আইসক্রিমের বিজ্ঞান: কীভাবে তৈরি হয় এই মোলায়েম মিষ্টি খাবার
আইসক্রিমের বিজ্ঞান: কীভাবে তৈরি হয় এই মোলায়েম মিষ্টি খাবার

গরমের দিনে আইসক্রিম খেতে কার না ভালো লাগে! রোদে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ একটা ঠান্ডা আইসক্রিম হাতে পেলে মনে হয়, পৃথিবীর সব আনন্দ বুঝি এর মধ্যে লুকিয়ে আছে। তুমি কি ভেবেছ, এই নরম, মসৃণ আর সুস্বাদু খাবারটির ভেতরে আসলে কী চলছে?

আইসক্রিমের জটিল গঠন

আইসক্রিমকে আমরা সাধারণত একটি জমাট মিষ্টি খাবার হিসেবে দেখি। কিন্তু রাসায়নিক দিক দিয়ে এটি বেশ জটিল। আইসক্রিমের ভেতরে একসঙ্গে কাজ করে রসায়ন, পদার্থবিজ্ঞান, তাপগতিবিদ্যা এবং খাদ্যবিজ্ঞানের নানা নিয়ম। এক স্কুপ আইসক্রিম আসলে একধরনের মাল্টি-ফেজ সিস্টেম। মানে এখানে একই সঙ্গে কঠিন, তরল এবং গ্যাস, তিন ধরনের অবস্থার পদার্থ উপস্থিত থাকে।

আইসক্রিমের ভেতরে থাকে বরফের স্ফটিক, দুধের চর্বির ক্ষুদ্র কণা, প্রোটিন, চিনি, লবণাক্ত দ্রবণ এবং বায়ুর বুদ্‌বুদ। এসব উপাদান একটি জটিল কাঠামোর মধ্যে সাজানো থাকে। এই কাঠামো ঠিকমতো তৈরি না হলে আইসক্রিম কখনোই নরম ও মোলায়েম স্বাদ পায় না। নরম আর মোলায়েম স্বাদের কারণেই কিন্তু আমাদের আইসক্রিম খেতে এত ভালো লাগে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আইসক্রিমের উপাদান

আইসক্রিম তৈরির প্রধান উপাদান হলো দুধ বা ক্রিম, চিনি, পানি এবং বিভিন্ন স্বাদের উপাদান। দুধ বা ক্রিম থেকে আসে চর্বি ও প্রোটিন। এই দুটি উপাদান আইসক্রিমের গঠন তৈরিতে খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

পানিই আইসক্রিমের সবচেয়ে বড় অংশ। মিশ্রণ ঠান্ডা করা হলে এই পানি থেকেই বরফের স্ফটিক তৈরি হয়। কিন্তু আইসক্রিমের সব পানি কখনোই বরফ হয়ে যায় না। কিছু অংশ তরল অবস্থায় থাকে, কারণ এতে দ্রবীভূত থাকে চিনি ও অন্যান্য পদার্থ।

চিনি শুধু আইসক্রিমকে মিষ্টি করে না, বরং আইসক্রিমের জমাট বাঁধার তাপমাত্রা কমিয়ে দেয়। ফলে মিশ্রণের সব পানি একসঙ্গে বরফ হয়ে যায় না। এ কারণে আইসক্রিম শক্ত বরফের মতো না হয়ে নরম থাকে।

এ ছাড়া অনেক আইসক্রিমে স্ট্যাবিলাইজার ও ইমালসিফায়ার ব্যবহার করা হয়। এগুলো আইসক্রিমের গঠন স্থির রাখতে সাহায্য করে এবং বরফের স্ফটিক বড় হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমায়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বরফের স্ফটিক যেভাবে তৈরি হয়

আইসক্রিমের গঠনের পেছনে আছে বরফের স্ফটিক। যখন আইসক্রিমের মিশ্রণ ঠান্ডা হতে শুরু করে, তখন পানির অণুগুলো একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ছোট ছোট বরফের স্ফটিক তৈরি করে। এই স্ফটিকের আকার আইসক্রিমের মান নির্ধারণ করে। যদি স্ফটিক খুব ছোট হয়, তাহলে আইসক্রিম মসৃণ আর ক্রিমি লাগে। যদি স্ফটিক বড় হয়ে যায়, তাহলে আইসক্রিম খেতে বরফের মতো শক্ত ও খসখসে মনে হয়।

