আইনস্টাইনের অলৌকিক বছর: ১৯০৫ সালে কীভাবে পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাস বদলে দিলেন তিনি
ইতিহাসের পাতায় নাম লেখাতে বাঘা বাঘা বিজ্ঞানীদেরও বহু বছর লেগে যায়। সারা জীবনের সাধনায় তাঁরা পৃথিবীকে নতুন কিছু দেন। কিন্তু আলবার্ট আইনস্টাইনের গল্পটা একটু আলাদা। তিনি পদার্থবিজ্ঞানের জগৎটাকে ওলট–পালট করে দিয়েছিলেন, তা–ও মাত্র এক বছরের মধ্যে! ১৯০৫ সাল, যা ইতিহাসে ‘অ্যানাস মিরাবিলিস’ বা অলৌকিক বছর হিসেবে পরিচিত, সেটাই ছিল তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার সময়।
একজন পেটেন্ট কেরানির যাত্রা শুরু
১৯০৫ সালে আইনস্টাইনের বয়স ছিল ছাব্বিশের কোঠায়। তখনো তাঁর কপালে কোনো টিউশনি বা শিক্ষকের চাকরি জোটেনি। তিনি সুইজারল্যান্ডের বার্ন শহরের একটি পেটেন্ট অফিসে কাজ করতেন, ফাইল ঘাঁটতেন। বিয়ে করেছিলেন, ঘরে ফুটফুটে এক ছেলে হ্যান্স আলবার্ট আইনস্টাইন। সংসার সামলে, অফিসের কাজ সেরে যেটুকু সময় পেতেন, ডুবে যেতেন পদার্থবিজ্ঞানে। এর আগে তিনি বিখ্যাত অ্যানালেন ডের ফিজিক জার্নালে কিছু গবেষণাপত্র পাঠিয়েছিলেন, কিন্তু সেগুলো খুব একটা আহামরি ছিল না। কেউ তেমন পাত্তাও দেয়নি, প্রশংসা তো দূরের কথা।
বন্ধু মিকেল অ্যাঞ্জেলো বেসোর ভূমিকা
আইনস্টাইনের কাছে গবেষণার জন্য বড় কোনো ল্যাবরেটরি ছিল না, হাতের কাছে ছিল না সব বইও। কিন্তু তাঁর একজন দারুণ বন্ধু ছিল, নাম মিকেল অ্যাঞ্জেলো বেসো। মিকেল ছিলেন ইতালীয় বংশোদ্ভূত সুইস প্রকৌশলী, যিনি জুরিখ পলিটেকনিকে আইনস্টাইনের সঙ্গে একসঙ্গে পড়তেন। পরে আইনস্টাইনের সাহায্যেই মিকেল ওই পেটেন্ট অফিসে চাকরি পান। মিকেলের পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে বেশ ভালো জ্ঞান ছিল। অফিসের ফাঁকে বা অফিস শেষে বাড়ি ফেরার পথে দুই বন্ধু ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিজ্ঞান নিয়ে আড্ডা দিতেন। আইনস্টাইন মিকেলকে বলতেন, ইউরোপের সেরা সাউন্ডিং বোর্ড। মানে আইনস্টাইনের কঠিন সব আইডিয়া মিকেল মন দিয়ে শুনতেন, তারপর সেটা নিয়ে মতামত দিতেন। আইনস্টাইনের অনেক জটিল সমস্যার সমাধান এই আড্ডার মাধ্যমেই বেরিয়ে এসেছিল।
চারটি যুগান্তকারী গবেষণাপত্র
সব চিন্তা গুছিয়ে নিয়ে আইনস্টাইন প্রস্তুত হলেন। পৃথিবীকে চমকে দেওয়ার জন্য তিনি চারটি গবেষণাপত্র লিখলেন, যা ১৯০৫ সালে প্রকাশিত হলো এবং বিজ্ঞানের ইতিহাস বদলে দিল।
- ফটোইলেকট্রিক ইফেক্ট (৯ জুন): আইনস্টাইন দেখালেন, আলো সব সময় ঢেউয়ের মতো আচরণ করে না; বিশেষ কিছু পরিস্থিতিতে এটি ছোট ছোট কণা বা ফোটন হিসেবে আচরণ করে। এই আবিষ্কারের জন্য তিনি ১৯২১ সালে নোবেল পুরস্কার পান, যদিও তিনি আপেক্ষিকতা তত্ত্বের জন্য বেশি পরিচিত।
