পাইয়ের রহস্য: মুখস্থ রেকর্ড থেকে নাসার ব্যবহার পর্যন্ত বিস্ময়কর তথ্য
পাইয়ের রহস্য: মুখস্থ রেকর্ড থেকে নাসার ব্যবহার

পাইয়ের রহস্য: মুখস্থ রেকর্ড থেকে নাসার ব্যবহার পর্যন্ত বিস্ময়কর তথ্য

পাই সম্ভবত পৃথিবীর সবচেয়ে পরিচিত অমূলদ সংখ্যা, যা হাজার বছর ধরে গণিতবিদদের কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে আছে। এই আশ্চর্য সংখ্যাটি কীভাবে আবিষ্কৃত হলো এবং এর রহস্য আজও গবেষকদের মোহিত করে? চলুন, কিছু মজার ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের মাধ্যমে পাইয়ের জগতে ডুব দেওয়া যাক।

১. পাইয়ের মান মনে রাখার বিশ্ব রেকর্ড

পাইয়ের সবচেয়ে বেশি সংখ্যক অঙ্ক মুখস্থ করার রেকর্ডটি ভারতের ভেলোরের রাজবীর মীনার দখলে। ২০১৫ সালের ২১ মার্চ তিনি ১০ ঘণ্টা ধরে অবিশ্বাস্যভাবে ৭০ হাজার সংখ্যা মুখস্ত বলেন, যা গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস দ্বারা স্বীকৃত। এর আগে, ২০০৫ সালে চীনের চাও লু ৬৭ হাজার ৮৯০ দশমিক স্থান পর্যন্ত পাইয়ের মান মুখস্থ বলেছিলেন। তবে অফিশিয়াল রেকর্ডের বাইরে, জাপানের আকিরা হারাগুচি ২০০৫ সালে ১ লাখ দশমিক স্থান পর্যন্ত পাই মুখস্থ বলার ভিডিও প্রকাশ করেছিলেন এবং পরে তিনি তা আরও বাড়িয়ে ১ লাখ ১৭ হাজার পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছিলেন, যা গণিত প্রেমীদের জন্য একটি অসাধারণ কীর্তি।

২. পাইয়ের ওপর ভিত্তি করে একটি ভাষার সৃষ্টি

পাই সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে পিলিশ নামে একটি অনন্য ভাষা তৈরি হয়েছে, যেখানে প্রতিটি শব্দের অক্ষর সংখ্যা পাইয়ের দশমিক সংখ্যা অনুসারে সাজানো হয়। লেখক মাইক কিথ তার নট আ ওয়েক বইটি এই ভাষায় লিখেছিলেন। উদাহরণস্বরূপ, 'Now I fall, a tired suburbian in liquid under the trees, Drifting alongside forests simmering red in the twilight over Europe.' এই বাক্যে 'Now' শব্দে ৩টি অক্ষর, 'I' শব্দে ১টি, 'fall' শব্দে ৪টি—এভাবে এটি পাইয়ের মান ৩.১৪১৫… কে প্রতিফলিত করে, যা ভাষা ও গণিতের মেলবন্ধনকে চমৎকারভাবে উপস্থাপন করে।

৩. সুপারকম্পিউটারে পাইয়ের সর্বোচ্চ মান গণনা

২০২১ সালে সুইজারল্যান্ডের গবেষকরা একটি শক্তিশালী সুপারকম্পিউটার ব্যবহার করে পাই গণনার আগের সব রেকর্ড ভেঙে দেন। টানা ১০৮ দিন ধরে কম্পিউটার চালিয়ে তারা পাইয়ের ৬২.৮ ট্রিলিয়ন দশমিক পর্যন্ত মান নির্ণয় করেন, যা আগের রেকর্ডের চেয়ে ১২ ট্রিলিয়ন বেশি! তবে প্রশ্ন উঠেছে, এত বিশদে পাইয়ের মান নির্ণয়ের প্রয়োজনীয়তা কতটুকু, যখন ব্যবহারিক ক্ষেত্রে এর সীমিত প্রয়োগ দেখা যায়।

৪. নাসার মাত্র ১৬ দশমিক স্থান পর্যন্ত পাইয়ের ব্যবহার

বিশ্বের জটিল সব হিসাব মেলাতে নাসা কত দশমিক পর্যন্ত পাইয়ের মান ব্যবহার করে? ভাবতে পারেন সংখ্যাটা হাজার হাজার, কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, নাসা মাত্র ১৬ দশমিক স্থান পর্যন্ত পাইয়ের মান ব্যবহার করে। নাসার মতে, সৌরজগতের সুনির্দিষ্ট মান গণনার জন্য ৩.১৪১৫৯২৬৫৩৫৮৯৭৯৩ পর্যন্ত যথেষ্ট, কারণ এর বেশি মান ব্যবহার করলে খুব সামান্যই পার্থক্য তৈরি হয়, যা প্রকৌশলগত দিক থেকে গুরুত্বহীন।

৫. প্রাচীন সভ্যতায় পাইয়ের আবিষ্কার

প্রায় ৪ হাজার বছর আগে প্রাচীন ব্যাবিলনীয়রা পাই সংখ্যা সম্পর্কে জানত, যেখানে ১৯০০-১৬৮০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের মধ্যে তৈরি একটি মাটির ফলকে পাইয়ের মান দেওয়া ছিল ৩.১২৫। ১৬৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মিশরের একটি প্যাপিরাসে পাইয়ের মান পাওয়া গেছে ৩.১৬০৫। এরপর গ্রিক গণিতবিদ আর্কিমিডিস পাইয়ের মান আরও নিখুঁতভাবে নির্ণয়ের চেষ্টা করেন, তিনি পিথাগোরাসের উপপাদ্য ব্যবহার করে বৃত্তের ভেতর ও বাইরের বহুভুজের সাহায্যে পাইয়ের কাছাকাছি একটি মান বের করেন, যা গণনার ইতিহাসে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়।

পাই দিবস উপলক্ষে বিশ্বজুড়ে নানা আয়োজন দেখা যায়, যেমন ময়মনসিংহ জিলা স্কুলের শিক্ষার্থীরা ২০২০ সালের ১৪ মার্চ বৃহত্তম মানব পাই তৈরি করেছিল, যা গণিতের প্রতি তাদের উৎসাহকে প্রকাশ করে। পাইয়ের এই বিস্ময়কর দিকগুলো আজও গবেষক ও শিক্ষার্থীদের অনুপ্রাণিত করে চলেছে।