শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জমি দখল ও জাল সনদে মহোৎসব: ডিআইএর তদন্তে চাঞ্চল্যকর তথ্য
সারা দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জমি দখলের এক নজিরবিহীন চিত্র উঠে এসেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) সর্বশেষ তদন্ত প্রতিবেদনে। ৮ হাজার ১১৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বেহাত হওয়া জমির পরিমাণ ২ হাজার ১৮৭ একর। এসব জমি দখল করে স্থানীয় প্রভাবশালীরা গড়ে তুলেছেন পার্ক, কমিউনিটি সেন্টার, গ্যারেজ, দোকান, ক্লাবঘর, বস্তি, কাঁচাবাজারসহ নানা প্রতিষ্ঠান। যুগের পর যুগ ধরে তারা দখলে রেখেছেন। সরকার পরিবর্তন হয়, কিন্তু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জায়গা কখনো দখলমুক্ত হয় না।
সুপারিশ ফাইলবন্দি, কার্যকর পদক্ষেপ নেই
উদ্ধারের সুপারিশ সংক্রান্ত ডিআইএর চিঠি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ফাইলবন্দি অবস্থায় রয়েছে পাঁচ বছর ধরে। অদৃশ্য কারণে মন্ত্রণালয় সুপারিশ বাস্তবায়নে কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করে না। জানা গেছে, ডিআইএ পাঁচ বছরে মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছে ৮ হাজার ১৮০টি তদন্ত প্রতিবেদন। ২০২১ সালের জুলাই থেকে চলতি বছর ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বেসরকারি এমপিওভুক্ত বিদ্যালয়, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি মিলিয়ে মোট ৮১১৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরেজমিন তদন্ত করেছে ডিআইএ।
জাল সনদ ও ভুয়া নিয়োগের মহোৎসব
এতে দেখা গেছে, তৃণমূল পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ভুয়া নিয়োগ এবং জাল সনদের রীতিমতো মহোত্সব চলছে। ৭৩৯ জন শিক্ষকের জাল সনদ চিহ্নিত হয়েছে। ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলার একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তদন্ত চালিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। সেখানে ৬৩ জন শিক্ষকের মধ্যে ৫৭ জনের সনদই ‘জাল’ বলে শনাক্ত হয়েছে। অর্থাত্ প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৯০ শতাংশ শিক্ষকই জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছেন।
কেবল জাল সনদই নয়, ভুয়া অভিজ্ঞতা এবং অনুমোদনহীন বিষয়ে নিয়মবহির্ভূতভাবে নিয়োগের মতো চাঞ্চল্যকর অনিয়মও ধরা পড়েছে। ডিআইএর প্রতিবেদনে জালিয়াতির মাধ্যমে আত্মসাত্ করা অর্থ এবং বকেয়া ভ্যাট-ট্যাক্সসহ মোট ৫৩৫ কোটি ৪৮ লাখ টাকা দ্রুত সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
অর্থের অপব্যবহার ও ভ্যাট ফাঁকি
এদিকে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে টিউশনসহ বিভিন্ন ফি বাবদ প্রতি বছর ৩০ হাজার কোটি টাকা নেওয়া হয়, এর বড় অংশ ‘মিসইউজ’ হচ্ছে বলে ডিআইএর তদন্তে উঠে এসেছে। কেনাকাটার ক্ষেত্রে ভ্যাট-ট্যাক্স ফাঁকি দিচ্ছে অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
ডিআইএ পরিচালকের বক্তব্য
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে কঠোর অবস্থান: পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) পরিচালক অধ্যাপক এম এম সহিদুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে আমাদের এই কঠোর অবস্থান। আমরা চাই শিক্ষাব্যবস্থা একটি সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ অবস্থায় ফিরে আসুক। জাল সনদধারীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা ছাড়া বিকল্প কিছু নেই।’
