পারদের রহস্য: কেন এই ধাতু কক্ষতাপমাত্রায় তরল থাকে?
পারদ কেন কক্ষতাপমাত্রায় তরল থাকে?

পারদের অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য: ধাতু হয়েও তরল

ধাতু বলতে আমরা সাধারণত লোহা, অ্যালুমিনিয়াম বা স্টিলের মতো শক্ত ও মজবুত পদার্থকে বুঝি, যা সহজে গলে না। কিন্তু এই নিয়মের এক উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রম হলো পারদ। মাইনাস ৩৮.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস গলনাঙ্ক নিয়ে পারদ পর্যায় সারণির এমন দুটি মৌলের একটি, যা সাধারণ কক্ষতাপমাত্রায় তরল অবস্থায় থাকে। অন্যটি ব্রোমিন, তবে সেটি একটি অধাতু।

ধাতব বন্ধনের রহস্য

যুক্তরাজ্যের মিনিস্ট্রি অব ডিফেন্সের রসায়নের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক জো অ্যাশব্রিজের মতে, যেকোনো ধাতুর গলনাঙ্ক সরাসরি তার বন্ধনের শক্তির ওপর নির্ভর করে। বন্ধন যত শক্তিশালী হবে, তাকে ভাঙতে তত বেশি তাপ বা শক্তির প্রয়োজন হবে। অন্য সব ধাতুর মতো পারদের পরমাণুগুলোও ধাতব বন্ধনের মাধ্যমে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত থাকে।

পজিটিভ চার্জযুক্ত ধাতব আয়নগুলো বিশাল এক ইলেকট্রনের সমুদ্রে ভাসতে থাকে। এই ইলেকট্রনগুলো কোনো নির্দিষ্ট পরমাণুর সঙ্গে আটকে থাকে না, বরং স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়াতে পারে। পজিটিভ আয়ন এবং নেগেটিভ ইলেকট্রনের মধ্যকার এই তীব্র আকর্ষণ বলই ধাতুকে শক্ত করে ধরে রাখে। যে ধাতুর পরমাণু তার বাইরের কক্ষপথের যত বেশি ইলেকট্রন এই সমুদ্রে ছেড়ে দিতে পারে, তার আকর্ষণ বল বা বন্ধন তত শক্তিশালী হয়।

পারদের কিপটেমি: পূর্ণ সাবশেল তত্ত্ব

পারদের যোজ্যতা স্তরে ১২টি ইলেকট্রন রয়েছে, যা তার ধাতব বন্ধনে দেওয়ার কথা। কিন্তু এখানেই পারদ একটু কিপটেমি করে বসে। পারদের এই ইলেকট্রনগুলো পূর্ণ সাবশেলে থাকে। বিজ্ঞানের ভাষায়, কোনো কক্ষপথ যখন ইলেকট্রন দিয়ে পুরোপুরি ভর্তি থাকে, তখন সেটি খুব স্থিতিশীল হয়ে যায়। ফলে পারদ তার এই ইলেকট্রনগুলোকে অন্য পরমাণুর সঙ্গে সহজে শেয়ার করতে চায় না।

ইলেকট্রন শেয়ার না করার কারণে তাদের মধ্যকার ধাতব বন্ধন দুর্বল হয়ে পড়ে। কিন্তু বিজ্ঞানীদের হিসাব বলছে, শুধু এই পূর্ণ সাবশেল তত্ত্ব দিয়ে পারদের তরল হওয়াকে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা যায় না। এই তত্ত্ব অনুযায়ী পারদের গলনাঙ্ক হওয়া উচিত প্রায় ১৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অর্থাৎ, কক্ষতাপমাত্রায় পারদের তো রীতিমতো শক্ত কঠিন পদার্থ হয়ে থাকার কথা।