এ কারণে আইসক্রিম তৈরি করার সময় মিশ্রণকে ক্রমাগত নাড়ানো বা ঘোরানো হয়। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় চর্নিং। এতে বরফের স্ফটিক বড় হতে পারে না এবং মিশ্রণের মধ্যে সমানভাবে ছড়িয়ে থাকে। ঘোরানোর সময় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করা হয়। মিশ্রণের মধ্যে বায়ু প্রবেশ করানো হয়। এই বায়ু আইসক্রিমকে হালকা ও ফোমের মতো করে তোলে।

দুধের চর্বি যে কাজ করে

আইসক্রিমের স্বাদ, গঠন আর মুখে লাগার অনুভূতির পেছনে আছে দুধের চর্বি। দুধে চর্বি থাকে অত্যন্ত ক্ষুদ্র গোলাকার কণার আকারে। এই ক্ষুদ্র কণাগুলোকে বলে ফ্যাট গ্লোবিউল। প্রতিটি ফ্যাট গ্লোবিউলের ওপরে থাকে একটি পাতলা প্রোটিন ও ফসফোলিপিডের আবরণ, যা একে স্থিতিশীল রাখে এবং দুধের ভেতরে সমানভাবে ছড়িয়ে থাকতে সাহায্য করে।

আইসক্রিম তৈরির সময় দুধ বা ক্রিমকে প্রথমে হোমোজেনাইজেশন নামের একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নেওয়া হয়। এই প্রক্রিয়ায় বড় বড় চর্বিকণা ভেঙে আরও ছোট হয়ে যায় এবং সেগুলো মিশ্রণের মধ্যে সমানভাবে ছড়িয়ে পড়ে। এই ধাপটি খুব গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এতে আইসক্রিমের টেক্সচার অনেক বেশি মসৃণ হয়।

এরপর যখন আইসক্রিমের মিশ্রণকে ঠান্ডা করা ও নেড়ে দেওয়া শুরু হয়, তখন চর্বিকণাগুলোর মধ্যে একটি নতুন ধরনের আচরণ দেখা যায়। কিছু ফ্যাট গ্লোবিউল আংশিকভাবে ভেঙে গিয়ে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হতে শুরু করে। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় পার্শিয়াল কোয়ালেসেন্স। এর ফলে ছোট ছোট চর্বিকণা মিলিত হয়ে একটি সূক্ষ্ম জালের মতো গঠন তৈরি করে।

এই চর্বির জাল আইসক্রিমের ভেতরের কাঠামোকে স্থিতিশীল করে। এটি বরফের স্ফটিক ও বায়ুর বুদ্‌বুদকে ঘিরে ধরে এবং এদের জায়গায় ধরে রাখে। ফলে আইসক্রিম গলে যাওয়ার আগপর্যন্ত নরম ও ফোমের মতো গঠন বজায় থাকে।

দুধের চর্বি আইসক্রিমের ফ্লেভার বা স্বাদ বহনকারী হিসেবে কাজ করে। অনেক সুগন্ধি অণু চর্বির মধ্যে ভালোভাবে দ্রবীভূত হয়। ফলে ভ্যানিলা, চকলেট বা স্ট্রবেরির মতো ফ্লেভারগুলো চর্বির মাধ্যমে আইসক্রিমের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। দীর্ঘ সময় ধরে মুখে স্বাদ রেখে যায়।

মুখে দেওয়ার পর দুধের চর্বি ধীরে ধীরে গলে যেতে শুরু করে। মানুষের শরীরের তাপমাত্রা প্রায় ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা আইসক্রিমের চর্বিকে দ্রুত গলিয়ে দেয়। এই গলনের সময় আইসক্রিমের ভেতরের গঠন ভেঙে যায়। ফলে আমরা সেই পরিচিত ক্রিমি অনুভূতি পাই।

যদি আইসক্রিমে দুধের চর্বির পরিমাণ খুব কম হয়, তাহলে আইসক্রিম অনেক সময় শুষ্ক বা বরফের মতো শক্ত লাগে।

