গণিতের বিষণ্ণ জাদুকর কুর্ট গোডেলের জীবনকাহিনি
গণিতের বিষণ্ণ জাদুকর কুর্ট গোডেলের জীবনকাহিনি

বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে গণিতের জগতে এক উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছিল। ডেভিড হিলবার্ট ও বার্ট্রান্ড রাসেলের মতো দিকপাল গণিতবিদরা বিশ্বাস করতেন, গণিত মহাবিশ্বের সবচেয়ে নিখুঁত ও ত্রুটিহীন ভাষা। তাদের ধারণা ছিল, গণিতে এমন কোনো সত্য নেই যা প্রমাণ করা যাবে না। কিন্তু ১৯৩১ সালে বিনা মেঘে বজ্রপাত ঘটে। ২৫ বছর বয়সী এক লাজুক তরুণ, কুর্ট গোডেল, একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করে পুরো বিশ্বকে জানিয়ে দেন, 'আপনারা ভুল ভাবছেন। গণিতে এমন অনেক সত্য আছে যা চিরকাল সত্য হলেও প্রমাণ করা সম্ভব নয়!'

শৈশব ও শিক্ষা

কুর্ট গোডেলের জন্ম ১৯০৬ সালের ২৮ এপ্রিল, বর্তমান চেক প্রজাতন্ত্রের ব্রনো শহরে। তার পরিবার ছিল অবস্থাপন্ন; বাবা রুডলফ গোডেল একটি টেক্সটাইল কারখানার ম্যানেজিং ডিরেক্টর ছিলেন। ছোটবেলা থেকেই গোডেল ছিলেন অত্যন্ত কৌতূহলী, যার কারণে পরিবারের লোকজন তাকে 'মিস্টার হোয়াই' ডাকনামে ডাকতেন। তবে তার শৈশব খুব মসৃণ ছিল না। মাত্র ছয় বছর বয়সে বাতজ্বরে আক্রান্ত হন, যা তার মনে গভীর দাগ ফেলে। আট বছর বয়সে চিকিৎসা বই পড়ে তিনি বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে তার হৃৎপিণ্ড স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই অমূলক ভয় তার সারা জীবন তাড়া করে, যা হাইপোকনড্রিয়ার সূচনা করে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান সাম্রাজ্য ভেঙে চেকোস্লোভাকিয়া গঠিত হলে গোডেলের পরিবার জার্মানভাষী সংখ্যালঘুতে পরিণত হয়। গোডেল নিজেকে বহিরাগত মনে করতেন এবং চেক ভাষা ভালো বলতে পারতেন না। স্কুলে তিনি ছিলেন অসাধারণ ছাত্র; হাইস্কুল শেষ করার আগেই বিশ্ববিদ্যালয় সমমানের গণিত আয়ত্ত করেছিলেন। ভাষা শেখার প্রতিও তার দারুণ ঝোঁক ছিল, এবং তিনি ল্যাটিন ভাষায় কখনো ব্যাকরণগত ভুল করেননি।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ভিয়েনা ও অসম্পূর্ণতা উপপাদ্য

১৯২৩ সালে গোডেল অস্ট্রিয়ার নাগরিকত্ব গ্রহণ করে ভিয়েনায় চলে যান এবং ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানে ভর্তি হন। সেখানে মরিৎজ শ্লিক, হ্যান্স হান ও ফিলিপ ফুর্তওয়াংলারের মতো বিখ্যাত শিক্ষকদের সংস্পর্শে আসেন। ফুর্তওয়াংলার, যিনি শারীরিকভাবে অক্ষম হলেও গণিতের প্রতি অগাধ ভালোবাসা রাখতেন, গোডেলকে গণিতের প্রতি আকৃষ্ট করেন। পরে শ্লিকের সেমিনারে বার্ট্রান্ড রাসেলের 'ইন্ট্রোডাকশন টু ম্যাথমেটিক্যাল ফিলোসফি' পড়ে গাণিতিক যুক্তিশাস্ত্রের প্রতি তার গভীর আগ্রহ জন্মায়।

গোডেল ভিয়েনা সার্কেলের সদস্য হন, যেখানে তিনি সে সময়ের গণিতের সবচেয়ে বড় সংকট সম্পর্কে জানতে পারেন। উনিশ শতকের শেষে জর্জ ক্যান্টরের সেট থিওরি গণিতের ভিত্তি হলেও তাতে রাসেলের প্যারাডক্সের মতো ত্রুটি ধরা পড়ে। গণিতবিদরা তখন হিলবার্টস প্রোগ্রামের মাধ্যমে একটি নিখুঁত ভিত্তি খুঁজতে মরিয়া ছিলেন। ১৯২৮ সালে হিলবার্টের বক্তৃতায় মুগ্ধ হয়ে গোডেল তার পিএইচডি গবেষণার জন্য এই বিষয়টি বেছে নেন।

