বাংলাদেশি বিজ্ঞানী সেঁজুতি সাহার জন্য গর্বের মুহূর্ত
বিজ্ঞানের জগতে বাংলাদেশের নাম আবারও উজ্জ্বল করে তুলেছেন ড. সেঁজুতি সাহা। তিনি ২০২৬ সালের মর্যাদাপূর্ণ স্যাবিন রাইজিং স্টার অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেছেন। এটি একটি ঐতিহাসিক অর্জন, কারণ পুরো দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি এই সম্মানজনক পুরস্কারটি পেলেন।
পুরস্কারের তাৎপর্য ও নির্বাচনের মানদণ্ড
যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক স্যাবিন ভ্যাকসিন ইনস্টিটিউট প্রতি বছর এই পুরস্কারটি প্রদান করে থাকে। মূলত ৪০ বছরের কম বয়সী তরুণ ও মেধাবী ব্যক্তিদের এই সম্মাননা জানানো হয়, যাঁরা ভ্যাকসিন এবং টিকাদান কর্মসূচিতে অসাধারণ অবদান রেখেছেন। লিঙ্গ, ভৌগোলিক অবস্থান বা কাজের ক্ষেত্রের ঊর্ধ্বে উঠে বিশ্বস্বাস্থ্যে মানুষের নিঃস্বার্থ অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়াই এই পুরস্কারের মূল লক্ষ্য।
সেঁজুতি সাহার বৈজ্ঞানিক অবদান
ড. সেঁজুতি সাহা কেন এই পুরস্কার পেলেন? তিনি তাঁর জীবনের অনেকটা সময় ব্যয় করেছেন শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায়। বিশেষ করে বাংলাদেশে টাইফয়েড কনজুগেট ভ্যাকসিন নিয়ে আসা এবং গবেষণার সক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে তাঁর বৈজ্ঞানিক অবদান সত্যিই অতুলনীয়। তাঁর এই দীর্ঘদিনের নিরলস পরিশ্রম ও শিশুস্বাস্থ্যে বিশ্বমানের গবেষণার স্বীকৃতিস্বরূপই তাঁকে এই রাইজিং স্টার খেতাবে ভূষিত করা হয়েছে।
২০২৫ সালে বাংলাদেশে যে বিশাল টাইফয়েড কনজুগেট ভ্যাকসিন ক্যাম্পেইন হয়েছিল, তার পেছনে জিনোমিক ডেটা বা তথ্য দিয়ে সবচেয়ে বড় বৈজ্ঞানিক প্রমাণটি তৈরি করেছিলেন ড. সেঁজুতি। তাঁর এই কাজের ওপর ভিত্তি করে ইতিমধ্যেই দেশের ৪ কোটিরও বেশি শিশুকে এই টিকা দেওয়া সম্ভব হয়েছে। পাশাপাশি তিনি দেশে একটি বিশ্বমানের জিনোমিক ল্যাব তৈরিতে বড় ভূমিকা রেখেছেন। তাঁর এই ল্যাবে ক্লেবসিয়েলা এবং আরএসভির মতো ভয়ংকর সব প্যাথোজেনের জিনোম সিকোয়েন্স করা হয়েছে, যা ভবিষ্যতে যেকোনো প্রাদুর্ভাব দ্রুত শনাক্ত করতে এবং ভ্যাকসিন তৈরিতে সাহায্য করবে।
সেঁজুতি সাহার প্রতিক্রিয়া ও অন্যান্য পুরস্কারপ্রাপ্তরা
এই অর্জনে উচ্ছ্বসিত ড. সেঁজুতি সাহা বলেন, ‘এই পুরস্কার আমার কাছে ভীষণ অর্থবহ। কারণ এটি বাংলাদেশের একটি অসাধারণ কমিউনিটির বছরের পর বছর ধরে করা পরিশ্রমের ফল। এটি প্রমাণ করে, মানুষ একসঙ্গে সমস্যা সমাধানের জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হলে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তেই বিজ্ঞান চর্চা বেড়ে উঠতে পারে!’
স্যাবিন ভ্যাকসিন ইনস্টিটিউটের সিইও অ্যামি ফিনান ড. সেঁজুতির প্রশংসা করে বলেন, ‘সেঁজুতি সাহা শুধু ল্যাবরেটরির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না, বরং কমিউনিটির সুরক্ষার জন্য তিনি ডেটা ও প্রমাণ ব্যবহার করে শক্তিশালী ভ্যাকসিন নীতির পক্ষেও লড়াই করেছেন।’
সেঁজুতি সাহার পাশাপাশি আরও দুজন পাচ্ছেন এই সম্মাননা। তবে তাঁদের ক্যাটাগরি আলাদা। অ্যালবার্ট বি. স্যাবিন গোল্ড মেডেল ক্যাটাগরিতে চলতি বছর এই পুরস্কার পাচ্ছেন তুর্কি বংশোদ্ভূত জার্মান দম্পতি অধ্যাপক উগুর শাহিন এবং অধ্যাপক ওজলেম তুরেচি। কোভিড-১৯ মহামারির শুরুতে তাঁরা কোভিডের ভ্যাকসিন তৈরি করেছিলেন। বর্তমানে তাঁরা যক্ষ্মা (TB), এইচআইভি (HIV) এবং ম্যালেরিয়ার মতো রোগের ভ্যাকসিন তৈরিতে কাজ করছেন। শুধু তা-ই নয়, আফ্রিকার মানুষের জন্য আফ্রিকাতেই একটি টেকসই ভ্যাকসিন ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার নেতৃত্ব দিচ্ছেন তাঁরা। এক যৌথ বিবৃতিতে তাঁরা বলেছেন, ‘উদ্ভাবনী ওষুধ অবশ্যই তাদের কাছে পৌঁছাতে হবে, যাদের এটি সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।’
পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের বিস্তারিত
চলতি বছর ১২ মে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসির ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সেস ভবনে আয়োজিত এক জমকালো অনুষ্ঠানে এই তিন গুণী বিজ্ঞানীকে সম্মাননা তুলে দেওয়া হবে। পুরো অনুষ্ঠানটি অনলাইনে সরাসরি দেখানো হবে, যা বিশ্বব্যাপী দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। এই ইভেন্টটি বিজ্ঞান চর্চার ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যেখানে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন ড. সেঁজুতি সাহা।



