২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে অধ্যাপক জ্যোতির্ময় গুহ ঠাকুরতার নির্মম হত্যা
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে ঢাকায় পাকিস্তানি সৈন্যরা যে তাণ্ডব চালিয়েছিল, তা ইতিহাসে গণহত্যার এক অনন্য নজির স্থাপন করে। এই কালরাতে দেশের অসংখ্য গুণী ব্যক্তি, শিক্ষক ও বুদ্ধিজীবীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে পাকহানাদার বাহিনী। তাদের মধ্যে একজন ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক জ্যোতির্ময় গুহ ঠাকুরতা। সেদিন রাতে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে নির্মমভাবে হত্যার শিকার হন তিনি। সেদিনের ভয়াবহতার কিছু স্মৃতি বাংলা ট্রিবিউনের কাছে তুলে ধরেছেন তার একমাত্র মেয়ে অধ্যাপক মেঘনা গুহ ঠাকুরতা।
বর্বরোচিত গণহত্যার সূচনা
২৫ শে মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী অপারেশন সার্চলাইট নামে বর্বরোচিত গণহত্যা শুরু করে, যা মাধ্যমে ঢাকা শহরসহ সারা দেশে হাজার হাজার নিরপরাধ বাঙালি, শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও পুলিশকে নির্মমভাবে হত্যা করে। এই ভয়াবহ রাতের মূল লক্ষ্য ছিল বাঙালিদের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা অঙ্কুরেই বিনাশ করা, যার ফলে শুরু হয় দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ।
এই দিন রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজারবাগ পুলিশ লাইন এবং পিলখানায় ইপিআরের ওপর অতর্কিতে হামলা চালায়। জগন্নাথ হল, ইকবাল হল (বর্তমান সার্জেন্ট জহুরুল হক হল)-সহ বিভিন্ন স্থানে ছাত্রদের সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে গুলি করা হয়। শিক্ষকদের হত্যা করা হয়। এই হামলায় কেবল ঢাকাতেই হাজার হাজার সাধারণ মানুষ নিহত হন। টেলিফোন, টেলিগ্রাম, রেডিও স্টেশন বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং সারা দেশ থেকে ঢাকাকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়।
অধ্যাপক জ্যোতির্ময় গুহ ঠাকুরতার অবস্থান
১৯৭১ সালের মার্চ মাসের শেষ দিনগুলোতে যেকোনও সময় হামলার আশঙ্কা ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক জ্যোতির্ময় গুহ ঠাকুরতাও নিজের পরিচিতজন, বিশেষ করে ছাত্রদের নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যেতে বলেছিলেন। তাঁকেও অনেকে বলেছিল নিরাপদে চলে যেতে। ২৫ মার্চ রাতে ঢাকা শহরে পাকিস্তান বাহিনী তাদের নৃশংস হামলার মূল লক্ষ্যকেন্দ্র যেসব জায়গা করেছিল, তার একটি ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল। আর অধ্যাপক জ্যোতির্ময় ছিলেন এই হলের প্রাধ্যক্ষ। সেই কাল রাতের বর্ণনা দিয়েছেন তার স্ত্রী বাসন্তী গুহ ঠাকুরতা, নিজের লেখা ‘একাত্তরের স্মৃতি’ বইয়ে।
৩৪ নম্বর ভবনে হামলা
