কুমিল্লার মাদ্রাসায় শিক্ষকের ওপর হামলা: প্রতিষ্ঠাতা দাবিদার শিক্ষকের মারধরের অভিযোগ
কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার একটি মাদ্রাসায় তরুণ শিক্ষক খাইরুল ইসলামের ওপর মারধর ও শার্টের কলার ধরে টানাহেঁচড়ার ঘটনায় ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, অপর শিক্ষক জাহাঙ্গীর হোসেন নিজেকে মাদ্রাসাটির প্রতিষ্ঠাতা দাবি করে এই হামলা চালিয়েছেন। ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় স্থানীয় প্রশাসন সতর্ক হয়েছে, তবে এখনও কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
ঘটনার বিবরণ
গত বুধবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে চৌদ্দগ্রাম উপজেলার শ্রীপুর ইউনিয়নের গোপালনগর মহিলা আলিম মাদ্রাসায় এই ঘটনা ঘটে। অভিযোগ অনুযায়ী, শিক্ষক জাহাঙ্গীর হোসেন তরুণ শিক্ষক খাইরুল ইসলামকে উপবৃত্তির কাজ নিয়ে কথা বলতে ডেকে পাঠান। কথা-কাটাকাটিতে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে জাহাঙ্গীর প্রথমে খাইরুলকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেন এবং পরে শিক্ষকদের কক্ষে নিয়ে দরজা-জানালা বন্ধ করে মারধর করেন।
ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ৫৫ সেকেন্ডের ভিডিওতে দেখা যায়, হামলার শিকার খাইরুল ইসলাম কান্না করছেন। ভিডিও ধারণকারী অপর এক শিক্ষককে বলতে শোনা যায়, 'আপনি দরজা বন্ধ করে একজন শিক্ষককে পেটাবেন, এটা তো হয় না।' অন্য শিক্ষকেরা খাইরুল ইসলামকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় জাহাঙ্গীর হোসেন তেড়ে এসে ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে খাইরুল ইসলামের শার্টের কলার ধরে টানা-হেঁচড়া শুরু করেন। পুরো ঘটনাটি শিক্ষার্থীদের সামনে ঘটে, যেখানে মহিলা মাদ্রাসার ছাত্রীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন এবং চিৎকার করতে শোনা যায়।
অভিযুক্ত ও ভুক্তভোগীর অবস্থান
অভিযুক্ত শিক্ষক জাহাঙ্গীর হোসেন নিজেকে মাদ্রাসাটির প্রতিষ্ঠাতা বলে দাবি করেন এবং তিনি মাদ্রাসাটির এবতেদায়ির সহকারী বাংলা শিক্ষক হিসেবে কর্মরত। অন্যদিকে, ভুক্তভোগী শিক্ষক খাইরুল ইসলাম বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যায়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) অধীনে নিয়োপ্রাপ্ত হয়ে ওই মাদ্রাসায় বাংলা বিভাগের শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
ভুক্তভোগী শিক্ষক খাইরুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, 'আমার ওপর যেভাবে হামলা চালানো হয়েছে, একজন শিক্ষক হিসেবে আমি লজ্জিত। আমি শিক্ষার্থীদের সামনে কীভাবে যাব? ঘটনার পর থেকে আমি শিক্ষার্থীদের সামনে গিয়ে কথা বলতে লজ্জা পাচ্ছি। আমার ঘুম হচ্ছে না। অহেতুক আমার ওপর হামলা করা হয়েছে। আমি চাই, পৃথিবীর কোনো শিক্ষক যেন এভাবে লাঞ্ছিত না হয়। কোনো শিক্ষককে যেন এভাবে আঘাত করা না হয়। সব শিক্ষকের নিরাপত্তা চাই। আমি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে বিষয়টি অবহিত করেছি। এ ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।'
স্থানীয় প্রতিক্রিয়া ও প্রশাসনের পদক্ষেপ
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, জাহাঙ্গীর হোসেন নিজেকে মাদ্রাসাটির প্রতিষ্ঠাতা দাবি করে এর আগেও একাধিক শিক্ষককে মারধর করেছেন। তিনি স্থানীয় বাসিন্দা হওয়ায় কাউকে 'পাত্তা' দিতে চান না বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে স্থানীয় তিনজন বাসিন্দা উল্লেখ করেন, মাদ্রাসাটি বর্তমানে এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং এটি জাহাঙ্গীরের ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠান নয়।
ঘটনার দিন সন্ধ্যায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে অভিযুক্ত শিক্ষক জাহাঙ্গীর হোসেনকে মৌখিকভাবে তিরষ্কার করা হয়েছে। মাদ্রাসাটির ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মাওলানা শাহ আলম বলেন, 'মাদ্রাসার দুজন শিক্ষকের মধ্যে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটেছে। এ বিষয়ে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে জানানো হলে তিনি উভয় পক্ষকে শান্ত থেকে শ্রেণি কার্যক্রম অব্যাহত রাখার এবং শ্রেণি কার্যক্রম শেষে সব শিক্ষক-কর্মচারীকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে আসার নির্দেশ দেন। পরে সন্ধ্যায় তাঁরা সেখানে যান। এ সময় সংশ্লিষ্ট শিক্ষক আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করেন এবং ক্ষমা প্রার্থনা করেন। পরবর্তীতে সভায় সংশ্লিষ্ট শিক্ষককে তিরষ্কার করা হয় এবং সবাইকে কঠোরভাবে সতর্ক করা হয়।'
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. নুরুল আমিন বলেন, 'শিক্ষক জাহাঙ্গীর হোসেনকে মৌখিকভাবে তিরষ্কার করে বৃহস্পতিবার থেকে পাঠদান স্বাভাবিক রাখতে বলা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে ঘটনাটি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক বিষয় দেখভাল করবেন অধ্যক্ষ। ওই ব্যক্তি নিজেকে প্রতিষ্ঠাতা দাবি করে এভাবে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ নেই। এ ছাড়া পূর্বে কোনো শিক্ষক তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেননি। পুরো ঘটনাটি তদন্ত করে দেখা হবে।'
ভবিষ্যতের আশঙ্কা
স্থানীয়রা সতর্ক করে দিয়েছেন, শিক্ষককে মারধরের মতো গুরুতর ঘটনা ঘটার পরও যদি কোনো বিভাগীয় তদন্ত, শাস্তিমূলক ব্যবস্থা বা আইনি পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা আছে। এতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের জন্য পরিবেশ অনিরাপদ হয়ে উঠতে পারে। একজন শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, 'জাহাঙ্গীর নিজেকে শিক্ষকের চেয়ে মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে বেশি পরিচয় দিয়ে থাকেন। তিনি এর আগেও ক্ষমতা দেখিয়ে একাধিক শিক্ষককে লাঞ্ছিত করেছেন।'
অভিযুক্ত শিক্ষক জাহাঙ্গীর হোসেনের মুঠোফোন নম্বর বন্ধ পাওয়া গেছে, তবে ঘটনার পর তিনি স্থানীয় সাংবাদিকদের বলেছেন, ঘটনাটি অনাকাঙ্ক্ষিত এবং তিনি ভুক্তভোগী শিক্ষকের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন। এখন প্রশাসনের তদন্ত ও পদক্ষেপের দিকে নজর রাখছে স্থানীয় সম্প্রদায়।