আইসক্রিমে কেন বায়ুর বুদ্‌বুদ লাগে

আইসক্রিমের ভেতরে বায়ু কেন লাগবে, তোমার মনে প্রশ্ন খচখচ করতে পারে। সেই ব্যাখ্যায় যাওয়া যাক। অনেকের মতো তুমি কিন্তু ভেবো না, আইসক্রিমে বায়ু মানে কিছু ফাঁকা জায়গা। বাস্তবে বায়ু আইসক্রিমের গঠন তৈরির এক অপরিহার্য উপাদান।

আইসক্রিম তৈরির সময় মিশ্রণকে যখন দ্রুত ঘোরানো হয়, তখন এর মধ্যে বাতাস ঢুকে পড়ে। এই বাতাস ছোট ছোট বুদ্‌বুদের আকারে আইসক্রিমের মধ্যে আটকে থাকে। এই বুদ্‌বুদগুলোকে ঘিরে থাকে চর্বি ও প্রোটিনের একটি পাতলা স্তর, যা এদের স্থিতিশীল রাখে।

এই বায়ুর বুদ্‌বুদগুলো আইসক্রিমকে হালকা ও নরম করে তোলে। যদি আইসক্রিমে বায়ু না থাকত, তাহলে এটি অনেক বেশি ঘন এবং ভারী হয়ে যেত। তখন আইসক্রিম স্কুপ করা কঠিন হয়ে পড়ত এবং খেতেও তেমন আরাম লাগত না।

আইসক্রিমে বায়ুর পরিমাণকে ওভাররান নামে একটি পরিমাপ দিয়ে প্রকাশ করা হয়। ওভাররান বলতে বোঝায়, আইসক্রিমের মিশ্রণের তুলনায় শেষমেশ আইসক্রিমের আয়তন কতটা বেড়েছে। যেমন যদি একটি আইসক্রিম মিশ্রণের আয়তন এক লিটার হয় এবং প্রস্তুত হওয়ার পরে তা দুই লিটার হয়ে যায়, তাহলে সেই আইসক্রিমের ওভাররান হবে ১০০ শতাংশ। অনেক বাণিজ্যিক আইসক্রিমে ৫০ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত ওভাররান থাকতে পারে।

তবে সব আইসক্রিমে বায়ুর পরিমাণ এক রকম না। যেমন ইতালির জেলাটোতে সাধারণ আইসক্রিমের তুলনায় অনেক কম বায়ু থাকে। ফলে জেলাটো সাধারণত বেশি ঘন ও ভারী হয়।

আর থাকে চিনি

চিনি পানিতে দ্রবীভূত হলে দ্রবণের জমাট বাঁধার তাপমাত্রা বা ফ্রিজিং পয়েন্ট কমে যায়। এ ঘটনাকে বলা হয় ফ্রিজিং পয়েন্ট ডিপ্রেশন।

যদি শুধু পানি ফ্রিজে রাখা হয়, তাহলে তা শূন্য ডিগ্রি সেলসিয়াসে জমে বরফ হয়ে যায়। কিন্তু যখন পানিতে চিনি বা অন্য দ্রবীভূত পদার্থ থাকে, তখন সেই দ্রবণকে জমতে আরও কম তাপমাত্রা প্রয়োজন হয়।

আইসক্রিমের ক্ষেত্রে একই ঘটনা ঘটে। চিনির দ্রবণ থাকায় আইসক্রিমের সব পানি একসঙ্গে বরফ হয়ে যায় না। কিছু অংশ তরল অবস্থায় থেকে যায়। এই তরল অংশটি বরফের স্ফটিক, চর্বি এবং বায়ুর বুদ্‌বুদের মাঝখানে একটি সংযোগকারী মাধ্যম হিসেবে কাজ করে।

ফলে আইসক্রিম শক্ত বরফে পরিণত হয় না এবং তার টেক্সচার নরম ও মোলায়েম থাকে। চিনির পরিমাণ খুব কম হলে আইসক্রিম শক্ত হয়ে যেতে পারে, আর খুব বেশি হলে আইসক্রিম ঠিকভাবে জমতে চায় না।

