আপনার আশপাশেই হয়তো এমন কোনো পরিবার আছে, যেখানে পরপর তিন বা চারটি কন্যাসন্তান। তখন আত্মীয়স্বজন বা প্রতিবেশীদের মধ্যে নানা ধরনের মন্তব্য শুরু হয়ে যায়। অনেকেই আবার এর জন্য মাকেই দায়ী করেন। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান বলছে, এই ধারণার কোনো ভিত্তি নেই। বরং কোনো পরিবারে পরপর কয়েকটি কন্যাসন্তান জন্ম নেওয়ার পেছনে কাজ করে সম্ভাব্যতার হিসাব, বাবার জিনগত বৈশিষ্ট্য এবং কিছু ক্ষেত্রে গর্ভাবস্থার জৈবিক পরিবেশ।
সম্ভাব্যতার স্বাভাবিক ফল
প্রতিটি গর্ভধারণ একটি স্বতন্ত্র ঘটনা। অর্থাৎ আগের সন্তান মেয়ে হয়েছে বলে পরের সন্তান ছেলে হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায় না। এই ভুল ধারণাকে পরিসংখ্যানের ভাষায় বলা হয় গ্যাম্বলারস ফ্যালাসি বা জুয়াড়ির ভুল ধারণা। আপনি যদি একটি কয়েন চারবার ছোড়েন, তাহলে পরপর চারবার একই পাশ ওঠার সম্ভাবনা থাকে ৬.২৫ শতাংশ। ঠিক তেমনি, কোনো কোনো পরিবারে কাকতালীয়ভাবেই পরপর চারটি কন্যাসন্তান জন্ম নিতে পারে। এর পেছনে বিশেষ কোনো রহস্য নাও থাকতে পারে; এটি সম্ভাব্যতারই স্বাভাবিক ফল।
বাবার জিনগত ভূমিকা
মানুষের লিঙ্গ নির্ধারণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে বাবার শুক্রাণু। মায়ের ডিম্বাণুতে সব সময় থাকে একটি এক্স (X) ক্রোমোজোম। অন্যদিকে, বাবার শুক্রাণুতে থাকতে পারে এক্স (X) অথবা ওয়াই (Y) ক্রোমোজোম। এক্স-বাহী শুক্রাণু ডিম্বাণুকে নিষিক্ত করলে কন্যাসন্তান (XX) এবং ওয়াই-বাহী শুক্রাণু নিষিক্ত করলে পুত্রসন্তান (XY) জন্মায়। তাই সন্তানের লিঙ্গ নির্ধারণের জন্য মাকে দায়ী করার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
যুক্তরাজ্যের নিউক্যাসল ইউনিভার্সিটির গবেষকেরা কয়েক শ বছরের পারিবারিক তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, কিছু পরিবারে ছেলে বা মেয়ে সন্তান বেশি হওয়ার একটি বংশগত প্রবণতা থাকতে পারে। তাঁদের ধারণা, পুরুষের জিনগত বৈশিষ্ট্য কোনো কোনো ক্ষেত্রে এক্স ও ওয়াই ক্রোমোজোমবাহী শুক্রাণুর অনুপাতকে সামান্য প্রভাবিত করতে পারে। ২০২৪ সালের শেষের দিকে এবং ২০২৫ সালের সাম্প্রতিক কিছু বড় গবেষণায় (যেমন, ইউকে বায়োব্যাংক-এর ডেটা অ্যানালিসিস) বিজ্ঞানীরা মানুষের জিনোমে এমন কিছু নির্দিষ্ট ভ্যারিয়েন্ট বা জিনের সন্ধান পেয়েছেন যা শুক্রাণুর X এবং Y-এর অনুপাতকে সরাসরি প্রভাবিত করতে পারে।
জৈবিক পরিবেশ ও অন্যান্য কারণ
X এবং Y শুক্রাণুর আয়ু ও গতিবেগের পার্থক্য, বাবার বয়স এবং জীবনযাত্রা এবং ভ্রূণের টিকে থাকার উপরও কন্যা সন্তান হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। X ক্রোমোজোমবাহী (মেয়ে) শুক্রাণু আকারে কিছুটা বড়, ভারী এবং ধীরগতির হয়। এরা জরায়ুর অম্লীয় পরিবেশে বেশি দিন বেঁচে থাকতে পারে। অন্যদিকে Y (ছেলে) শুক্রাণু হালকা ও দ্রুতগতির হলেও দ্রুত মারা যায়। তাই মিলনের টাইমিং বা জরায়ুর ভেতরের পরিবেশের কারণেও কন্যাসন্তান হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।