তিনি বলেন, ‘জাল সনদ শনাক্তে আমরা নিয়মিতভাবে কাজ করছি এবং সাম্প্রতিক সময়ে এ ধরনের অনিয়ম আগের তুলনায় বেশি পরিমাণে সামনে আসছে। আমাদের কাছে যেসব সনদ সন্দেহজনক মনে হয়, সেগুলো সংশ্লিষ্ট সনদপ্রদানকারী কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাই করা হয়। লিখিতভাবে জাল প্রমাণিত হলেই আমরা তা আনুষ্ঠানিকভাবে নথিভুক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পরবর্তী ধাপে পাঠাই।’
তিনি আরো বলেন, ‘অনেক ক্ষেত্রে প্রাথমিকভাবে অনিয়মের চিত্র স্পষ্ট হলেও পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত তা প্রকাশ করা যায় না। কারণ, একটি সনদ বা নিয়োগের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে একাধিক সংস্থার যাচাই প্রয়োজন হয়। এছাড়া কিছু ঘটনায় শুধু জাল সনদ নয়, অবৈধ নিয়োগ, ভুয়া অভিজ্ঞতা এবং নিয়মবহির্ভূতভাবে পদ সৃষ্টির মতো বিষয়ও পাওয়া যাচ্ছে, যা পুরো প্রক্রিয়াকে আরো জটিল করে তুলছে। আমরা চাই প্রাথমিকভাবে শনাক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার একটি কার্যকর প্রক্রিয়া চালু হোক। বিষয়টি ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট মহলে প্রস্তাব আকারে তুলে ধরা হয়েছে। নতুন করে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া গেলে শিক্ষা খাতে এই অনিয়ম অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।’
পাঁচ বছরের তদন্তে যা উঠে এলো
জানা গেছে, গত বছরের জুলাই থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৭৩৬টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তদন্ত করেছে ডিআইএ। এসব প্রতিষ্ঠানের ১৪৭ জন শিক্ষকের জাল সনদ শনাক্ত হয়েছে। তাদের কাছ থেকে ১১৫ কোটি ৮৭ লাখ টাকা ফেরত নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। ৭৩৬টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ১৯৯ একর জায়গা বেহাত হয়েছে বলে ডিআইএর তদন্তে উঠে এসেছে।
- ২০২৪-২৫ অর্থবছরে: ৭১২ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তদন্ত করা হয়। এ সময় ২৭৪ শিক্ষকের জাল সনদ চিহ্নিত হয়। এই সময় ১৯৫ কোটি ৬৮ লাখ টাকা ফেরত নেওয়ার সুপারিশ করা হয়। ৭১২ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৬৫৭ একর জমি প্রভাবশালীদের দখলে রয়েছে।
- ২০২৩-২৪ অর্থবছরে: ২ হাজার ৩৫৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তদন্ত করে ডিআইএ। এ সময় ১০৫ জন শিক্ষকের জাল সনদ চিহ্নিত হয়। এই সময় ৮৩ কোটি ৯০ লাখ টাকা ফেরত নেওয়ার সুপারিশ করা হয়। ২ হাজার ৩৫৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ২৩২ একর জমি প্রভাবশালীদের দখলে রয়েছে।
- ২০২২-২৩ অর্থবছরে: ২ হাজার ২০৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তদন্ত করে ডিআইএ। এ সময় ১২৭ জন শিক্ষকের জাল সনদ চিহ্নিত হয়। এই সময় ৯৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা ফেরত নেওয়ার সুপারিশ করা হয়। ২ হাজার ২০৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৪৬৫ একর জমি প্রভাবশালীদের দখলে রয়েছে।
- ২০২১-২২ অর্থবছরে: ২ হাজার ১০৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তদন্ত করে ডিআইএ। এ সময় ৮৬ জন শিক্ষকের জাল সনদ চিহ্নিত হয়। ৪৩ কোটি ৫৩ লাখ টাকা ফেরত নেওয়ার সুপারিশ করা হয়। ২ হাজার ১০৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৬৩৮ একর জমি প্রভাবশালীদের দখলে রয়েছে।
যেসব স্কুলের জায়গা বেদখল
