টিনের ছাউনি দেওয়া ছোট কক্ষে পাঠদান চলছে। সম্প্রতি সন্দ্বীপের সন্তোষপুর ইউনিয়নের দ্বীপবন্ধু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এই চিত্র দেখা গেছে। চট্টগ্রামের সন্দ্বীপে একটি প্রকল্পের অধীনে সাতটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নতুন ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হয় ২০২০ সালে। এই প্রকল্পের মেয়াদ তিন বছর আগে শেষ হলেও এখন পর্যন্ত ভবনগুলো নির্মাণ করা যায়নি। নির্মাণকাজ বন্ধ রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে।
ভবন নির্মাণ না হওয়ায় এসব বিদ্যালয়ে শ্রেণিকক্ষের সংকট দেখা দিয়েছে। এতে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। শিক্ষার্থীদেরও পড়তে হচ্ছে ভোগান্তিতে। বিশেষ করে সাতটি বিদ্যালয়ের মধ্যে চারটিতে নতুন ভবন নির্মাণের জন্য পুরোনো ভবন ভেঙে ফেলায় শ্রেণিকক্ষের সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে।
প্রকল্পের বিবরণ
বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের মাল্টিপারপাস ডিজাস্টার শেল্টার প্রজেক্টের (এমডিএসপি) অধীনে এই ভবনগুলোর নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল। বর্তমানে এ দায়িত্ব হস্তান্তর করা হয়েছে দুর্যোগ প্রশমন ও টেকসই পুনরুদ্ধার (বি-স্ট্রং) প্রকল্পে। ভবন নির্মাণে ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ৩১ কোটি ৫৭ লাখ টাকা।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের ৯ মার্চ ভবন নির্মাণের কার্যাদেশ পায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ওয়াহিদ কনস্ট্রাকশন লিমিটেড। কার্যাদেশ অনুযায়ী ২০২৩ সালের ৩০ জুনের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ করার কথা ছিল। তবে একটি ভবনের কাজও শেষ করতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল কার্যালয়ের তথ্যমতে, ২টি ভবনের ৮ শতাংশ, ২টির ১০ শতাংশ এবং বাকি ৩টির যথাক্রমে ১৫, ২৫ ও ৩০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। এর পর থেকে উধাও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি।
সরেজমিনে যা দেখা গেল
যেসব বিদ্যালয়ে নতুন ভবন নির্মাণ করার কথা, তার একটি উপজেলার সন্তোষপুর ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডে অবস্থিত দ্বীপবন্ধু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। নির্মাণকাজের জন্য এখানে মাঠের প্রায় অর্ধেক জায়গা খনন করায় গভীর জলাভূমিতে পরিণত হয়েছে। সেখানে মাটির গভীর থেকে তুলে আনা কিছু রড-কংক্রিটের (আরসিসি) খুঁটি পানির নিচে পড়ে রয়েছে। পাশে মাটি স্তূপ করে রাখা হয়েছে। বিদ্যালয় প্রাঙ্গণের উত্তর-পশ্চিম কোনায় চলাচলের রাস্তা ঘেঁষে চোখে পড়ে একচালা টিনের ছাউনি দেওয়া ছোট স্থাপনা। এর ভেতরে ছোট ছোট ৩টি কক্ষে চলছে ১১০ শিক্ষার্থীর পাঠদান।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোমেনা বেগমের সঙ্গে কথা হয়। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘স্বল্প সময়ের জন্য ছোট এই ছাউনি গড়ে তোলা হয়েছিল। কিন্তু ছয় বছর ধরে এই ছাউনিতেই বিদ্যালয়ের কাজ চলছে। মে মাসে প্রচণ্ড গরমে শ্রেণিকক্ষেই অচেতন হয়ে পড়ে অনেক শিক্ষার্থী।’ এলাকার বাসিন্দা জহির উদ্দিন (৪০) প্রথম আলোকে বলেন, ‘এখানে নতুন ভবন ওঠার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। শিশুদের ক্লাসের ব্যবস্থা নেই, উল্টো গরমে নাজেহাল অবস্থা।’
ভবন নির্মাণের কাজ বন্ধ। খনন করা গর্তে জমে আছে পানি। এতে ভোগান্তিতে পড়তে হয় মুছাপুর আব্দুল্লাহ খুরশিদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের।
কালাপানীয়া জগৎ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, টিনের ছাউনির নিচে কয়েকটি কক্ষে পাঠদান চলছে। মুছাপুর আবদুল্লাহ খুরশিদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও পুরোনো ভবনেই ঝুঁকি নিয়ে শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালনা করতে দেখা যায়। ভবনটিতে দেখা দিয়েছে ফাটল, খসে পড়ছে পলেস্তারা।
