শিক্ষায় শিখন ঘাটতি মোকাবিলায় জোর দিতে হবে: গোলটেবিল বৈঠকে বিশেষজ্ঞদের মতামত
গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা স্তরে অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং ভর্তির হার বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। তবে, শ্রেণিকক্ষে শেখার মান এখনও কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি। শিক্ষা খাতের প্রধান সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে শিখন ঘাটতি। প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করেও বহু শিশু গণিতের মতো মৌলিক দক্ষতা অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে। এর ফলে, ‘শিক্ষা থেকে কর্মসংস্থানমুখী দক্ষতা এবং দক্ষতা থেকে কর্মসংস্থান’—এই মানবসম্পদ উন্নয়ন কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ছে।
গোলটেবিল বৈঠকে অংশগ্রহণকারীদের মূল বক্তব্য
গবেষণাপ্রতিষ্ঠান আইআইডি ও প্রথম আলোর উদ্যোগে আয়োজিত ‘শিক্ষায় নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে শিক্ষক ও শিক্ষাসংশ্লিষ্ট খাতের অংশীজনেরা একমত হয়েছেন যে, এখন সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দিতে হবে শিখন ফল অর্জনের ওপর। এ জন্য মনোযোগ বাড়াতে হবে শ্রেণিকক্ষের শিক্ষায় এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার ওপর জোর দিতে হবে। গত বুধবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেন, ‘আমাদের ফোকাস থাকবে লার্নিং আউটকাম বেজড এডুকেশন, ক্যারিয়ারভিত্তিক এডুকেশন।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন, শিক্ষায় ছোট ছোট পরিবর্তন করলেই দীর্ঘ মেয়াদে অনেক পরিবর্তন পাওয়া যাবে। এই ছোট ছোট তিনটি জায়গা হলো শিক্ষাক্রম, শ্রেণিকক্ষ এবং ধারাবাহিকতা। শিক্ষাক্রম যদি ঠিক হয়, শ্রেণিকক্ষ যদি সঠিক হয় এবং এটি যদি ধারাবাহিকভাবে করা যায়, তাহলে শিক্ষায় অনেক পরিবর্তন হবে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রাথমিকে গর্ব করার মতো অনেক কিছু আছে এবং ঝরে পড়াও কম। তবে, একই সঙ্গে অনেকে না শিখে বের হয়। তিনি কারিগরি শিক্ষায় বড় ধরনের জোর দেওয়ার কথা জানান এবং স্পোর্টস, আর্টস, সংস্কৃতির ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন। বাজেটের আরও বড় অংশ শিক্ষা খাতে দেওয়ার ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী ইতিমধ্যে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বলে তিনি জানান। বর্তমানে শিক্ষা খাতের বরাদ্দ জিডিপির ২ শতাংশের আশপাশে থাকে, এটিকে ৫ শতাংশে উন্নীত করা হবে—এটি প্রধানমন্ত্রীর প্রতিজ্ঞা।
বিশেষজ্ঞদের মতামত ও সুপারিশ
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের কমিশনার ইলিরা দেওয়ান পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষকসংকটসহ বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরে সেগুলোর সমাধানের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, ‘সমতা নয়, সাম্যের ব্যবস্থা করতে হবে।’
হলিক্রস কলেজের অধ্যক্ষ সিস্টার শিখা গোমেজ বলেন, ‘একটি প্রগতিশীল শিক্ষা আমরা চাই। সে কারণে শিক্ষাক্রমে ফোকাস দরকার। শিক্ষক নিয়োগ ও তাঁদের প্রশিক্ষণ দেওয়া ও গবেষণার জায়গাটি খুবই জরুরি। শিক্ষক কেন শিক্ষা-বাণিজ্য করছেন? কেন কোচিং করাচ্ছেন, এই বিষয়টিও তলিয়ে দেখা দরকার।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন, কাগজে-কলমে উচ্চমাধ্যমিক দুই বছর হলেও ১৫ মাসও পাওয়া যায় না এবং নিয়মিত ক্লাস হচ্ছে না।
আইআইডির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সাঈদ আহমেদ একটি মূল্যায়ন প্রতিবেদনের তথ্য তুলে ধরে বলেন, প্রাথমিকে যারা পড়াশোনা শেষ করছে, তাদের অর্ধেকের বেশির মৌলিক দক্ষতা নেই। গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা শহরের শিক্ষার্থীদের থেকে আরও পিছিয়ে আছে। ১০ বছরের শিশুদের মধ্যে ৩২ শতাংশ পড়তে পারে ও গণিত বোঝে, অর্থাৎ প্রতি ১০ জনের ৭ জন পারছে না। ঝরে পড়ার কারণ হিসেবে ২০২৩ সালের একটি গবেষণার তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, ৩৯ শতাংশ অভিভাবক আর্থিক অসামর্থ্যকে ঝরে পড়ার প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।
ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ বলেন, ‘শিক্ষার গোড়ায় সমস্যা মন্তব্য করে বলা যায়, সমস্যা ডায়াগনস্টিক না করে হুট করে চমক দেখাতে গেলে আবারও প্রকল্পভিত্তিক উন্নয়ন-উদ্যোগের চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়ে যেতে হবে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সুমেরা আহসান বলেন, শিক্ষা বিষয়ে খাতভিত্তিক পরিকল্পনা করতে হয় এবং ভালো পরিবর্তনগুলো যেন সরকার পরিবর্তনের পর পরিবর্তন হয়ে না যায়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক রেজওয়ানা করিম স্নিগ্ধা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় বহু নির্বাচনী প্রশ্ন (এমসিকিউ) বন্ধ করার আহ্বান জানান এবং শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থী কমানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
মনিপুর উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষক আয়শা জাহান বলেন, বিদ্যালয়গুলোতে প্রকৃত শিক্ষকের সংকট রয়েছে এবং শিক্ষককে শ্রেণিকক্ষে পাঠানোর আগে কমপক্ষে তিন মাস বনিয়াদি প্রশিক্ষণ দেওয়া দরকার। তিনি আরও বলেন, ‘শিক্ষাঙ্গনে দলীয় রাজনীতির অযাচিত যে প্রভাব রয়েছে, এটা থেকে মুক্ত হওয়া দরকার।’
ব্র্যাকের আইইডির প্রোগ্রামের প্রধান সমীর রঞ্জন নাথ বলেন, শিক্ষায় প্রধান সমস্যা হচ্ছে শিখন ঘাটতি এবং এটি বিভিন্ন গবেষণা ও জরিপে এসেছে। কথা হচ্ছে কীভাবে এ থেকে মুক্ত হওয়া যাবে। এ জন্য মনোযোগ দেওয়া দরকার শ্রেণিকক্ষের শিক্ষায়।
প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরীর সঞ্চালনায় এই গোলটেবিল বৈঠকে আরও বক্তব্য দেন ইউনিসেফ বাংলাদেশের শিক্ষা বিভাগের প্রধান দীপা শংকর, ইউনিসেফের শিক্ষা কর্মসূচি বিশেষজ্ঞ ফাহমিদা শবনম, ইউনেসকোর কর্মসূচি কর্মকর্তা (শিক্ষা) শিরিন আক্তার, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির স্কুল অব জেনারেল এডুকেশনের ডিন সামিয়া হক।
