বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষায় রন্ধন শিক্ষার অন্তর্ভুক্তি: একটি প্রয়োজনীয় পরিবর্তন
বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রিকে এখনো সফলতার প্রধান চাবিকাঠি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। শিক্ষার্থীরা বছরের পর বছর তাত্ত্বিক জ্ঞান মুখস্থ করেন, পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন এবং প্রতিযোগিতামূলক কর্মজীবনের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো—অনেক স্নাতকই জীবনের একটি মৌলিক দক্ষতা ছাড়াই বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পাড়ি দেয়। তা হলো— খাদ্যকে বুঝতে পারা, তা প্রস্তুত করা এবং নতুনভাবে উপস্থাপন করার ক্ষমতা।
শহুরে পরিবেশের পরিবর্তন ও খাদ্য খাতের বিকাশ
ঢাকাসহ দেশের বড় শহরগুলো দ্রুত বদলে যাচ্ছে। ঢাকার মতো অন্যান্য শহরেও খাদ্য-পরিবেশের দ্রুত বিকাশ ঘটছে। আমাদের চারপাশে বুটিক ক্যাফে, আর্টিজানাল বেকারি, ক্লাউড কিচেন এবং ফাইন ডাইনিং রেস্তোরার সংখ্যা বাড়ছে। আতিথেয়তা ও কুলিনারি খাত এখন আর কোনো প্রান্তিক শিল্প নয়; এটি এখন কর্মসংস্থান ও ব্যবসায় উদ্যোগ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবুও আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষাব্যবস্থা এই বাস্তবতাকে এখনো গুরুত্ব সহকারে গ্রহণ করেনি।
রন্ধন শিক্ষার ভুল ধারণা ও প্রকৃত তাৎপর্য
রন্ধন-সম্পর্কীয় (কুলিনারি) শিক্ষা মানেই কেবল শেফ হওয়ার প্রশিক্ষণ—এই ধারণা ভুল। এটি মূলত খাদ্য-সচেতনতা ও ব্যাবহারিক দক্ষতার বিষয়। অনেক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী পুষ্টি, খাদ্যনিরাপত্তা বা সঠিক খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা ছাড়াই প্রক্রিয়াজাত খাবারের ওপর নির্ভরশীল। একটি প্রাথমিক কুলিনারি কোর্স শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, আত্মনির্ভরতা এবং পরিবেশবান্ধব ভোগ-ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে নিতে পারে।
রান্না শুধু গৃহস্থালির কাজ নয়; এটি শৃঙ্খলা, সময়-ব্যবস্থাপনা, সৃজনশীলতা ও সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা বাড়ায়।এই দক্ষতাগুলো কর্মক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন শিক্ষার্থী তৈরি করা, যারা কেবল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ নয়, বাস্তব জীবনেও দক্ষ হয়ে উঠবে। কুলিনারি শিক্ষাকে এই বৃহত্তর লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে।
অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও কর্মসংস্থানের চ্যালেঞ্জ
অর্থনৈতিক বাস্তবতাও আমাদের নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করছে। দেশে উচ্চশিক্ষিত গ্র্যাজুয়েটদের বেকারত্ব এবং যোগ্যতা অনুযায়ী কর্মসংস্থান না পাওয়ার সমস্যা ক্রমেই প্রকট হচ্ছে। অন্যদিকে আতিথেয়তা খাত ক্রমাগত সম্প্রসারিত হচ্ছে। প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁওসহ বিভিন্ন হোটেল ও রিসোর্টে দক্ষ জনবলের চাহিদা তারই প্ৰমাণ। তবুও এই খাতে প্রশিক্ষিত বহু বাংলাদেশি উন্নত বেতন ও পেশাগত সম্মানের আশায় বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন।
