আইনস্টাইন বনাম নিউটন: পদার্থবিজ্ঞানের মহান দুই দিকপালের যুগান্তকারী আবিষ্কার
আলবার্ট আইনস্টাইন ও আইজ্যাক নিউটন—পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাসে দুই মহান বিজ্ঞানী, যাদের আবিষ্কার মহাবিশ্বের রহস্য উন্মোচনে যুগান্তকারী ভূমিকা রেখেছে। যখন কোনো বস্তু এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যায়, তখন পদার্থবিজ্ঞানে সেটিকে সরণ, বেগ ও ত্বরণের মতো এককের মাধ্যমে পরিমাপ করা হয়। সোজা পথে দূরত্ব হলো সরণ, আর বেগ হলো গতির সঙ্গে দিকের সমন্বয়। আর এই বেগের পরিবর্তনের হারই হলো ত্বরণ, যা সাইকেল চালানোর সময় গতি বাড়ানো বা কমানোর মতো দৈনন্দিন ঘটনায় সক্রিয় থাকে।
নিউটনের গতির সূত্র: মহাবিশ্বের নড়াচড়ার ভিত্তি
১৬৮৭ সালে আইজ্যাক নিউটন তাঁর প্রিন্সিপিয়া গ্রন্থে গতির তিনটি সূত্র উপস্থাপন করেন, যা পৃথিবীর ধূলিকণা থেকে মহাকাশের গ্রহ-নক্ষত্রের গতিবিধি ব্যাখ্যা করে। প্রথম সূত্র হলো জড়তা: বাইরের কোনো বল না দিলে স্থির বস্তু স্থির থাকবে এবং গতিশীল বস্তু সমান গতিতে চলতে থাকবে। যেমন, বাস হঠাৎ চলা শুরু করলে যাত্রীরা পেছনের দিকে হেলে পড়েন, যা জড়তার উদাহরণ।
দ্বিতীয় সূত্রটি গাণিতিক: F=ma, যেখানে F হলো বল, m হলো ভর, এবং a হলো ত্বরণ। এটি ব্যাখ্যা করে যে ভারী বস্তুকে ত্বরান্বিত করতে বেশি বলের প্রয়োজন হয়। তৃতীয় সূত্র হলো প্রত্যেক ক্রিয়ার সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া, যেমন নৌকা থেকে লাফ দেওয়ার সময় নৌকা পেছনে সরে যায় এবং ব্যক্তি সামনে এগোয়।
ভরবেগ ও গতিশক্তি: নিউটনের বিশ্বের গাণিতিক ব্যাখ্যা
নিউটনের সূত্রগুলোর মাধ্যমে ভরবেগ (P=mv) ও গতিশক্তি (K=1/2mv²) এর ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়। বিলিয়ার্ড বলের ধাক্কায় ভরবেগ সংরক্ষিত থাকে, যা বাইরের প্রভাব ছাড়া অপরিবর্তিত থাকে। গতিশক্তি বস্তুর গতির সঙ্গে সম্পর্কিত; গতি দ্বিগুণ হলে গতিশক্তি চার গুণ বৃদ্ধি পায়।
আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা: নিউটনের সীমা অতিক্রম
নিউটনের সূত্রগুলো সাধারণ গতির জন্য কার্যকর হলেও আলোর গতির কাছাকাছি বেগ বা শক্তিশালী মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রে সেগুলো অচল হয়ে পড়ে। ১৯০৫ সালে আলবার্ট আইনস্টাইন আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্ব (স্পেশাল রিলেটিভিটি) প্রস্তাব করেন, যা সময় ও স্থানের ধারণাকে আমূল বদলে দেয়।
এই তত্ত্ব অনুসারে, আলোর গতি ধ্রুব এবং সময়ের প্রবাহ পর্যবেক্ষকের গতির ওপর নির্ভরশীল। উদাহরণস্বরূপ, আলোর কাছাকাছি গতির ট্রেনে ভেতরের ঘড়ি ধীরে চলে এবং ট্রেনের দৈর্ঘ্য সংকুচিত মনে হয়। আইনস্টাইন আরও প্রতিষ্ঠা করেন যে ভরযুক্ত বস্তু আলোর গতি অর্জন করতে পারে না, কারণ এতে অসীম শক্তির প্রয়োজন।
জেনারেল রিলেটিভিটি: মহাকর্ষের নতুন ব্যাখ্যা
১৯১৫ সালে আইনস্টাইন সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব (জেনারেল রিলেটিভিটি) উপস্থাপন করেন, যা মহাকর্ষকে স্পেস-টাইমের জ্যামিতিক বক্রতা হিসেবে বর্ণনা করে। নিউটন মহাকর্ষকে দূরবর্তী আকর্ষণ বললেও, আইনস্টাইন একে স্থান-কালের চাদরের বক্রতা হিসেবে দেখান। ভারী বস্তু যেমন সূর্য এই চাদরকে বাঁকিয়ে দেয়, এবং গ্রহগুলো সেই বাঁকানো পথে ঘুরতে থাকে।
বিজ্ঞানের যুদ্ধ: কে জিতলেন?
আইনস্টাইনের তত্ত্বের সত্যতা প্রমাণিত হয় ১৯১৯ সালের সূর্যগ্রহণের সময়, যখন দূরবর্তী নক্ষত্রের আলো বেঁকে যাওয়া পরিমাপ করে দেখা যায় তাঁর ভবিষ্যৎবাণী সঠিক। নিউটনের হিসাবের চেয়ে আলো দ্বিগুণ বাঁকায়, যা আইনস্টাইনকে বিজ্ঞানের মহাতারকায় পরিণত করে। এই আবিষ্কার আমাদের শেখায় যে মহাবিশ্ব আমাদের ধারণার চেয়েও বেশি রহস্যময়, যেখানে সময় ও স্থান স্থির নয় বরং গতিশীল।
লেখক: শিক্ষার্থী, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সূত্র: সায়েন্স ইন সেকেন্ডস বই অবলম্বনে।
