রাজশাহীর বাঘা উপজেলার আড়পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আইরিন পারভিন সোমবার দুপুরে ৩৬ বছরের চাকরিজীবন শেষে বিদায় নিয়েছেন। বিদায়বেলায় শিক্ষার্থীরা তাঁর গলা জড়িয়ে ধরে আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি করে।
শিক্ষকতা জীবনের শুরু থেকে শেষ
আইরিন পারভিন একসময় এই বিদ্যালয় থেকেই পঞ্চম শ্রেণিতে বৃত্তি পেয়েছিলেন। পড়াশোনা শেষ করে তিনি একই বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। চারবার জেলার সেরা শিক্ষক নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। সোমবার প্রধান শিক্ষক হিসেবে একই বিদ্যালয় থেকে অবসরে যান।
বিদায় অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষার সব কর্মকর্তা, সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা। একজন সহকর্মী শিক্ষক আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, ‘শুধু বলতে পারছি না যে আপনাকে যেতে দেব না, কারণ এটাই বিধান।’
অনুষ্ঠানের আয়োজন ও বক্তব্য
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বাঘা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মীর মামুনুর রহমান। সভাপতিত্ব করেন সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা মামুনুর রশীদ। বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন উপজেলা প্রাইমারি টিচার্স ট্রেনিং সেন্টারের ইনস্ট্রাক্টর ইকবাল হোসেন ও উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির আহ্বায়ক আবদুল হামিদ।
অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন চারঘাটের ডাকরা ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ আবদুর রউফ, বাঘা উপজেলার হরিনা উচ্চবিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক আবদুল জলিলসহ এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।
প্রধান শিক্ষকের অবদান ও প্রশংসা
প্রধান অতিথি মীর মামুনুর রহমান ঘোষণা দেন, আইরিন পারভিনের অবসরসংক্রান্ত কাগজপত্র তিনি এক ঘণ্টার মধ্যে প্রস্তুত করে দেবেন। দিনের পর দিন তাঁর কার্যালয়ে এ কাজের জন্য এই শিক্ষককে যেতে হবে না।
বক্তারা উল্লেখ করেন, বাঘা উপজেলার মধ্যে শুধু আড়পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েই মিলনায়তন রয়েছে। একজন প্রধান শিক্ষক চাইলে বিদ্যালয়কে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারেন, তার প্রমাণ এই মিলনায়তন। তাঁরা বলেন, বাইরে থেকে কোনো পরিদর্শক দল এলে অন্য বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকরা সাধারণত সাহস করেন না, কিন্তু আইরিন পারভিনের কারণে নির্বিঘ্নে এই বিদ্যালয়ে আসা যায়।
মাসিক সভায় আইরিন পারভিন অন্য শিক্ষকদের জন্য বিভিন্ন উপহার নিয়ে যেতেন, খাবার রান্না করে নিয়ে যেতেন, কবিতা আবৃত্তি করে শোনাতেন। তাঁর এই ভূমিকার কথা তাঁরা কোনো দিন ভুলবেন না বলে বক্তারা জানান।
আইরিন পারভিনের নিজের বক্তব্য
কথা বলতে গিয়ে আইরিন পারভিন তাঁর বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের প্রশংসা করে বলেন, ‘ভালো সহকারী শিক্ষক না থাকলে ভালো প্রধান শিক্ষক হওয়া যায় না। তিনি হাঁ করলেই সহকারী শিক্ষকেরা বুঝে নেন, তিনি কী বলতে চান।’
তিনি জানান, তিন দিনের একটি বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া তিনি বিদ্যালয়ে কখনো নৈমিত্তিক ছুটি নেননি। নিজের সংসারের মতো করেই বিদ্যালয়কে সাজিয়ে রেখেছেন। এলাকায় শিক্ষা বিস্তারে যাঁরা অবদান রেখেছেন, তাঁদের স্মরণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, তাঁর মা রোকেয়া বেগম এই গ্রামের প্রথম এসএসসি পাস নারী। এলাকার শিক্ষা বিস্তারে তিনি অনেক অবদান রেখেছেন।



