চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজু-বিষু উৎসবে ছুটির দাবিতে স্মারকলিপি
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর প্রধান সামাজিক উৎসব বিজু, বিষু, বৈসু, বিহু, সাংগ্রাই, চাংক্রান ও সাংক্রান উপলক্ষে ১২ থেকে ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত পাঁচ দিনের ছুটির দাবি জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পাহাড়ি শিক্ষার্থীরা। বুধবার সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মোহাম্মদ আল-ফোরকানের কাছে একটি স্মারকলিপি জমা দেন তারা।
শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিদল ও দাবির পটভূমি
পাহাড়ি শিক্ষার্থীদের একটি প্রতিনিধিদল সকাল নয়টায় উপাচার্যের কার্যালয়ে এই স্মারকলিপি হস্তান্তর করে। প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের (জেএসএস-সমর্থিত) সাধারণ সম্পাদক রিবেক চাকমা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী জাল্লাং এনরিকো কুবি।
স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বর্তমানে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন ভাষাভাষী ১৪টি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর প্রায় ৭০০ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন। প্রতিবছর ১২ থেকে ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত এসব জনগোষ্ঠীর প্রধান সামাজিক উৎসবগুলো উদযাপিত হয়। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ক্যালেন্ডারে এ সময়ে কোনো ছুটি না থাকায় শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ সম্প্রদায়ের গুরুত্বপূর্ণ এই উৎসব উদযাপন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
বৈষম্যের অভিযোগ ও সাংবিধানিক দাবি
স্মারকলিপিতে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশ সংবিধানের ২৮(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ধর্ম, বর্ণ, গোষ্ঠী বা জন্মস্থানের ভিত্তিতে বৈষম্য করা নিষিদ্ধ। অথচ বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে ১৪ এপ্রিল সাধারণ ছুটি থাকলেও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর উৎসবগুলো ছুটির আওতায় আনা হয়নি, যা বৈষম্যমূলক বলে মনে করছেন শিক্ষার্থীরা।
এছাড়া শিক্ষার্থীরা উল্লেখ করেন, অতীতেও বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠন এসব উৎসব উপলক্ষে সরকারি ছুটি ঘোষণা ও পরীক্ষার সময়সূচি পরিবর্তনের দাবি জানিয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের এসএসসি পরীক্ষার রুটিনেও সংশোধন আনা হয়। সংশ্লিষ্ট দিনগুলোর পরীক্ষা পেছানো হয়। একই বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় উৎসবকালীন সময়ে ছুটি ও পরীক্ষা স্থগিতের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগ ও চট্টগ্রামের অবস্থান
সর্বশেষ ২০২৬ সালের ৯ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ১২ থেকে ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত সব বিভাগের পরীক্ষা স্থগিতের ঘোষণা দেয়। তবে দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হলেও তুলনামূলক বেশি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর শিক্ষার্থী থাকা সত্ত্বেও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলে স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়।
শিক্ষার্থীদের প্রধান দুটি দাবি
স্মারকলিপিতে শিক্ষার্থীরা দুটি দাবি উত্থাপন করেন। প্রথমত, ১২ থেকে ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত পাঁচ দিন ছুটি ঘোষণা করে তা একাডেমিক ক্যালেন্ডারে অন্তর্ভুক্ত করা এবং দ্বিতীয়ত, এ সময়ে নির্ধারিত সব পরীক্ষা স্থগিত করে সংশোধিত রুটিন প্রকাশ করা। শিক্ষার্থীরা আশা প্রকাশ করেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাঁদের দাবির বিষয়ে দ্রুত ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেবে।
শিক্ষার্থী ও উপাচার্যের প্রতিক্রিয়া
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী জাল্লাং এনরিকো কুবি বলেন, 'সবারই নিজের সংস্কৃতি অনুযায়ী একটা ছুটি প্রয়োজন। যেমন কয়েক দিন আগে ঈদ গিয়েছে, তখন ছুটি ছিল। সে রকমভাবে অন্যান্য ধর্মীয় উৎসবে সরকারি ছুটি থাকলেও আমাদের উৎসবের সময় ছুটি রাখা হয়নি।'
এ প্রসঙ্গে উপাচার্য মোহাম্মদ আল-ফোরকান বলেন, 'আমি স্মারকলিপি ইতিমধ্যে রেজিস্ট্রারসহ সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরে পৌঁছে দিয়েছি। একাডেমিকসহ সামগ্রিক বিষয় বিবেচনা করে সবার মতামত নিয়ে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।'
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পাহাড়ি শিক্ষার্থীদের এই দাবি সাম্প্রতিক সময়ে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা নীতির আলোচনাকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্ত এই অঞ্চলের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক হতে পারে।