অসম্পূর্ণতা উপপাদ্য

১৯৩১ সালে গোডেল 'উবার ফরমাল উনএন্টশেইডবারা স্যাটজে ডের প্রিন্সিপিয়া ম্যাথেমেটিকা উন্ড ভেরওয়ান্দ্টার সিস্টেম' শিরোনামে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন, যা গণিতের চেহারা চিরকালের জন্য বদলে দেয়। তিনি প্রমাণ করেন, হিলবার্টের স্বপ্ন একটি মরীচিকা মাত্র। তার প্রথম অসম্পূর্ণতা উপপাদ্য অনুযায়ী, কোনো ধারাবাহিক গাণিতিক সিস্টেম সম্পূর্ণ হতে পারে না; অর্থাৎ, এমন কিছু সত্য বাক্য থাকবেই যা সেই সিস্টেমের ভেতর থেকে প্রমাণ করা অসম্ভব। দ্বিতীয় উপপাদ্য বলে, কোনো সিস্টেম তার নিজের ধারাবাহিকতা নিজে প্রমাণ করতে পারে না।

গোডেল 'গোডেল নাম্বারিং' নামে একটি পদ্ধতি ব্যবহার করে প্রতিটি গাণিতিক প্রতীক ও সমীকরণকে মৌলিক সংখ্যার কোডে রূপান্তরিত করেন। তারপর তিনি লায়ার প্যারাডক্সের গাণিতিক রূপ দিয়ে এমন একটি সমীকরণ তৈরি করেন, যার অর্থ: 'এই বিবৃতিটি প্রমাণ করা অসম্ভব।' যদি সমীকরণটি প্রমাণ করা যায়, তবে তা ভুল; আর যদি প্রমাণ করা না যায়, তবে তা সত্য। এই কাজ হিলবার্ট ও বিশ্বের অন্যান্য গণিতবিদদের স্তব্ধ করে দেয়। জন ফন নিউম্যান বলেছিলেন, 'গোডেলের অর্জন একক এবং স্মৃতিস্তম্ভের মতো অটল।'

ব্যক্তিগত জীবন ও যুদ্ধকালীন সময়

১৯৩৩ সালে গোডেল প্রথমবার যুক্তরাষ্ট্রে যান এবং আলবার্ট আইনস্টাইনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। একই বছর জার্মানিতে হিটলার ক্ষমতায় আসে এবং অস্ট্রিয়ায় নাৎসিদের প্রভাব বাড়তে থাকে। ১৯৩৬ সালে ভিয়েনা সার্কেলের প্রধান মরিৎজ শ্লিককে তার এক প্রাক্তন ছাত্র হত্যা করে। এই ঘটনা গোডেলের মানসিক অবস্থার ওপর ভয়াবহ প্রভাব ফেলে; তিনি নার্ভাস ব্রেকডাউনের শিকার হন এবং কয়েক মাস মানসিক হাসপাতালে কাটান। তার ছোটবেলার হাইপোকনড্রিয়া চরম সন্দেহবাতিকতায় রূপ নেয়; তিনি ভাবতে শুরু করেন কেউ খাবারে বিষ মিশিয়ে তাকে হত্যা করবে।

এদিকে তার জীবনে প্রেম আসে অ্যাডেল পোর্কার্টের রূপে। পরিবারের আপত্তি সত্ত্বেও ১৯৩৮ সালে তাদের বিয়ে হয়। একই বছর নাৎসি জার্মানি অস্ট্রিয়া দখল করে। গোডেলের চাকরির আবেদন বাতিল হয় ভিয়েনা সার্কেলের ইহুদি সদস্যদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে তিনি জোর করে জার্মান সেনাবাহিনীতে ভর্তির ভয়ে অ্যাডেলকে নিয়ে ভিয়েনা ছেড়ে ট্রান্স-সাইবেরিয়ান রেলওয়ে ধরে রাশিয়া পাড়ি দিয়ে জাপান হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকো পৌঁছান। পরে তারা নিউ জার্সির প্রিন্সটনে চলে যান, যেখানে গোডেল ইনস্টিটিউট ফর অ্যাডভান্সড স্টাডিতে যোগ দেন।

প্রিন্সটন ও আইনস্টাইনের সঙ্গে বন্ধুত্ব

প্রিন্সটনে এসে গোডেলের সঙ্গে আলবার্ট আইনস্টাইনের গভীর বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। চরিত্রে বিপরীত হলেও মেধার উচ্চতা তাদের এক সুতোয় বেঁধেছিল। আইনস্টাইন বলেছিলেন, 'আমি এখন আর নিজের কাজের জন্য ইনস্টিটিউটে আসি না; বিকেলে গোডেলের সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে যেন বাড়ি ফিরতে পারি, তাই আসি।' প্রতিদিন তারা একসঙ্গে হেঁটে বাড়ি ফিরতেন এবং পদার্থবিজ্ঞান, দর্শন ও রাজনীতি নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তর্ক করতেন।