ফ্রান্স, ইতালি, মালয়েশিয়ার মতো দেশে কুলিনারি শিল্পকে মর্যাদাপূর্ণ পেশা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় এবং প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মাধ্যমে তা সমর্থিত।সেখানে দক্ষতাকে সম্মান করা হয় এবং উপযুক্ত পারিশ্রমিক প্রদান করা হয়। দেশে যখন সেই স্বীকৃতি ও কাঠামো দুর্বল থাকে, তখন মেধাপ্রবাহ বিদেশমুখী হওয়াই স্বাভাবিক। বিশ্ববিদ্যালয়ে কুলিনারি শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা হলে এই পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব। প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ পেশার মান বাড়াবে, দক্ষতার মর্যাদা বৃদ্ধি করবে এবং তরুণদের জন্য নতুন কর্মক্ষেত্র তৈরি করবে।
ব্যবসায়িক সম্ভাবনা ও সাংস্কৃতিক সংরক্ষণ
এটি শুধু শেফ তৈরির উদ্যোগ নয়; বরং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার একটি কৌশল। এ ছাড়া খাদ্যভিত্তিক ব্যবসায়গুলো তুলনামূলকভাবে কম মূলধনে উদ্যোক্তা তৈরি করতে পারে। সম্প্রতি অনেক তরুণ হোম-বেইজড বেকারি ও অনলাইন খাদ্য-ব্যবসায় শুরু করেছেন। সঠিক একাডেমিক জ্ঞান থাকলে এসব উদ্যোগ আরো টেকসই ও প্রতিযোগিতামূলক হতে পারে।
- এই জ্ঞানের মধ্যে রয়েছে কস্তিং, খাদ্যনিরাপত্তা, সাপ্লাই চেইন ব্যবস্থাপনা এবং খাদ্যের নান্দনিক উপস্থাপন।
- এসব দক্ষতা এই খাতকে আরো শক্তিশালী ও লাভজনক করে তুলতে পারে।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো—আমাদের নিজস্ব খাদ্য-ঐতিহ্য রয়েছে। আঞ্চলিক পিঠা, ঋতুভিত্তিক খাবার এবং ঐতিহ্যবাহী মিষ্টান্ন আমাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ। কিন্তু এগুলোর অনেক জ্ঞানই অনানুষ্ঠানিকভাবে প্রজন্মান্তরে প্রবাহিত হয় এবং ধীরে ধীরে হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা ও আধুনিকায়নের মাধ্যমে এই ঐতিহ্য সংরক্ষণ করতে পারে।
বাস্তবায়নের পথ ও সুপারিশ
সব বিশ্ববিদ্যালয়কে কলিনারি ইনস্টিটিউটে রূপান্তর করার প্রয়োজন নেই। ঐচ্ছিক কোর্স, মাইনর প্রোগ্রাম বা শিল্প খাতের সঙ্গে অংশীদারত্বের মাধ্যমেই এই উদ্যোগ শুরু করা যেতে পারে। এমনকি খাদ্যের পুষ্টিগুণ ও সঠিক ব্যবহার সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে প্রাথমিক জ্ঞান দেওয়ার কার্যক্রমও যদি চালু করা যায়, তবে সেটিও একটি বড় অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হবে।
- শিক্ষাকে পাঠ্যবই ও তাত্ত্বিক কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে ব্যাবহারিক দক্ষতা, সাংস্কৃতিক সচেতনতা এবং অর্থনৈতিক সম্ভাবনার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।
- আমরা এমন একটি জাতি, যেখানে খাদ্যকে কেন্দ্র করে আমাদের পরিচয় ও বাণিজ্য গড়ে উঠেছে।
- যে দেশে খাদ্য-সংস্কৃতি অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করে, সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ে কুলিনারি শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা বিলাসিতা নয়—এটি সময়ের দাবি।
লেখক: সিইও, পরিচালক, প্যান্ডি শেফ এবং ব্যাচেলর অব প্যাটিসসারি আর্টস, টেইলরস ইউনিভার্সিটি, মালয়েশিয়া ও ইউনিভার্সিটি অব টুলুজু, ফ্রান্সের সঙ্গে যৌথ ডিগ্রি।