আরেক গবেষণায় দেখা গেছে, বাবার বয়স যত বাড়ে (বিশেষ করে ৪০ বা ৫০ পার হলে), তাদের শরীরে Y ক্রোমোজোমবাহী শুক্রাণুর সংখ্যা বা গুণগত মান কমতে থাকে। ফলে বয়স্ক বাবাদের ক্ষেত্রে কন্যাসন্তান হওয়ার সম্ভাবনা কিছুটা বেড়ে যায়। এছাড়া অতিরিক্ত ধূমপান, স্ট্রেস বা কেমিক্যালের সংস্পর্শ Y শুক্রাণুকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করে।
ভ্রূণের সহনশীলতা ও ট্রাইভার্স-উইলার্ড হাইপোথিসিস
গর্ভাবস্থার প্রাথমিক দিনগুলোতে মেয়ে ভ্রূণ (XX) ছেলে ভ্রূণের (XY) তুলনায় অনেক বেশি শক্তপোক্ত বা সহনশীল হয়। মায়ের শরীরে কোনো ইনফেকশন, পুষ্টিহীনতা বা তীব্র মানসিক চাপ থাকলে ছেলে ভ্রূণ অনেক সময় নষ্ট হয়ে যায়, কিন্তু মেয়ে ভ্রূণ প্রতিকূল পরিবেশেও টিকে থাকে। এই কারণেই দুর্যোগ বা দুর্ভিক্ষের পর কন্যাসন্তানের জন্মহার বেড়ে যায়।
এরকমই আলোচিত ধারণা হলো ট্রাইভার্স-উইলার্ড হাইপোথিসিস। ১৯৭৩ সালে জীববিজ্ঞানী রবার্ট ট্রাইভার্স এবং ড্যান উইলার্ড এই তত্ত্ব প্রস্তাব করেন। এতে বলা হয়, মায়ের শারীরিক অবস্থা ও পরিবেশগত চাপ কোনো কোনো প্রাণীর ক্ষেত্রে ছেলে-মেয়ের অনুপাতকে প্রভাবিত করতে পারে। মানুষের ক্ষেত্রেও এ বিষয়ে বহু গবেষণা হয়েছে। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, চরম মানসিক চাপ, দুর্ভিক্ষ বা বড় ধরনের দুর্যোগের পর ছেলে শিশুর জন্মহার সামান্য কমে যেতে পারে। তবে সব গবেষণায় একই ফল পাওয়া যায়নি। তাই মানুষের ক্ষেত্রে এই তত্ত্ব এখনো নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
উপসংহার: প্রকৃতির স্বাভাবিক প্রক্রিয়া
সব মিলিয়ে বিজ্ঞানীদের মতে, কোনো পরিবারে শুধু কন্যাসন্তান জন্মানোর পেছনে একক কোনো কারণ নেই। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এটি সম্ভাব্যতার স্বাভাবিক ফল। কিছু ক্ষেত্রে বংশগত বৈশিষ্ট্য বা গর্ভাবস্থার জৈবিক পরিবেশও সামান্য ভূমিকা রাখতে পারে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ছেলে হোক বা মেয়ে, সন্তানের লিঙ্গের জন্য কোনোভাবেই মাকে দায়ী করা যায় না। আধুনিক জীববিজ্ঞান স্পষ্টভাবে দেখিয়েছে, এটি প্রকৃতির স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। এখানে কুসংস্কার বা দোষারোপের কোনো স্থান নেই।
তাই কোনো পরিবারে শুধু মেয়ে বা শুধু ছেলে হওয়াটা কোনো একক বিষয়ের ওপর নির্ভর করে না। এটি অনেকটা লটারির মতো। প্রকৃতি তার নিজের নিয়মেই এই ভারসাম্য ধরে রাখে।
সূত্র: লাইভ সায়েন্স ও নেচার ডটকম



