পদ্মায় বাসডুবি: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আহনাফের মরদেহ উদ্ধার, শোক ও ক্ষোভ
রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ঘাটে পদ্মা নদীতে যাত্রীবাহী বাসডুবির মর্মান্তিক ঘটনায় নিখোঁজ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আহনাফ তাহমিদ খানের (আহনাফ রায়হান) মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। ফেসবুকে ইয়াসির আরাফাত নামের এক সাবেক শিক্ষার্থী লিখেছেন, ‘আমাদের রায়হানকে পাওয়া গিয়েছে—নিথর ও প্রাণহীন।’ এই দুর্ঘটনায় আহনাফের পরিবারের একাধিক সদস্য নিহত হয়েছেন, যা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ও বর্তমান শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা শোক প্রকাশের পাশাপাশি ক্ষোভ ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন।
আহনাফের পরিচয় ও পরিবারের দুর্ভাগ্য
আহনাফ তাহমিদ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের ৪৯তম আবর্তনের শিক্ষার্থী ছিলেন। তিনি রাজবাড়ী পৌরসভার লালমিয়া সড়ক ভবানীপুর এলাকার বাসিন্দা। দুর্ঘটনায় তাঁর মা রেহেনা আক্তার ও শিশু ভাগনে তাজবিদ বিন মোসাব্বির নিহত হয়েছেন। আহনাফের বড় বোন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন, যা পরিবারের জন্য এক ভয়াবহ মর্মান্তিক পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের শোক ও প্রতিক্রিয়া
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্নালিজম ও মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান মৃধা মো. শিবলী নোমান আহনাফকে উদ্দেশ্য করে লিখেছেন, ‘শান্তি ও শক্তিতে বিরাজ করো। আর কীই–বা বলতে পারি! কী এক অসহায়ত্বের মাঝে আমাদের বসবাস!’ একই বিভাগের ৫০তম আবর্তনের শিক্ষার্থী শাহরিয়ার মুন্না বলেন, ‘জীবনে এমন দুর্ঘটনা কারও পরিবারের সঙ্গে না ঘটুক। আহনাফ রায়হান ভাইকে রাজবাড়ী সদর হাসপাতালে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে। তিনি, তাঁর মা ও ভাগনেসহ তিনজন মারা গেছেন। আপু (বড় বোন) হাসপাতালে ভর্তি।’
ক্ষোভ ও কাঠামোগত সমালোচনা
৪৩তম আবর্তনের সাবেক শিক্ষার্থী শহিদুল ইসলাম দুর্ঘটনায় এমন মৃত্যুতে ক্ষোভ জানিয়ে বলেন, ‘বাইরের দেশে গোলাবারুদ, মিসাইলে মারা যাচ্ছে। আর আমরা যুদ্ধ ব্যতীতই সিস্টেমের মিসাইলে মারা যাচ্ছি ক্রমাগত।’ সাবেক শিক্ষার্থী ও এনসিপি নেতা ফয়সাল মাহমুদ প্রতিবাদ জানিয়ে নিজের টাইমলাইনে লেখেন, ‘একটা পরিবার ভেঙেচুরে তছনছ হয়ে যাওয়া বলতে যা বোঝায়, তার থেকেও শতগুণ হয়েছে এই পরিবারের। এই তিনজনের লাশ আর একজনের আহত শরীরের জন্য মোট রাষ্ট্রীয় বরাদ্দ এক লাখ টাকা থেকেও কম। রাষ্ট্রকে আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ, নিহত-আহতদের পরিবারের পাশে এভাবে উপহাস করে দাঁড়ানোর জন্য!’
ব্যক্তিগত স্মৃতি ও শোক
বায়োটেকলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ৪৯তম আবর্তনের শিক্ষার্থী মির্জা সাকি প্রিয় বন্ধুকে হারিয়ে সংশয় প্রকাশ করে বলেন, ‘রাইয়ান নাই—দুইটা শব্দ আমি পাশাপাশি লিখতে পারতেছি না। ব্যাকস্পেস দিয়েই যাচ্ছি। বন্ধুর নামের পাশে “ছিল” কথাটা কেউ ক্যাম্নে লেখে? এই দৌলতদিয়া ফেরিঘাট হয়েই তো আমরা রাইয়ানের বাসায় গেছিলাম।’ নৃবিজ্ঞান বিভাগের ৫০তম আবর্তনের শিক্ষার্থী আল-বেরুনি রাজন স্মৃতিচারণা করে লিখেছেন, ‘ফ্যাকাল্টি থেকে ক্লাব, ক্লাব থেকে জেলা সমিতি—সব জায়গায় এত স্মৃতি। কীভাবে সবকিছু ফেস করব, জানি না আমি।’
দুর্ঘটনার বিবরণ ও পরিসংখ্যান
গতকাল বুধবার বিকেল সোয়া পাঁচটার দিকে দৌলতদিয়া ঘাটে পদ্মা নদী পাড়ি দিতে অপেক্ষমাণ ঢাকাগামী যাত্রীবাহী বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পন্টুন থেকে পদ্মা নদীতে পড়ে যায়। আজ বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা পর্যন্ত মোট ২৪ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে ২১ জনের মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে, যা এই দুর্ঘটনার ভয়াবহতা আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
কাঠামোগত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক আনু মোহাম্মদ এই দুর্ঘটনাকে কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড আখ্যা দিয়ে নিজের ফেসবুক টাইমলাইনে লেখেন, ‘এগুলো নিছক দুর্ঘটনা নয়, যেসব কারণে বছরের পর বছর আমাদের প্রিয়জন হারাতে হয়, বহুজন আজীবন অসহনীয় জীবন যাপন করেন সেসব কারণ জানা এবং সমাধানযোগ্য। কিন্তু এ দেশে আমরা এখন পর্যন্ত এমন কোনো দায়িত্বশীল সরকার পাইনি, যারা এগুলোর কাঠামোগত সমাধানের উদ্যোগ নিয়েছে।’ এই মন্তব্য দুর্ঘটনার গভীরতর কারণ ও সমাধানের অভাবের দিকে ইঙ্গিত করে।