১৯৪৭ সালে গোডেল মার্কিন নাগরিকত্বের পরীক্ষা দিতে যান, সাক্ষী হিসেবে ছিলেন আইনস্টাইন ও অস্কার মরগেনস্টার্ন। পরীক্ষার প্রস্তুতির সময় গোডেল মার্কিন সংবিধানে একটি যৌক্তিক অসংগতি খুঁজে পান, যা ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রকে স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত করা সম্ভব। পরীক্ষার দিন বিচারক ফিলিপ ফোরম্যান যখন বলেন, 'আমাদের দেশে এমনটা হওয়ার কোনো সুযোগ নেই,' তখন গোডেল উত্তেজিত হয়ে বলেন, 'অবশ্যই সুযোগ আছে!' আইনস্টাইন ও মরগেনস্টার্ন তাড়াতাড়ি তাকে থামিয়ে দেন এবং বিচারক পরিস্থিতি বুঝে হেসে কথা ঘুরিয়ে দেন। গোডেল সফলভাবে নাগরিকত্ব পান।

পদার্থবিজ্ঞানে অবদান

গোডেল শুধু গণিত নয়, পদার্থবিজ্ঞানেও অসাধারণ অবদান রাখেন। ১৯৪৯ সালে আইনস্টাইনের ৭০তম জন্মদিনে তিনি আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্বের একটি নতুন সমাধান উপহার দেন, যা 'গোডেল ইউনিভার্স' নামে পরিচিত। তিনি গাণিতিকভাবে দেখান, মহাবিশ্ব যদি নিজের অক্ষের ওপর লাটিমের মতো ঘোরে, তবে স্থান-কালের বুনন এমনভাবে বেঁকে যাবে যে ক্লোজড টাইমলাইক কার্ভ তৈরি হবে, অর্থাৎ সময় ভ্রমণ সম্ভব হবে। যদিও এটি একটি তাত্ত্বিক মডেল, তবুও এটি পদার্থবিজ্ঞানীদের চিন্তার জগৎকে নাড়িয়ে দেয়। এর জন্য ১৯৫১ সালে গোডেল ও জুলিয়ান শুইঙ্গারকে প্রথম আলবার্ট আইনস্টাইন অ্যাওয়ার্ড দেওয়া হয়।

শেষ জীবন ও মৃত্যু

জীবনের শেষ দিকে গোডেল দর্শনের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়েন। তিনি গটফ্রিড লিবনিজের লেখার ভক্ত ছিলেন এবং যুক্তিবিদ্যার সাহায্যে ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রমাণের জন্য একটি তত্ত্ব দাঁড় করিয়েছিলেন। বয়স বাড়ার সঙ্গে তার মানসিক রোগ ও প্যারানয়া ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। তিনি বিশ্বাস করতেন রেফ্রিজারেটর বিষাক্ত গ্যাস ছড়ায় এবং শীতকালেও জানালা খুলে রাখতেন। সবচেয়ে মর্মান্তিক ছিল তার খাদ্যাভ্যাস; তিনি শুধু স্ত্রী অ্যাডেলের রান্না করা খাবার খেতেন এবং তাকেও আগে খেতে দেখতে চাইতেন।

১৯৭৭ সালের শেষ দিকে অ্যাডেল ব্রেন স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলে গোডেলের খাওয়া-দাওয়া প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। কয়েক মাস পর অ্যাডেল বাড়ি ফিরে দেখেন গোডেলের ওজন মাত্র ৩০ কেজিতে নেমে এসেছে। তিনি তাকে হাসপাতালে নিয়ে যান, কিন্তু তত দিনে অনেক দেরি। ১৯৭৮ সালের ১৪ জানুয়ারি প্রিন্সটনের হাসপাতালে গোডেলের মৃত্যু হয়। ডেথ সার্টিফিকেটে মৃত্যুর কারণ লেখা হয়: 'পার্সোনালিটি ডিস্টার্বেন্সের কারণে অপুষ্টি ও অনাহার।' মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় যৌক্তিক মস্তিষ্কটি চরম অযৌক্তিক এক ভয়ের কাছে হার মানল।

উত্তরাধিকার

কুর্ট গোডেলের অসম্পূর্ণতা উপপাদ্য বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ বৌদ্ধিক অর্জন। তিনি গণিত, দর্শন, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও ভাষাতত্ত্বকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছেন। অ্যালান টুরিং কম্পিউটারের ধারণা নিয়ে কাজ করার সময় গোডেলের কাজ দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। ১৯৭৯ সালে ডগলাস হফস্টাটার 'গোডেল, এশার, বাখ: অ্যান ইটারনাল গোল্ডেন ব্রেইড' বইয়ে গোডেলের গণিত, এশারের চিত্রশিল্প ও বাখের সংগীতের মধ্যে অপূর্ব সমান্তরাল দেখান, যা পুলিৎজার পুরস্কার জেতে।

গোডেল প্রমাণ করেছিলেন, মানুষের তৈরি কোনো লজিক্যাল সিস্টেমই সব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে না। অজানাকে জানার আকাঙ্ক্ষা কখনো শেষ হবে না। গণিতের জগতে কিছু রহস্য চিরকাল রহস্য থেকে যাবে। সেই বিষণ্ণ জাদুকর কুর্ট গোডেল বিজ্ঞান ও দর্শনের আকাশে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে বেঁচে থাকবেন।