‘আমার মা ও বড় বোনের বিদ্যালয়েই পড়ি। এটা আমার কাছে ভালো লাগার বিষয়।’

প্রথম ব্যাচের ছাত্রীর স্মৃতিচারণ

বিদ্যালয়ের প্রথম ব্যাচের ছাত্রী রাবেয়া খাতুন এসেছিলেন ক্রাচে ভর দিয়ে। তিনি বলেন, ‘মাটির দেয়ালের ওপর খড়ের ছাউনির ক্লাসরুমে পানির ওপর বসে ক্লাস করার স্মৃতি এখনো মনে পড়ে। ১৯৮১ সালে আমরা ১০ জন এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছিলাম। পাস করেছিলাম চারজন। তার মধ্যে আমিও ছিলাম। অন্যরা পরের পরীক্ষা দিয়ে পাস করে। আজকে কাউকে না দেখে একটু মন খারাপ হলেও জুনিয়র প্রবীণ ও নাতনির বয়সী বর্তমান ছাত্রীদের সঙ্গে গল্প করে মন ভালো হয়ে গেছে। মনে থাকবে দিনটির কথা।’

খুরশেদ মোল্লা সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নজরুল ইসলাম জানান, প্রায় দেড় হাজার নবীন ও প্রবীণ ছাত্রী অনুষ্ঠানে নিবন্ধন করেছিলেন। বিকেল থেকে ছিল মেহেদি উৎসব ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। গত রবি ও সোমবার রাত ১১টা পর্যন্ত চলে অনুষ্ঠান। দুই দিন নবীন-প্রবীণ ছাত্রীদের সঙ্গে তাঁরা শিক্ষকেরাও আনন্দে মেতেছিলেন।

এই অনুষ্ঠান শুধু একটি বিদ্যালয়ের পঞ্চাশ বছর পূর্তিই নয়, বরং নাচোল অঞ্চলে নারীশিক্ষার অগ্রযাত্রার একটি জীবন্ত দলিল হয়ে রইল। তিন প্রজন্মের ছাত্রীদের এই মিলনমেলা স্থানীয় শিক্ষা ইতিহাসে একটি উজ্জ্বল অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হবে।