কুড়িগ্রামের স্কুল ভবনে নিরাপত্তাহীনতা: শিশুদের জন্য 'মরণ ফাঁদ' হয়ে দাঁড়িয়েছে দোতলা-তিনতলা ভবন
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দোতলা ও তিনতলা ভবনগুলো ক্রমশ শিশু শিক্ষার্থীদের জন্য 'মরণ ফাঁদ' হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। স্কুল ভবনের গ্রিলবিহীন বারান্দা এবং উন্মুক্ত ছাদে শিক্ষার্থীদের অবাধ বিচরণ দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে। গত সাত মাসে কুড়িগ্রাম জেলায় স্কুল ভবন থেকে পড়ে গিয়ে দুই শিশু শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছে। এ অবস্থায় শিশু শিক্ষার্থীদের জীবন রক্ষায় প্রতিটি স্কুল ভবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জোর দাবি জানিয়েছেন শিক্ষক ও অভিভাবকরা।
মৃত্যুর করুণ ঘটনা: হাবিবা ও আরেক শিশুর প্রাণহানি
গত ৬ এপ্রিল দুপুরে টিফিন বিরতিতে খেলার সময় চিলমারীর রানীগঞ্জ ইউনিয়নের কে ডি ওয়ারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দোতলা ভবনের বারান্দার রেলিং টপকে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী হাবিবা আক্তার হাসি (১১) নিচে পড়ে যায়। মাথায় গুরুতর আঘাত পাওয়া হাবিবাকে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে মৃত্যু হয়। এর আগে গত বছর ১৭ সেপ্টেম্বর নগেশ্বরী উপজেলার পশ্চিম নাগেশ্বরী বটতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাদ থেকে পড়ে একটি পাঁচ বছর বয়সী শিশুর মৃত্যু ঘটে। স্কুলে ঘুরতে আসা ভর্তিচ্ছু ওই শিশু কখন কীভাবে ভবনের ছাদে পৌঁছাল, তা কেউ বুঝে ওঠার আগেই নিচে পড়ে যায় বলে দাবি ওই স্কুলের শিক্ষকদের।
শিক্ষক ও অভিভাবকদের আতঙ্ক: স্কুলে পাঠাতে অনীহা
এসব ঘটনার পর একই নকশার স্কুল ভবনগুলোতে শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে শিক্ষক ও অভিভাবকরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। বিশেষ করে অভিভাবকদের মধ্যে বাচ্চাদের স্কুল পাঠাতে অনীহা দেখা দিচ্ছে। হাবিবার মা মরিয়ম বেগম বলেন, 'স্কুলের বারান্দায় গ্রিল থাকলে আমার মেয়ের এমন করুণ মরণ হইতো না। একই স্কুলে আমার ছেলে শিশু শ্রেণিতে পড়ে। আমি চাই না আর কোনও মায়ের বুক খালি হোক। ওই স্কুলসহ সব স্কুলে গ্রিল দিয়ে বাচ্চাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হোক।' একই স্কুলের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী রেজাউলের মা রঞ্জিনা বেগমও অনুরূপ দাবি জানান।
নকশাগত ত্রুটি: ৩০৯টি স্কুল ভবনে একই সমস্যা
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলার নয় উপজেলায় একই নকশার ৩০৯টি স্কুল ভবন রয়েছে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর (এলজিইডি) এসব ভবনের নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন করেছে। তবে এলজিইডির দাবি, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতর ভবনের নকশা অনুমোদন করেছে এবং এলজিইডি শুধু বাস্তবায়ন করেছে। শিক্ষক ও অভিভাবকরা বলছেন, দোতলা ও তিনতলা বিশিষ্ট এসব ভবনের বারান্দায় শর্ট রেলিং থাকলেও গ্রিল নেই। ভবনগুলোর দ্বিতীয় তলায় বারান্দার সঙ্গে একতলার ছাদে যাওয়ার পথ রয়েছে, ফলে শিশুরা সহজেই রেলিংয়ে উঠে পড়ছে বা ছাদে যেতে পারছে।
স্কুল পরিদর্শন: সরেজমিনে প্রমাণিত অভিযোগ
সরেজমিন জেলার কয়েকটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে এসব অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। নাগেশ্বরী উপজেলার কুটি পয়ড়াডাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দেখা গেছে, টিফিন বিরতির সময় স্কুলের দোতলা ভবনের দ্বিতীয় তলার রেলিং ধরে শিশুরা খেলছে এবং অনেকে ছাদের রেলিং ধরে গল্পে মেতে উঠেছে। অভ্যন্তরীণ ব্যয়ে ভবনের নিচতলার বারান্দার রেলিংয়ের ওপরের ফাঁকা অংশে গ্রিল দেওয়া হলেও দ্বিতীয় তলার বারান্দায় গ্রিল নেই। স্কুলটির প্রধান শিক্ষক শাহানাজ পারভীন বলেন, 'যে নকশায় ভবনগুলো তৈরি করা হয়েছে তা শিশুদের জন্য মোটেও নিরাপদ নয়। কেন যে এভাবে ভবনগুলো অনিরাপদ করে তৈরি করা হয়েছে তা আমরা জানি না। এগুলোতে পরিপূর্ণভাবে গ্রিল দিয়ে নিরাপদ করা দরকার।'
দায়িত্ব পালনে জটিলতা: কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
এ ব্যাপারে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার স্বপন কুমার রায় চৌধুরী বলেন, 'ভবনগুলোর নকশা শিশুদের জন্য নিরাপদ নয় বরং ক্রটিপূর্ণ। আমরা বিভিন্ন সভা ও সেমিনারে এগুলো বলে আসছি। বারান্দায় রেলিংয়ে ফাঁকা থাকায় এবং পুরো বারান্দায় গ্রিল না থাকায় শিশুদের নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। নিজেদের ব্যয়ে কিছু ভবনের বারান্দায় আমরা গ্রিল দেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছি।' অন্যদিকে, কুড়িগ্রাম এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী ইউনুস হোসেন বিশ্বাস বলেন, 'ভবনগুলোর নকশা প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতর অনুমোদন করেছে। এলজিইডি শুধু প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। স্থানীয়ভাবে নকশা পরিবর্তনের সুযোগ নেই। এটা মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ারাধীন।'
জরুরি পদক্ষেপের আহ্বান
প্রাথমিক শিক্ষক সমাজ ও প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগ একই নকশার স্কুল ভবনগুলোকে শিশু শিক্ষার্থীদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ও অনিরাপদ মনে করছে। তারা ভবনগুলোতে প্রয়োজনীয় গ্রিল স্থাপন করে শিশুদের জন্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। শিক্ষক ও অভিভাবকদের মতে, স্কুলে পাঠদান শুরুর আগে এবং টিফিন বিরতির সময় শিক্ষার্থীরা খেলায় মেতে ওঠে, তখন তাদের নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এতে করে দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই শিশু শিক্ষার্থীদের জীবন বাঁচাতে দ্রুত ও কার্যকরী নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।