মুছাপুর তালুকদারপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও নতুন ভবনের নির্মাণকাজ শেষ হয়নি। একচালা টিনের ঘরে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করা হচ্ছে। প্রধান শিক্ষক যতন চন্দ্র গুহ বলেন, প্রচণ্ড গরমের ভোগান্তি আর ঝড়-বাদলের শঙ্কার মধ্যেই চলছে পাঠদান।
মগধরা দারুস সালাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, সারিকাইতের দক্ষিণ-পশ্চিম চৌকাতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মুছাপুর আজিজের রহমান প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিকল্প ভবন থাকলেও নির্মাণকাজের কারণে এসব বিদ্যালয়ের মাঠ ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
প্রভাব পড়ছে ভর্তিতে
‘স্কুলের দুরবস্থা দেখে নিজেদের সন্তানকে ভর্তি করাতে চাচ্ছেন না অভিভাবকেরা। দিন দিন তাই আমাদের ছাত্রসংখ্যা কমছে’,—বলছিলেন মুছাপুর তালুকদারপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক যতন চন্দ্র গুহ। তিনি জানান, গত কয়েক বছরে তাঁদের শিক্ষার্থী কমেছে প্রায় ১০০ জন।
কালাপানীয়া জগৎ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আলমগীর জানান, ভবনসংকটের কারণে তাঁদের বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীসংখ্যা অর্ধেকে নেমে এসেছে। পাঁচ বছর আগে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ছিল ৩৫০ জন, এখন তা ১১৫ জনে নেমে এসেছে। মো. আলমগীর বলেন, ‘আমাদের ক্লাসগুলো কবুতরের খুপরির মতো, ছাত্র-ছাত্রীদের বসার জায়গা হয় না।’
সন্তোষপুরের দ্বীপবন্ধু প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীসংখ্যা ২৫০ থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ১১০ জনে। একই অবস্থার কথা জানিয়েছেন, মুছাপুরের আবদুল্লাহ খুরশিদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরাও।
কী বলছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা
সন্দ্বীপ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাহমুদুল হক জানান, করোনা ভাইরাস মহামারির প্রকোপের সময় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ গুটিয়ে নেয়। এরপর আর ফেরেনি। সেই কার্যাদেশ বাতিল করা হয়েছে বলে শুনেছেন তিনি। এর বেশি কিছু তাঁর জানা নেই।
উপজেলা স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রকৌশলী সাইফুল ইসলাম জানান, ভবনহীন বিদ্যালয়গুলোর শ্রেণিকক্ষসংকটের অস্থায়ী সমাধানের জন্য প্রতিটি বিদ্যালয়ের জন্য পাঁচ লাখ টাকা করে বরাদ্দের সুপারিশ করা হয়েছিল। তবে এ বিষয়ে চিঠি পাঠানো হলেও মন্ত্রণালয় থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
ভবনের কাজ পুনরায় কবে শুরু হবে, তা জানাতে পারেননি সাইফুল ইসলাম। তিনি বলেন, ভবন নির্মাণের আগের কার্যাদেশ বাতিল করা হয়েছে। বি-স্ট্রং প্রকল্পের মাধ্যমে সরেজমিনে নির্মাণকাজের অবস্থার মূল্যায়ন হবে। তবে কবে নাগাদ এই মূল্যায়ন হবে, তা সুনির্দিষ্ট করে বলতে পারেননি তিনি।
প্রকল্পের বিষয়ে জানতে বি-স্ট্রং প্রকল্পের পরিচালক হাসান আলীর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তাঁর ফোন বন্ধ পাওয়া গেছে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুল মতিনকে কয়েক দিন ফোনে না পেয়ে সরাসরি তাঁর কার্যালয়ে যাওয়া হয়। সেখানেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো হলে সেটিরও উত্তর দেননি তিনি।
কাজ বন্ধ করার বিষয়ে জানতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ওয়াহিদ কনস্ট্রাকশনের কর্মকর্তা আল আমীনের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হয়। তবে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য না করেই তিনি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।



