ঢাকা ট্রিবিউনের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বান্দরবান, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলার ৬৮৪টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিদ্যুৎ ও নিরাপদ পানি নেই। ফলে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা কার্যক্রম সেখানকার শিক্ষার্থীদের কাছে অধরা রয়ে গেছে।
বিদ্যুৎহীন বিদ্যালয়ের সংখ্যা ও অবস্থা
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, পার্বত্য তিন জেলায় মোট ১ হাজার ৭৩৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৬৮৪টিতে বিদ্যুৎ ও নিরাপদ পানি নেই। বান্দরবানের লামা, আলীকদম, নাইক্ষ্যংছড়ি, রোয়াংছড়ি, রুমা ও থানচি উপজেলার অনেক বিদ্যালয় বিদ্যুৎবিহীন। রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়িতেও একই অবস্থা।
ম্রো সম্প্রদায়ের দুর্দশা
বান্দরবান সদর উপজেলা থেকে ২৬ কিলোমিটার দূরে টংকাবতী ইউনিয়নে ম্রো আদিবাসী সম্প্রদায়ের বসবাস। সেখানকার সাতটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়—আলীনগর, টংকাবতী, ব্রিক ফিল্ড বাজার পাড়া, ভাইট্টা পাড়া, রমজু পাড়া, হাতির ডেরা ও রামরি পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়—কোনোটিতেই বিদ্যুৎ নেই। ২০২১ সালের জনশুমারি অনুসারে, এই ইউনিয়নের সাক্ষরতার হার ৫৫ দশমিক ১ শতাংশ।
শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের বক্তব্য
ভাইট্টা পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রুয়াই ম্রো বলেন, “প্রযুক্তির যুগে শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে পড়ছে বিদ্যুৎ না থাকায়। ডিজিটাল ক্লাসরুম এখনো স্বপ্নই রয়ে গেছে।” চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী সুনাই ম্রো জানায়, “প্রচণ্ড গরমে বিদ্যুৎ না থাকায় অনেক শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়। ঝড়-বৃষ্টিতেও পড়ালেখা ব্যহত হয়।”
স্থানীয়দের দাবি
টংকাবতীর চিম্বুকের মৌজা নং ৩০৯ দক্ষিণ হাঙ্গরের হেডম্যান প্যারিং ম্রো বলেন, “বিদ্যুৎ না থাকায় আমাদের শিশুরা দেশ ও বিশ্বের তথ্য থেকে বিচ্ছিন্ন। সরকারের উচিত দূরবর্তী পাহাড়ি এলাকায় বিদ্যুৎ ও নিরাপদ পানি নিশ্চিত করা।”
সরকারি কর্মকর্তাদের বক্তব্য
আলীকদম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মঞ্জুর আলম বলেন, “পাহাড়ি এলাকায় জাতীয় গ্রিড সম্প্রসারণ কঠিন। অনেক গ্রামে মাত্র ১০টি পরিবার বসবাস করে। শিশুরা দিনের আলোয় পড়ে, রাতে কেরোসিন বাতি ব্যবহার করে।” বান্দরবানের জেলা প্রশাসক মো. সানিউল ফেরদৌস জানান, “রুমা, থানচি, রোয়াংছড়ি, চিম্বুক ও আলীকদমের অনেক এলাকা বিদ্যুৎ সুবিধার বাইরে। নৌকায় নদী পাড়ি দিয়ে যেতে হয় কিছু গ্রামে।” বান্দরবান জেলা শিক্ষা অফিসার মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন বলেন, “বিদ্যুৎ না থাকায় শিক্ষকেরা অনলাইন প্রশিক্ষণে অংশ নিতে পারেন না। স্কুলে নিরাপদ পানির তীব্র সংকট থাকায় শিক্ষার্থীরা পানি বাহিত রোগে আক্রান্ত হয়।”
সমাধানের পথ
সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, পাহাড়ি এলাকার বিদ্যালয়গুলোতে বিদ্যুৎ ও নিরাপদ পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য, মনোযোগ ও উপস্থিতি বাড়বে এবং সমতলের শিশুদের সঙ্গে শিক্ষাগত ব্যবধান কমবে। কিছু এলাকায় বেসরকারি উদ্যোগে সোলার প্যানেল বসানো হয়েছে। সরকারও বেশ কয়েকটি উপজেলায় বিদ্যুৎ সম্প্রসারণের কাজ শুরু করেছে।