- ব্রাউনীয় গতি (১৮ জুলাই): আইনস্টাইন প্রমাণ করলেন, ধূলিকণা বা ফুলের রেণুর নাচানাচি অকারণ নয়; পানির বা বাতাসের অদৃশ্য অণু-পরমাণুগুলোই এদের ধাক্কা দেয়। এই পেপার রবার্ট ব্রাউনের পর্যবেক্ষণ করা ব্রাউনীয় গতির ওপর ভিত্তি করে লেখা হয়েছিল এবং এটি পরমাণুর অস্তিত্ব প্রমাণ করে।
- বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব (২৬ সেপ্টেম্বর): এই পেপারে আইনস্টাইন দেখালেন, সময় সবার জন্য সমান নয়। আলোর গতি সব সময় সমান থাকে, এবং স্থান ও কালের ধারণা পাল্টে গেল। এই পেপারের শিরোনাম ছিল ‘অন দ্য ইলেকট্রোডাইনামিকস অব মুভিং বডিজ’।
- ভর-শক্তি সমীকরণ (২১ নভেম্বর): আইনস্টাইন প্রমাণ করলেন, বস্তুর ভর ও শক্তি আসলে একই জিনিসের দুই রূপ। ভরকে শক্তিতে রূপান্তর করা যায়, যা থেকে এল পৃথিবীর সবচেয়ে বিখ্যাত সমীকরণ: E=mc²। এখানে E মানে শক্তি, m মানে ভর, আর c মানে আলোর গতি। এই সমীকরণ পরবর্তীতে পারমাণবিক বোমা ও নিউক্লিয়ার বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভিত্তি হয়ে ওঠে।
বিজ্ঞানী মহলে সাড়া ও স্বীকৃতি
চারটি পেপার প্রকাশিত হওয়ার পর বিজ্ঞানীদের টনক নড়ল। তৎকালীন বিখ্যাত পদার্থবিদেরা নড়েচড়ে বসলেন এবং আইনস্টাইনের থিওরিগুলো পরীক্ষা করে দেখলেন, তিনি ঠিকই বলছেন। সবাই খোঁজ নিতে শুরু করলেন, কে এই আলবার্ট আইনস্টাইন? তিনি কোনো বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর নন, বরং সামান্য এক পেটেন্ট অফিসের কেরানি। জ্যাকব জোহান লব নামের এক তরুণ পদার্থবিদ আইনস্টাইনের কাজ দেখে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে চিঠি লিখলেন এবং ১৯০৮ সালে বার্নে এসে দেখা করলেন। জ্যাকব অবাক হয়ে বললেন, ‘এ তো আপনার মেধার অপচয়!’ কিন্তু আইনস্টাইন হাসিমুখে উত্তর দিলেন, ‘এই চাকরিতে বেতন ভালো, সংসার চলে যায়, আর সবচেয়ে বড় কথা, এখানে আমি পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে ভাবার জন্য প্রচুর সময় পাই।’
অলৌকিক বছরের পরের জীবন
১৯০৫ সালের সেই জাদুকরি বছরের পর আইনস্টাইন আর সাধারণ কেরানি রইলেন না। তাঁর স্বপ্নের দরজা খুলে গেল, এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার ডাক আসতে শুরু করল। তিনি বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্বকে আরও উন্নত করার চেষ্টা করছিলেন, মহাকর্ষকে কীভাবে এই তত্ত্বের সঙ্গে মেলানো যায় তা ভাবছিলেন, যা পরবর্তীতে সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্বের জন্ম দেয়। আইনস্টাইনের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ল, এবং তিনি ইতিহাসের অন্যতম সেরা বিজ্ঞানী হিসেবে স্বীকৃতি পেলেন।
এই গল্পটি ডি কে প্রকাশনীর লাইফ স্টোরিস সিরিজের আলবার্ট আইনস্টাইন বই অবলম্বনে লেখা হয়েছে, যা আইনস্টাইনের অলৌকিক বছরের বিস্তারিত বিবরণ দেয়।
