রাইজিং স্টার অ্যাওয়ার্ড কী এবং কেন দেওয়া হয়? সেঁজুতি সাহার সাফল্যের গল্প
রাইজিং স্টার অ্যাওয়ার্ড কী ও কেন? সেঁজুতি সাহার সাক্ষাৎকার

রাইজিং স্টার অ্যাওয়ার্ড কী এবং কারা পান?

স্যাবিন ভ্যাকসিন ইনস্টিটিউট দীর্ঘদিন ধরে ‘গোল্ড মেডেল অ্যাওয়ার্ড’ প্রদান করে আসছে, যা লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড হিসেবে বিবেচিত। অনেক বড় বড় বিজ্ঞানী এই সম্মাননা পেয়েছেন। তবে ২০২০ সাল থেকে তারা আরেকটি পুরস্কার চালু করেছে, যার নাম ‘রাইজিং স্টার অ্যাওয়ার্ড’। ৪০ বছরের নিচের বিজ্ঞানীরা এই পুরস্কারের জন্য মনোনীত হন।

সেঁজুতি সাহার স্বীকৃতি ও কাজ

সেঁজুতি সাহা অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে একটি বৈঠকে ছিলেন। হঠাৎ স্যাবিন ভ্যাকসিন ইনস্টিটিউটের প্রধান নির্বাহীর ফোন আসে। তিনি তাকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, বোর্ড কোনো দ্বিধা ছাড়াই পুরস্কারের জন্য তার নাম চূড়ান্ত করেছে। স্যাবিন মূলত ভ্যাকসিন ও ভ্যাকসিনেশন নিয়ে কাজ করা মানুষদের স্বীকৃতি দেয়। কেউ গবেষণায় কাজ করেছেন, কেউ হয়তো টিকা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কাজ করেছেন—এই পুরো ক্ষেত্রের অবদানের জন্যই পুরস্কারগুলো দেওয়া হয়।

তাকে মূলত টাইফয়েড কনজুগেট ভ্যাকসিন নিয়ে ল্যাবে গবেষণার জন্য এই স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। গত বছরের ১২ অক্টোবর বাংলাদেশে একটি বড় টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছিল। লক্ষ্য ছিল প্রায় পাঁচ কোটি শিশুকে টাইফয়েড কনজুগেট টিকা দেওয়া। এক মাসের মধ্যে প্রায় সাড়ে চার কোটি শিশুকে টিকা দেওয়া সম্ভব হয়েছে। এখানে সবচেয়ে বড় ভূমিকা বাংলাদেশের ইপিআই (সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি) ব্যবস্থার। স্বাস্থ্যকর্মী, মাঠপর্যায়ের কর্মী, স্কুলশিক্ষক—অনেকে দিনরাত কাজ করেছেন। ইউনিসেফসহ বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগীও ছিল। তার কাজটা ছিল তার আগের ধাপে। কোনো টিকা দেশে আনতে হলে প্রমাণ লাগবে কেন সেটি দরকার, কী ধরনের ঝুঁকি আছে, অর্থায়নের যৌক্তিকতা কী। সেই উপাত্ত সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করাই ছিল তার কাজ।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

জিনোম সিকোয়েন্সিং নিয়ে সেঁজুতি সাহার কাজ

সিএইচআরএফ অনেক আগে থেকে টাইফয়েডের প্রাদুর্ভাব নিয়ে গবেষণা করে আসছে। ২০১৬ সালে তারা টাইফয়েড জিনমিক্স নিয়ে কাজ শুরু করে। তখন অ্যাজিথ্রোমাইসিন প্রতিরোধী কিছু টাইফয়েড কেস দেখা যায়। এটি খুবই উদ্বেগজনক ছিল, কারণ এই অ্যান্টিবায়োটিকটি সাধারণভাবে বহুল ব্যবহৃত। এর আগে বিশ্বের কোথাও এ ধরনের প্রতিরোধের রিপোর্ট ছিল না।

