রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এক গবেষকের নিঃস্বার্থ প্রাণী সেবার কাহিনী
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে এখন ঈদের টানা ছুটির কারণে নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে। ক্লাস নেই, হলগুলোতে শিক্ষার্থীদের কোলাহল নেই। এই নীরব পরিবেশে হাতে খাবারের থলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন মো. সালাহউদ্দীন মামুন (নীল)। তাঁর চারপাশে জড়ো হয়েছে একদল ক্ষুধার্ত কুকুর ও বিড়াল। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের গবেষণাগারে চাকরি করেন তিনি, কিন্তু তাঁর আসল পরিচয় একজন নিঃস্বার্থ প্রাণীপ্রেমিক হিসেবে।
একটি ঘটনা থেকে শুরু হওয়া পথচলা
প্রায় আট বছর আগে, কাটাখালী পৌরসভার দেওয়ানপাড়ায় একটি মা কুকুরের মৃতদেহের পাশে চারটি শাবককে দুধ খেতে দেখে সালাহউদ্দীন মামুনের হৃদয় স্পর্শিত হয়। তিনি বলেন, ‘ওই দৃশ্যটা আমি সহ্য করতে পারিনি। মনে হয়েছিল, এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে একটা পরীক্ষা।’ সেদিনই তিনি লাশটি মাটিচাপা দেন এবং শাবকগুলোকে বাসায় নিয়ে লালন-পালন শুরু করেন। সেই ঘটনা থেকেই তাঁর এই মানবিক যাত্রার সূচনা।
বর্তমানে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ৬ মার্চ থেকে শুরু হওয়া ঈদের ছুটিতে সালাহউদ্দীন প্রতিদিন দুই শতাধিক অভুক্ত কুকুর ও বিড়ালকে খাবার দিচ্ছেন। এক দিন পরপর তিনি প্রায় ২৫ কেজি খাবার রান্না করেন, যার মধ্যে ১৫ কেজি কুকুরের জন্য (চাল ও মুরগির অংশ) এবং ১০ কেজি বিড়ালের জন্য (চাল ও মাছ)। বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৭টি হলের গার্ডদের মাধ্যমে বিড়ালের খাবার পৌঁছে দেওয়া হয়, আর নিজে ঘুরে ঘুরে ২০–২৫টি স্পটে কুকুরদের খাবার বিতরণ করেন তিনি।
প্রাণীদের জন্য নিবেদিত জীবন
সালাহউদ্দীন মামুন শুধু খাবারই দেন না, আহত ও অসুস্থ প্রাণীদের প্রাথমিক চিকিৎসাও প্রদান করেন। যদিও তিনি ভেটেরিনারি চিকিৎসক নন, তবুও পাউডার, ভায়োডিন ইত্যাদি ব্যবহার করে প্রাথমিক সেবা দেন এবং প্রয়োজনে ক্লিনিকে নিয়ে যান। তাঁর বাসায় বর্তমানে তিনটি চিল পাখি চিকিৎসাধীন রয়েছে, এবং তিনি দোয়েল, মাছরাঙা, বকসহ বিভিন্ন পাখিকেও সুস্থ করে প্রকৃতিতে ফিরিয়ে দেন।
বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকলে তাঁর কাজ আরও বেড়ে যায়, কারণ তখন হোটেল-রেস্টুরেন্ট বন্ধ থাকায় প্রাণীগুলো খাবার পায় না। রান্না থেকে শুরু করে আহত প্রাণীর চিকিৎসা—সবই হয় তাঁর বাড়িতে। বাড়ির ছাদে তিনি একটি ছোট পাখির রেসকিউ সেন্টার গড়ে তুলেছেন। প্রথম দিকে পরিবারের সদস্যরা আপত্তি করলেও এখন তাঁরাই বড় সহায় হয়ে দাঁড়িয়েছেন। তাঁর ছোট ভাই খাবার রান্না ও বিতরণে সাহায্য করেন, এবং স্ত্রী, মা ও শাশুড়িও রান্নার কাজে হাত লাগান।
আর্থিক সংগ্রাম ও স্বপ্ন
এই কাজের জন্য শুরুতে সালাহউদ্দীন কারও কাছে সাহায্য চাননি। তিনি একটি সাদা ইঁদুরের খামার চালান, যেখান থেকে গবেষণার জন্য বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে সরবরাহ করা হয়। সেই আয়কে তিন ভাগে ভাগ করেন—এক ভাগ নিজের জন্য, এক ভাগ খামারের জন্য, এবং আরেক ভাগ প্রাণীদের জন্য। তবে সম্প্রতি প্রথমবারের মতো তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ১৫ জন মানুষের সহযোগিতা চেয়ে পোস্ট দেন, কিন্তু সাড়া দিয়েছেন মাত্র তিনজন।
নারী শিক্ষার্থীদের আবাসিক মুন্নুজান হলের নিরাপত্তা প্রহরী আবদুর রাজ্জাক বলেন, ‘লম্বা ছুটিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের কুকুর–বিড়ালগুলো বেশি বিপদে পড়ে। এবার তো আবাসিক হলও বন্ধ। এ সময়ে সালাহউদ্দীন নিয়ম করে খাবার দিয়ে যান, যা প্রাণীগুলোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’ শাহ মখদুম হলের নিরাপত্তা প্রহরী মো. আবদুল মালেকও এই উদ্যোগের প্রশংসা করে বলেন, ‘এটা না করলে তো অনেক জীবজন্তু মরে যেত।’
সালাহউদ্দীন মামুনের সবচেয়ে বড় আক্ষেপ হলো, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় তো দূরের কথা, পুরো শহরেই কোনো প্রাণী আশ্রয়কেন্দ্র নেই। তিনি বলেন, ‘একটা আহত পাখি বা প্রাণীকে কোথাও রেখে চিকিৎসা দেওয়ার জায়গা নেই। তাই বাসায় নিয়ে আসতে হয়।’ তাঁর স্বপ্ন শুধু বিশ্ববিদ্যালয় নয়, পুরো রাজশাহী শহরের জন্য একটি শেল্টার হোম গড়ে তোলা। প্রাণীদের প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এই পৃথিবী সবার। মানুষ মানুষের পাশে থাকুক, মানুষ প্রাণীর পাশেও থাকুক। তাহলেই একটা শান্তির পৃথিবী হবে।’
খাবার দেওয়া শেষে বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন বিনোদপুর গেটের কাছে ১০-১৫টি কুকুরকে খাবার দিতে গিয়ে রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের মতিহার জোনের অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ মহিবুল ইসলাম এই কাজের প্রশংসা করে সালাহউদ্দীনকে উৎসাহ দেন। সালাহউদ্দীন মামুনের এই নিঃস্বার্থ সেবা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, যা সমাজে প্রাণী কল্যাণের বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছে।