আপেক্ষিকতার প্রভাব: মূল কারণ

নিউজিল্যান্ডের ম্যাসি ইউনিভার্সিটির কোয়ান্টাম পদার্থবিদ পিটার শোয়ার্টফেগারের মতে, পারদের এই তরল অবস্থার পেছনে মূল কারণ হলো রিলেটিভিস্টিক ইফেক্টস বা আপেক্ষিকতার প্রভাব। পর্যায় সারণির একদম নিচের দিকে থাকা ভারী মৌলগুলোর পরমাণুর কেন্দ্রে প্রচুর প্রোটন থাকে। এই বিশাল পজিটিভ চার্জ বাইরের ইলেকট্রনগুলোকে এত জোরে নিজের দিকে টানে যে, ইলেকট্রনগুলো প্রায় আলোর গতির কাছাকাছি বেগে ঘুরতে শুরু করে।

আর কোনো কিছু যখন আলোর গতির কাছাকাছি চলে যায়, তখন সেখানে সাধারণ পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম আর খাটে না; সেখানে শুরু হয় আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা বা কোয়ান্টাম মেকানিকসের অদ্ভুত সব খেল। এই আপেক্ষিকতার প্রভাব পর্যায় সারণির ১১ এবং ১২ নম্বর গ্রুপের মৌলগুলোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। যেমন ১১ নম্বর গ্রুপের সোনার রং সাধারণ ধাতুর মতো রুপালি না হয়ে অদ্ভুত হলুদাভ হয়। আর ১২ নম্বর গ্রুপের পারদ হয়ে যায় তরল।

ল্যান্থানাইড সংকোচন ও ইলেকট্রনের ভর বৃদ্ধি

পারদের পরমাণুতে 4f নামে একটি সাবশেল থাকে, যা নিউক্লিয়াসের আকর্ষণকে বাইরের ইলেকট্রন পর্যন্ত পৌঁছাতে বাধা দেওয়ার ক্ষেত্রে খুবই দুর্বল। ফলে নিউক্লিয়াস বাইরের ইলেকট্রনগুলোকে খুব সহজেই নিজের দিকে টেনে নেয়। একে বলা হয় ল্যান্থানাইড সংকোচন। ইলেকট্রনগুলো যখন আলোর কাছাকাছি বেগে ঘোরে, তখন আপেক্ষিকতার সূত্র অনুযায়ী তাদের ভর বেড়ে যায়।

আর ভর বেড়ে গেলে নিউক্লিয়াস তাদের আরও বেশি কাছে টেনে নেয়। ফলে পারদের বাইরের কক্ষপথ প্রায় ২০ শতাংশ সংকুচিত হয়ে যায়। ইলেকট্রনগুলো নিউক্লিয়াসের এত কাছাকাছি শক্তভাবে আটকে থাকে যে, ধাতব বন্ধন তৈরি করার জন্য তারা আর স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়াতে পারে না। আর বন্ধন দুর্বল হয়ে যাওয়ার কারণেই পারদের গলনাঙ্ক হুড়মুড় করে নিচে নেমে যায় এবং এটি তরলে পরিণত হয়।

বিজ্ঞানের জটিল সমীকরণ

কোয়ান্টাম মেকানিকসের সাধারণ শ্রোডিঞ্জার সমীকরণ দিয়ে এই হিসাব মেলানো যায় না, কারণ এটি আইনস্টাইনের বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্বকে সমর্থন করে না। তাই বিজ্ঞানীদের অনেক জটিল ডিরাক সমীকরণ ব্যবহার করতে হয়। সুপারকম্পিউটারের সাহায্যে ডেনসিটি ফাংশনাল থিওরি ব্যবহার করে বিজ্ঞানী পিটার শোয়ার্টফেগার প্রমাণ করেছেন, শুধু এই আপেক্ষিকতার প্রভাবের কারণেই পারদের গলনাঙ্ক স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ১৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াস নিচে নেমে যায়।

এই গবেষণা পারদের মতো ভারী মৌলগুলোর আচরণ বুঝতে বিজ্ঞানীদের সাহায্য করছে এবং পদার্থবিজ্ঞানের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে। পারদের এই তরল অবস্থা শুধু একটি কৌতূহলই নয়, বরং এটি প্রকৃতির জটিলতা ও বিজ্ঞানের সৌন্দর্যের একটি উজ্জ্বল উদাহরণ।