প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা বাংলাদেশে নতুন নয়। বিভিন্ন সময়ে নিয়োগ, ভর্তি ও পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে তুমুল বিতর্ক হয়েছে। তবে আনুষ্ঠানিক ঘোষণার আগেই সরকারি ওয়েবসাইটে পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রায় নজিরবিহীন। সেই ঘটনাই ঘটেছে ২০২৫ সালের প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষার ফল প্রকাশকে ঘিরে। নীতিমালা নিয়ে আইনি জটিলতা, পরীক্ষা পিছিয়ে যাওয়া এবং ফল প্রকাশে দীর্ঘ বিলম্বের পর এবার যোগ হয়েছে ‘ফল ফাঁস’ বিতর্ক। ফলে শুরু থেকেই আলোচনায় থাকা প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা আবারও কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে।
যেভাবে প্রকাশ পেল ৯ জেলার ফল
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের (ডিপিই) অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদন ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) আনুষ্ঠানিকভাবে ফল প্রকাশের কথা ছিল। সে অনুযায়ী এক দিন আগেই, অর্থাৎ ৮ জুলাই চূড়ান্ত ফল প্রস্তুত করে তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ (আইএমডি)। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের আগেই ঢাকা বিভাগের নয়টি জেলার ফল ওয়েব পোর্টালে উন্মুক্ত হয়ে যায়। অল্প সময়ের মধ্যেই তা ডাউনলোড করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। পরে কর্তৃপক্ষ লিংক সরিয়ে নিলেও ততক্ষণে ফল ছড়িয়ে পড়ে। ঘটনার পর ফল প্রকাশ স্থগিত করা হয়। পাশাপাশি দায়ীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং কারণ অনুসন্ধানে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১ জুলাই প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক সভায় ৯ জুলাই ফল প্রকাশের সিদ্ধান্ত হয়। সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ৮ জুলাই রাতেই ফল প্রকাশের প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়। ফল ঘোষণার পর দ্রুত প্রকাশের সুবিধার্থে প্রয়োজনীয় কারিগরি প্রস্তুতির দায়িত্ব দেওয়া হয় তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সহকারী প্রোগ্রামার আশরাফুল আলম এবং সহকারী মেইনটেন্যান্স ইঞ্জিনিয়ার মো. মেহতাব কায়েসকে। তাদের দায়িত্ব ছিল ব্যাক-এন্ডে প্রয়োজনীয় লিংক তৈরি, সার্ভার প্রস্তুত রাখা এবং ফল প্রকাশের প্রযুক্তিগত অবকাঠামো নিশ্চিত করা।
পরিকল্পনা ও ভুল
পরিকল্পনা ছিল, ৮ জুলাই রাত ১১টা ১৫ মিনিট থেকে তারা ব্যাক-এন্ডে বিভাগ ও জেলাভিত্তিক পৃথক লিংক তৈরির কাজ শুরু করেন। পরিকল্পনা ছিল, মন্ত্রীর প্রেস ব্রিফিংয়ের পর ওই লিংকগুলো সক্রিয় করা হবে এবং সঙ্গে সঙ্গে ফল প্রকাশ করা হবে। কিন্তু পরদিন সকাল ১০টা ৫ মিনিট থেকে আগে তৈরি করা লিংকগুলোতে ঢাকা বিভাগের নয়টি জেলার ফলাফল ‘পাবলিশড’ অবস্থায় আপলোড হয়ে যায়। প্রকাশিত জেলার মধ্যে ছিল মানিকগঞ্জ, ফরিদপুর, টাঙ্গাইল, শরীয়তপুর, নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ, মাদারীপুর, কিশোরগঞ্জ ও মুন্সিগঞ্জ। স্বল্প সময়ের মধ্যেই ব্যবহারকারীরা ফলাফল ডাউনলোড করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেন। পরে লিংক সরিয়ে ফেলা হলেও ততক্ষণে তা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
কী বলছে তদন্ত
প্রাথমিক তদন্তে বলা হয়েছে, এটি কোনো হ্যাকিং বা সাইবার হামলার ঘটনা নয়। বরং লাইভ সার্ভারে কাজ করার সময় নির্ধারিত নিরাপত্তা প্রক্রিয়া অনুসরণ না করায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ফল প্রকাশের আগে তথ্যের গোপনীয়তা নিশ্চিত করতে তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের পরিচালক সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের একাধিকবার কঠোরভাবে নির্দেশনা দিয়েছিলেন। বিশেষ করে মন্ত্রীর আনুষ্ঠানিক প্রেস ব্রিফিংয়ের আগে কোনো অবস্থাতেই ফলাফলের ফাইল ওয়েব পোর্টালে আপলোড করা যাবে না—এ বিষয়টি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি।