মাইক্রো স্কেলে আইসক্রিম

খালি চোখে আমরা আইসক্রিমকে একটি মসৃণ সাদা বা রঙিন খাবার হিসেবে দেখি। কিন্তু শক্তিশালী ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপ দিয়ে দেখলে এর ভেতরে এক বিস্ময়কর জগৎ দেখতে পাবে।

আইসক্রিমের ভেতরে বিভিন্ন আকারের কণিকা ও গঠন থাকে। বরফের স্ফটিক সাধারণত ১০ থেকে ২০ মাইক্রোমিটার আকারের হয়। বায়ুর বুদ্‌বুদ সাধারণত ২০ থেকে ৫০ মাইক্রোমিটার পর্যন্ত হতে পারে। আর দুধের চর্বির কণাগুলো প্রায় এক মাইক্রোমিটার আকারের।

এসব উপাদান একটি চিনিযুক্ত তরলের মধ্যে ছড়িয়ে থাকে এবং একে অপরের সঙ্গে জটিলভাবে যুক্ত থাকে। এই সূক্ষ্ম কাঠামোই আইসক্রিমের মসৃণতা, ঘনত্ব এবং মুখে লাগার অনুভূতি নির্ধারণ করে।

যদি বরফের স্ফটিক বড় হয়ে যায়, তাহলে আইসক্রিম খেতে খসখসে লাগবে। তাই ভালো মানের আইসক্রিম তৈরির সময় বরফের স্ফটিক যত ছোট রাখা যায়, ততই ভালো।

আইসক্রিম শক্ত হয়ে যায় না কেন

ফ্রিজে রাখা আইসক্রিম অনেক সময় কিছুদিন পর শক্ত হয়ে যায় বা এর টেক্সচার খারাপ হয়ে যায়। এর প্রধান কারণ হলো রিক্রিস্টালাইজেশন। আইসক্রিম যখন সামান্য গলে গিয়ে আবার জমে, তখন ছোট ছোট বরফের স্ফটিক ভেঙে গিয়ে বড় স্ফটিকে পরিণত হয়। এই বড় স্ফটিক আইসক্রিমকে শক্ত করে দেয়, এর মসৃণ গঠন নষ্ট করে দেয়।

এ কারণেই আইসক্রিমকে যতটা সম্ভব স্থির তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ। দেখবে, দোকানে পোলার আইসক্রিমের ফ্রিজ থাকে। পোলার দোকানদারকে স্থির তাপমাত্রায় আইসক্রিম সংরক্ষণ করায় সাহায্য করতে ভালো মানের ফ্রিজ সরবরাহ করে। বারবার ফ্রিজ থেকে বের করে আবার রাখা হলে আইসক্রিমের গঠন দ্রুত নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

আইসক্রিমের নানা রূপ

সব ঠান্ডা মিষ্টিই আসলে আইসক্রিম নয়। বিভিন্ন দেশে নানা ধরনের হিমায়িত ডেজার্ট তৈরি হয়, যেগুলোর গঠন ও উপাদান আলাদা।

ইতালির জেলাটো সাধারণ আইসক্রিমের তুলনায় কম বায়ু ও কম চর্বি দিয়ে তৈরি হয়। তাই এটি অনেক বেশি ঘন এবং স্বাদও বেশি তীব্র হয়।

সোরবে সাধারণত ফলের রস, পানি ও চিনি দিয়ে তৈরি করা হয়। এতে সাধারণত দুধ বা চর্বি থাকে না।

এ ছাড়া সফট সার্ভ নামের একধরনের আইসক্রিম আছে, যা বিশেষ মেশিন থেকে সরাসরি বের করা হয় এবং এটি সাধারণ আইসক্রিমের তুলনায় বেশি নরম।

আমরা যখন এক স্কুপ আইসক্রিম খাই, তখন মনে হয় এটি শুধু একটি ঠান্ডা মিষ্টি খাবার। কিন্তু বাস্তবে এর ভেতরে লুকিয়ে আছে বরফের ক্ষুদ্র স্ফটিক, দুধের চর্বির জাল, চিনির দ্রবণ এবং বায়ুর অসংখ্য ক্ষুদ্র বুদ্‌বুদ। এসব উপাদানের নিখুঁত সমন্বয়ে তৈরি হয় বলে আমরা পাই মুখে গলে যাওয়া এক দারুণ আইসক্রিম। যার পেছনে বিজ্ঞান আছে।