অধ্যাপক জ্যোতির্ময় থাকতেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার আবাসিক এলাকায় ৩৪ নম্বর ভবনের নিচতলায়। ২৫ মার্চ দিবাগত রাত দুইটার দিকে রান্নাঘরের দরজা ভেঙে ঢুকে পড়ে পাকিস্তানি সেনারা। অধ্যাপক মেঘনা গুহ ঠাকুরতা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, "আমরা থাকতাম জগন্নাথ হলের পূর্ব পাশে কোয়ার্টারে। তখন অসহযোগ আন্দোলন ছিল। ৭ মার্চ শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে সবাই অসহযোগ পালন করছিল। আমরা এমনিতে ভয়ে ছিলাম, হয়তো আসবে, অ্যারেস্ট করবে। কিন্তু আসলে ২৫ মার্চ রাত ১১টার দিকে এক বহর আর্মি জিপ এসে পৌঁছায় আমাদের বাসায়। তারপরে আমাদের এখানে ছয়টা ফ্ল্যাট ছিল, ছয়টা ফ্ল্যাটেই হানা দেয়। আমরা পেছনের ফ্ল্যাটের একতলায় ছিলাম বলে পেছনের দরজা দিয়ে এসেছে তিন জন সৈনিক। তারা একজন অফিসার, দুজন সৈনিক, পাকিস্তান আর্মির পোশাক পরা। তারা বললো, বাবাকে নিয়ে যাবে, উর্দুতে জিজ্ঞেস করলো ‘প্রফেসর সাব এখানে আছে কিনা’, থাকলে নিয়ে যাবে। তো মা জিজ্ঞেস করেছিল, কোথায় নিয়ে যাবে। জায়গা তো বলেনি। মা পরে বাবাকে একটা পাঞ্জাবি দিলো, পোশাক পরিয়ে দিলো, নিয়ে গেলো পেছনের দরজা দিয়ে।"
তিনি আরও বলেন, "পরে আর্মিরা যখন আবার ফিরে এসেছিল সার্চ করতে, আর কোনও ছেলে আছে কিনা, তারপরে এসে আমাদের তিনতলায় শিক্ষক মনিরুজ্জামান ছিলেন, উনিও দরজা খুলেছিলেন। ওনাকেও নিয়ে এসেছে, তাঁর সঙ্গে সঙ্গে তিনজন ছেলে ছিল, নিজের একজন ছেলে, আর দুজন পারিবারিক আত্মীয় ছিল। ওরা ওদের সবাইকে টানাহেঁচড়া করে নামিয়েছে। আমরা ভেবেছি অ্যারেস্ট করেছে। কিন্তু ইতোমধ্যে ওরা গুলি ছুড়ে মনিরুজ্জামান এবং তিন ছেলেকে মেরে ফেললো।"
হত্যার মর্মান্তিক বিবরণ
অধ্যাপক মেঘনা বলেন, "তখন ওনার স্ত্রী এসে আমার মাকে বললো, ‘দিদি, আপনার হাজবেন্ডকেও হয়তো মেরেছে! আমরা তো জানতাম না, আমরা তাড়াতাড়ি সামনে গিয়ে দেখি, বাবা গুলি খেয়েছে দুই জায়গায় এবং বাবা তখনও সচেতন ছিল। বলছিল, আমাকে নাম জিজ্ঞেস করেছে, আমার ধর্ম জিজ্ঞেস করেছে, তারপরে গুলি করেছে। বাবাকে নিয়ে আমরা তখন হসপিটালে দিয়ে যেতে পারি নাই, ঘরে ঢুকিয়েছি, কারফিউ ছিল। এ রকম করে ২৫ মার্চ সারা রাত ২৬ মার্চে সারা দিন সারা রাত কেটেছে। তারপরে ২৭ মার্চ কারফিউ ভেঙেছিল, তখন ঢাকা মেডিক্যালে নিয়ে যাই। মেডিক্যালে নেওয়ার পর ডাক্তাররা বলেন, ওনাকে বাঁচানো যাবে না। উনি খুব ক্রিটিক্যালি ইনজুরড। এরপর ৩০ মার্চ বাবা শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।"
সেদিনের ভয়াবহ পরিবেশ
সেদিন কেমন পরিবেশ ছিল জানতে চাইলে তিনি বলেন, "আমরা তো বাসা থেকে বেরিয়ে মেডিক্যালে গিয়েছিলাম। মেডিক্যালে সমানে লাশ নিয়ে আসছে। তারপরে অনেক আহত লোক নিয়ে আসছে। রক্তে ভরা। মেডিক্যাল একদম রক্তের গন্ধে ছাপিয়ে গেছে। মানে এত লোক ভর্তি হয়েছে যে করিডরেও জায়গা পাচ্ছিল না। করিডরে বেড দিয়েও জায়গা ছিল না, মাটিতেও ছিল না। আমার বাবাকেও প্রথমে মাটিতেই রেখেছিল। পরে বললো, উনি তো আমাদের স্যার, তখন একটা বেড দিয়েছিল। রাস্তাঘাটে এরকম সবাই অ্যাম্বুলেন্স ও রিকশায় করে নিয়ে লাশ নিয়ে আসছে। আর সবাই চারদিকে ছুটে বেড়াচ্ছে।"
এই স্মৃতিচারণা ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের গণহত্যার নির্মমতা ও বর্বরতার একটি জীবন্ত দলিল হিসেবে রয়ে গেছে, যা নতুন প্রজন্মকে ইতিহাসের সত্যতা বুঝতে সাহায্য করে।