তদন্তে আরও বলা হয়েছে, লাইভ প্রোডাকশন সার্ভারে কাজ করার সময় যে ধরনের নিরাপত্তা প্রটোকল অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক, তা মানা হয়নি। পরীক্ষামূলক কাজ বা প্রি-লিংক তৈরির মতো কার্যক্রম সাধারণত আলাদা টেস্টিং পরিবেশে সম্পন্ন করার কথা থাকলেও এ ক্ষেত্রে সরাসরি লাইভ সার্ভারেই কাজ করা হয়েছে। এর ফলেই ভুলবশত কয়েকটি জেলার ফলাফল সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য উন্মুক্ত হয়ে যায়। অভ্যন্তরীণ তদন্তে আরও বলা হয়েছে, বিষয়টি আইএমডি টিমের নজরে আসার সঙ্গেই সঙ্গে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এটুআইয়ের কারিগরি সহায়তায় ওয়েব পোর্টালে দৃশ্যমান লিংকগুলো তাৎক্ষণিকভাবে সরিয়ে ফেলা হয়। তবে এর আগেই কয়েকজন ব্যবহারকারী ফলাফল ডাউনলোড করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ায় পরিস্থিতি আর নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়নি।
বিভাগীয় ব্যবস্থা ও তদন্ত কমিটি
ঘটনার পরপরই প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ শুরু করে। মহাপরিচালক শাহীনা ফেরদৌসীর সই করা এক চিঠিতে সহকারী মেইনটেন্যান্স ইঞ্জিনিয়ার মো. মেহতাব কায়েসের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে অনুরোধ জানানো হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়, ফলাফল প্রস্তুতের পর ওয়েব পোর্টালে আপলোডের জন্য প্রয়োজনীয় লিংক তৈরির দায়িত্ব মো. মেহতাব কায়েসকে দেওয়া হয়েছিল। একই সঙ্গে ফল যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ও আনুষ্ঠানিক ঘোষণার আগে কোনোভাবেই ওয়েবসাইটে আপলোড না করার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই নির্দেশনা অমান্য করে ৯ জুলাই সকাল ১০টার দিকে ঢাকা বিভাগের নয়টি জেলার ফলাফল আপলোড করা হয়। পরে সাধারণ ব্যবহারকারীরা ওই লিংকের মাধ্যমে ফল ডাউনলোড করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেন।
একই দিনে পরিচালক (প্রশাসন) মাহবুবা আইরিনের সই করা অফিস আদেশে ঘটনাটি তদন্তে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) মো. মিরাজুল ইসলাম উকিলকে। সদস্য হিসেবে রয়েছেন উপবৃত্তি বিভাগের শিক্ষা কর্মকর্তা মো. জিয়াউল কবির সুমন। সদস্যসচিবের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সহকারী পরিচালক (প্রশাসন-২) রোকসানা হায়দারকে। কমিটিকে তিন কার্যদিবসের মধ্যে ঘটনাটি তদন্ত করে বিস্তারিত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। তদন্তে ফল আগাম প্রকাশের কারণ, দায়িত্বে অবহেলা, নিরাপত্তা প্রটোকল অনুসরণ না করার কারণ এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা প্রতিরোধে করণীয় তুলে ধরতে বলা হয়েছে।
শুরু থেকেই বিতর্কে ছিল বৃত্তি পরীক্ষা
এবারের বৃত্তি পরীক্ষা শুরু থেকেই ছিল বিতর্কে। গত বছরের জুলাইয়ে শুধু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর। পরে সেই সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করা হলে আদালত সরকারি ও বেসরকারি—উভয় ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে নির্দেশ দেন। এর বিরুদ্ধে আপিল করায় পরীক্ষা আয়োজনের পুরো প্রক্রিয়া কয়েক মাস পিছিয়ে যায়। পরে আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী গত এপ্রিলে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। প্রায় ১৬ বছর পর আগের ধাঁচে আলাদা বৃত্তি পরীক্ষা হওয়ায় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়। অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এবার মোট ৬ লাখ ৪০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়।
ফল কবে?
ফল প্রকাশ স্থগিত হওয়ায় নতুন করে অপেক্ষায় পড়েছেন লাখো শিক্ষার্থী ও অভিভাবক। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, তদন্ত ও কারিগরি যাচাইয়ের কাজ শেষ হলে আগামী রোববার (১২ জুলাই) ফল প্রকাশ করা হতে পারে। এবার মোট ৮২ হাজার ৫০০ জন শিক্ষার্থী বৃত্তি পাবে। এর মধ্যে ৩৩ হাজার ট্যালেন্টপুল এবং ৪৯ হাজার ৫০০ জন সাধারণ গ্রেডে বৃত্তি লাভ করবে। বর্তমান নীতিমালা অনুযায়ী, ট্যালেন্টপুলের শিক্ষার্থীরা মাসে ৩০০ টাকা এবং সাধারণ গ্রেডের শিক্ষার্থীরা ২২৫ টাকা করে বৃত্তি পাবে। এছাড়া বছরে এককালীন ২২৫ টাকা অতিরিক্ত সহায়তাও দেওয়া হবে। ফল প্রকাশের পর আইপিইএমআইএস পোর্টাল এবং এসএমএসের মাধ্যমে ফল জানা যাবে বলে জানিয়েছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর।