তারা জিনোম সিকোয়েন্সিং করে কিছু নির্দিষ্ট মিউটেশন খুঁজে পায়। পরে তারা আরেকটি ল্যাবরেটরি ব্যাকটেরিয়ার মধ্যে সেই মিউটেশন প্রবেশ করিয়ে পরীক্ষা করে। বাংলাদেশে তখন সেই সক্ষমতা ছিল না, তাই ক্যালিফোর্নিয়ায় সহকর্মীদের ল্যাবে কাজটি করা হয়। তারা প্রমাণ করতে সক্ষম হয় যে ওই মিউটেশনই অ্যাজিথ্রোমাইসিন প্রতিরোধ তৈরি করছে। পরে বাংলাদেশে ফলাফল যাচাই করা হয় এবং বিশ্বের প্রথম অ্যাজিথ্রোমাইসিন প্রতিরোধী জিনোমের গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয় বাংলাদেশ থেকে।

জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ের গুরুত্ব

সেঁজুতি সাহা বলেন, একটি ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাস কেমন আচরণ করবে, কোন অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করবে, কীভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে—সবকিছুর উত্তর তার ডিএনএর মধ্যে আছে। মানুষের চুলের রং, উচ্চতা বা শারীরিক বৈশিষ্ট্য যেমন ডিএনএ নির্ধারণ করে, একইভাবে জীবাণুর বৈশিষ্ট্যও তার ডিএনএ নির্ধারণ করে। জিনোম সিকোয়েন্সিং করে বোঝা যায় কোন জিন অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ তৈরি করছে, কোন পরিবর্তনের কারণে জীবাণু আরও সংক্রামক হচ্ছে বা কোন অংশকে লক্ষ্য করে ভ্যাকসিন তৈরি করা যেতে পারে।

বাংলাদেশে জিনোমভিত্তিক রোগ নজরদারি ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা

ভবিষ্যতের মহামারি মোকাবিলায় জিনোমিক সার্ভেইল্যান্স অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেঁজুতি সাহা মনে করেন, পরবর্তী মহামারি আবারও কোনো শ্বাসতন্ত্রের ভাইরাস থেকেই আসতে পারে। কোভিডের সময় দ্রুত জিনোম সিকোয়েন্সিং করতে পেরেছিল বলেই বিশ্ব বুঝতে পেরেছিল এটি সার্স-কোভ-২। বাংলাদেশেও যদি নিয়মিতভাবে হাসপাতাল ও কমিউনিটি থেকে নমুনা সংগ্রহ করে সিকোয়েন্সিং করা যায়, তাহলে আগে থেকেই বোঝা যাবে কোন ভাইরাস ছড়াচ্ছে, কোনটির প্রাদুর্ভাব বাড়ছে, কতটা ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

এর জন্য প্রথমেই দরকার শক্তিশালী নেটওয়ার্ক। মাইক্রোবায়োলজি ল্যাব, চিকিৎসক, রিপোর্টিং সিস্টেম—সবকিছুকে যুক্ত করতে হবে। যুক্তরাজ্যে যেভাবে কোনো ল্যাবে টাইফয়েড জীবাণু শনাক্ত হলেই সেটি সঙ্গে সঙ্গে কেন্দ্রীয় কিছু জিনমিক্স ল্যাবে পাঠানো হয় সিকোয়েন্সিংয়ের জন্য, বাংলাদেশেরও সে ধরনের ব্যবস্থা দরকার।

বাংলাদেশের অনেক টাইফয়েড রোগী এখনো ওরাল অ্যান্টিবায়োটিক নিয়ে ভালো হয়ে যায়। কিন্তু যদি এমন সময় আসে, যখন এসব অ্যান্টিবায়োটিক আর কাজ করবে না, তখন সবাইকে হাসপাতালে ভর্তি করে ইনজেকশন দিতে হবে। সেটা ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করবে। জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ের মাধ্যমে আগেভাগেই সেই ঝুঁকি বোঝা সম্ভব।

সত্যি বলতে, কেউ বিশ্বাস করত না বাংলাদেশে বসে তারা এটা করতে পারবে। বিদেশি ল্যাব বা সহকর্মীদের অনেকেই বলতেন, স্যাম্পল পাঠিয়ে দাও, আমরা কম খরচে করে দেব। কিন্তু তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, স্যাম্পল বাইরে পাঠাবে না। দেশে বসেই করবে। খরচ বেশি হবে, কষ্ট বেশি হবে, তবু নিজেদের সক্ষমতা গড়ে তুলবে। আজ এই স্বীকৃতি আসলে শুধু তার নয়, এটা বাংলাদেশের। এটা তাদের প্রতিষ্ঠানের। কারণ, একসময় কেউ তাদের বিশ্বাস করেনি, কিন্তু এখন বাংলাদেশ বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছে—আমরাও পারি।