বোরিয়াম আবিষ্কারের বৈজ্ঞানিক দ্বন্দ্ব: সোভিয়েত বনাম জার্মান বিজ্ঞানীদের লড়াই
বোরিয়াম আবিষ্কারে সোভিয়েত-জার্মান বিজ্ঞানীদের দ্বন্দ্ব

বোরিয়াম আবিষ্কারের পেছনের বৈজ্ঞানিক দ্বন্দ্বের গল্প

পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাসে নীলস বোর এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হিসেবে পরিচিত। পরমাণুর গঠন নিয়ে তাঁর প্রদত্ত মডেল আজও বিশ্বের শিক্ষার্থীদের জন্য অপরিহার্য একটি পাঠ্য বিষয়। এই মহান বিজ্ঞানীর সম্মানার্থে পর্যায় সারণির ১০৭ নম্বর মৌলটির নামকরণ করা হয়েছে বোরিয়াম। তবে এই নামকরণের আগে মৌলটি আবিষ্কার নিয়ে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন ও জার্মানির বিজ্ঞানীদের মধ্যে এক জটিল বৈজ্ঞানিক তর্কযুদ্ধ ও দরকষাকষি সংঘটিত হয়েছিল।

সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রথম দাবি ও গবেষণা

১৯৭৫ সালে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের ডুবনা শহরে অবস্থিত জয়েন্ট ইনস্টিটিউট ফর নিউক্লিয়ার রিসার্চ বোরিয়াম মৌল নিয়ে গবেষণা কার্যক্রম শুরু করে। বিজ্ঞানী ইউরি ওগানেসিয়ানের নেতৃত্বে একদল গবেষক বিসমাথ পরমাণুকে ক্রোমিয়াম দিয়ে আঘাত করে ১০৭ নম্বর মৌলটির ২৬১ নম্বর আইসোটোপ তৈরি করতে সক্ষম হন। ১৯৭৬ সালে তাঁরা তাঁদের এই সাফল্যের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেন এবং মৌলটির আবিষ্কারের দাবি পেশ করেন।

জার্মান বিজ্ঞানীদের চমকপ্রদ সাফল্য

সোভিয়েত বিজ্ঞানীদের দাবির মাত্র কয়েক বছর পর, ১৯৮১ সালে তৎকালীন পশ্চিম জার্মানির ডারমস্টাড শহরে অবস্থিত ইনস্টিটিউট ফর হেভি আয়ন রিসার্চের বিজ্ঞানীরা একটি বড় চমক দেখান। পিটার আর্মব্রাস্টার ও গটফ্রিড মুনজেনবার্গের নেতৃত্বে বিজ্ঞানীরা একই পদ্ধতিতে বিসমাথের সঙ্গে ক্রোমিয়াম যুক্তের মাধ্যমে আরও নিখুঁতভাবে ১০৭ নম্বর মৌলের ২৬২ নম্বর আইসোটোপের একটি পরমাণু তৈরি করতে সফল হন। জার্মান দলটি তাদের গবেষণায় অনেক বেশি স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য তথ্য ও প্রমাণ উপস্থাপন করে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আবিষ্কার ও নামকরণ নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা

কোন দেশ বা কোন দল প্রথম এই মৌল আবিষ্কার করেছে এবং নামকরণের অধিকার কাদের থাকবে, তা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা ও দর–কষাকষি শুরু হয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন তাদের পুরোনো দাবির পক্ষে অনড় ছিল, অন্যদিকে জার্মানদের দাখিল করা তথ্য ছিল অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য ও স্বচ্ছ। অবশেষে ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অব পিওর অ্যান্ড অ্যাপলাইড কেমিস্ট্রি (ইউপ্যাক) চূড়ান্ত রায় দেয়। ইউপ্যাক জানায়, যদিও সোভিয়েত বিজ্ঞানীরা সম্ভবত সবার আগে এই মৌলটি তৈরি করতে পেরেছিলেন, কিন্তু জার্মানির বিজ্ঞানীদের পেশ করা তথ্য ও প্রমাণ ছিল অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য। শেষ পর্যন্ত ১৯৯৭ সালে নীলস বোরের সম্মানে মৌলটির আনুষ্ঠানিক নাম রাখা হয় বোরিয়াম।

বোরিয়ামের বৈশিষ্ট্য ও ব্যবহার

বোরিয়াম একটি কৃত্রিম বা সংশ্লেষিত মৌল, যা প্রকৃতিতে স্বাভাবিকভাবে পাওয়া যায় না। এটি তৈরির পদ্ধতিটি ছিল অত্যন্ত চমকপ্রদ। কোল্ড ফিউশন এমন একটি পারমাণবিক বিক্রিয়া, যেখানে দুটি হালকা পরমাণুর নিউক্লিয়াসকে একত্র করে একটি ভারী মৌল তৈরি করা হয় এবং এ প্রক্রিয়ায় খুব কম পরিমাণে শক্তি নির্গত হয়। বিসমাথ-২০৯ টার্গেটের ওপর ক্রোমিয়াম-৫৪ আয়নের আঘাতের ফলে এই বিরল মৌল উৎপন্ন হয়। বোরিয়াম অত্যন্ত তেজস্ক্রিয় ধাতু ও ভীষণ ক্ষণস্থায়ী হওয়ায় মৌলটি নিয়ে বিজ্ঞানীদের কৌতূহলের শেষ নেই। তবে বর্তমানে বোরিয়ামের কোনো ব্যবহারিক বা বাণিজ্যিক প্রয়োগ নেই, এটি মূলত বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।