১৯৭৯ সালে ডিআইএ প্রতিষ্ঠা হয়। এটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি সংস্থা। শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়ন এবং আর্থিক স্বচ্ছতা আনতে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো পরিদর্শন ও নিরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় সুপারিশ করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন জমা দেয় তারা। অবশ্য কখনো কখনো এই প্রতিষ্ঠানের কোনো কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও পরিদর্শনের সময়ে শিক্ষক-কর্মচারীদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার অভিযোগ ওঠে।
ডিআইএর পরিদর্শন ও অনুসন্ধান থেকে জানা যায়, ১২০ বছর ধরে সিলেটের সরকারি অগ্রগামী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের জমি দখলের অভিযোগ উঠেছে। কর্তৃপক্ষ বারবার আবেদন নিবেদন করেও উদ্ধার করতে পারছে না দখল হওয়া জমি। শিক্ষা বিভাগ, জেলা প্রশাসকের সহযোগিতা চেয়েছেন। আর জেলা প্রশাসক শুনিয়েছেন আশ্বাসের কথা। সিলেট সিটি করপোরেশন নগর সৌন্দর্যকরণ প্রকল্পের আওতায় জল্লারপারে নালার ওপর পাকা করে ওয়াকওয়ে নির্মাণ করেছে। চিত্তবিনোদনের জন্য নির্মিত এ জায়গাটি লিজও দেওয়া হয়। লিজগ্রহীতারা লিজ অংশের বাইরের জমিতে পার্ক বানিয়ে দিয়েছে। এ পার্কের জায়গাটি সরকারি অগ্রগামী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের।
শুধু এই জায়গা নয়, এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রায় ৫ একর জমির মধ্যে উত্তর দিকের কয়েক একর জমি দখল করে নির্মাণ করা হয়েছে হাইরাইজ বিল্ডিং। প্রতিষ্ঠান প্রধান দখল করা জমি উদ্ধারে দীর্ঘদিন চিঠি চালাচালি করে ব্যর্থ হন।
ঢাকার রমনা, শান্তিনগর এলাকায় নয়াটোলা এ ইউ এন মডেল কামিল মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করা হয় ১৯৭০ সালে। অনুমোদনের সময় ৯৩ শতাংশ জমি দেখানো হলেও বর্তমানে জমি রয়েছে ৭১ দশমিক ৮৯ শতাংশ। যাত্রাবাড়ী মান্নান হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ ১৯৮৩ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয়। অনুমোদনের সময় ৫৯ দশমিক ২৮ শতাংশ জমি খারিজ করা হয় প্রতিষ্ঠানের নামে। আরো ২৬ দশমিক ৪০ শতাংশ জমি প্রতিষ্ঠানের নামে কিনতে তহবিল থেকে ব্যয় করা হয় ১৫ লাখ টাকা। ডিআইএর সবশেষ পরিদর্শনে সেখানে ৮৪ দশমিক ৯০ শতাংশের বদলে ৩০ শতাংশ জমির অস্তিত্ব মেলে। বাকি জমির কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
ডিআইএর তথ্যমতে, আগের চেয়ে জমি কমে যাওয়া একটি প্রতিষ্ঠান গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার কে কে টি হাজী এন সি ইনস্টিটিউট। ৭৪ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠান ২৭ বছর আগে একবার পরিদর্শন করেছিল ডিআইএ। তখন বিদ্যালয়ের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পরিদর্শন প্রতিবেদনে বিদ্যালয়ের জমির পরিমাণ ছিল ৪ দশমিক ৩৯ একর। ডিআইএ ২০২২ সালে প্রতিষ্ঠানটি আবারও পরিদর্শন করে ঐ বছরের গত ২১ এপ্রিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে যে প্রতিবেদন জমা দেয়, তাতে বলা হয় বিদ্যালয়টির জমির পরিমাণ ৩ দশমিক ৪০ একর। ২৭ বছরে কমেছে প্রায় এক একর জমি।
ঢাকার গেন্ডারিয়ায় শ্যামপুরে ফজলুল হক মহিলা কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হয় ১৯৭০ সালে। শুরুতে এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ২ দশমিক ৩২ একর জমি থাকলেও বর্তমানে ১ দশমিক ০৫ একর জমি রয়েছে। পরিদর্শনে এক একরের বেশি জমি বেহাত হওয়ার প্রমাণ পেয়েছে ডিআইএ। পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলায় মির্জাপুর পাবলিক স্কুলের জমি দখলের প্রতিবাদ ও জমি রক্ষায় মানববন্ধন করেন স্কুলের তিন শতাধিক শিক্ষার্থী অভিভাবকসহ শিক্ষকরা।
