বিশ্ববিদ্যালয় নেতৃত্বে রাজনৈতিক আনুগত্য নাকি একাডেমিক মেধা: জাতির ভবিষ্যৎ প্রশ্নে
বিশ্ববিদ্যালয় নেতৃত্বে রাজনৈতিক আনুগত্য নাকি একাডেমিক মেধা

বিশ্ববিদ্যালয় নেতৃত্বে রাজনৈতিক আনুগত্য নাকি একাডেমিক মেধা: জাতির ভবিষ্যৎ প্রশ্নে

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আজ এক গভীর সংকটের মুখোমুখি। প্রশ্ন উঠেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদটি কি রাজনৈতিক আনুগত্যের প্রতীক, নাকি জ্ঞানচর্চার সর্বোচ্চ নেতৃত্বের আসন? এই বিতর্ক কেবল প্রশাসনিক নয়; এটি জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের মৌলিক ইস্যু। কারণ, উপাচার্য বা ভাইস চ্যান্সেলর শুধু একটি পদাধিকারী নন, তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা, গবেষণা, নৈতিকতা এবং একাডেমিক স্বাধীনতার জীবন্ত প্রতীক। অথচ বর্তমান বাস্তবতায় এই পদটি প্রায়ই জ্ঞানের নেতৃত্বের বদলে রাজনৈতিক আনুগত্যের পুরস্কারে পরিণত হচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয়: বৌদ্ধিক প্রতিষ্ঠান নাকি রাজনৈতিক দপ্তর?

বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রের কোনো সাধারণ দপ্তর নয়; এটি একটি স্বতন্ত্র বৌদ্ধিক প্রতিষ্ঠান। এখানে জ্ঞান সৃষ্টি হয়, সমালোচনামূলক চিন্তার বিকাশ ঘটে এবং সমাজের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব গড়ে ওঠে। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বে এমন একজন ব্যক্তির অবস্থান অপরিহার্য, যিনি প্রথমত একজন শ্রেষ্ঠ শিক্ষক, দ্বিতীয়ত একজন প্রতিষ্ঠিত গবেষক এবং তৃতীয়ত একজন নৈতিক বুদ্ধিজীবী। উপাচার্যের পরিচয় হওয়া উচিত তাঁর গবেষণার গভীরতা, আন্তর্জাতিক মানের জার্নালে প্রকাশনা, উচ্চ উদ্ধৃতি সংখ্যা এবং একাডেমিক নেতৃত্বের মাধ্যমে। কিন্তু বাংলাদেশে এই মৌলিক মানদণ্ডগুলো প্রায়শই উপেক্ষিত হয়।

বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উপাচার্য নির্বাচন করা হয় কঠোর একাডেমিক মানদণ্ডের ভিত্তিতে। উদাহরণস্বরূপ, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্টরা সাধারণত আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত গবেষক, যাঁদের কাজ বিশ্বজুড়ে আলোচিত। অক্সফোর্ড বা কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরাও দীর্ঘ একাডেমিক অবদানের মাধ্যমে এই পদে আসেন। তাঁদের গবেষণা আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত, উদ্ধৃতি হাজার হাজার এবং তাঁরা বৈশ্বিক একাডেমিক নেটওয়ার্কে সমাদৃত। এসব প্রতিষ্ঠানে কেবল রাজনৈতিক আনুগত্যের কারণে নেতৃত্বের পদে বসার কল্পনাও করা যায় না।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট: রাজনৈতিক প্রভাব ও একাডেমিক দুর্বলতা

বাংলাদেশে বিষয়টি অনেক ক্ষেত্রে ভিন্ন চিত্র উপস্থাপন করে। এখানে প্রায়ই দেখা যায়, উপাচার্য নিয়োগের ক্ষেত্রে দলীয় ঘনিষ্ঠতা কিংবা প্রশাসনিক সুবিধাবাদ মুখ্য ভূমিকা পালন করে। এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বে এমন ব্যক্তিরা আসেন, যাঁদের একাডেমিক অবদান সীমিত, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি কম এবং গবেষণার ধারাবাহিকতা প্রশ্নবিদ্ধ। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক একাডেমিক পরিবেশ দুর্বল হয়ে পড়ে এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ বৃদ্ধি পায়।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এমন কিছু উপাচার্য ছিলেন, যাঁরা একাধারে শিক্ষক, গবেষক এবং বুদ্ধিজীবী হিসেবে পরিচিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দিকের নেতৃত্বে থাকা অনেকেই আন্তর্জাতিক মানের গবেষক ছিলেন। তাঁরা রাষ্ট্রের সঙ্গে মতপার্থক্য করতে ভয় পেতেন না এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন রক্ষায় দৃঢ় অবস্থান নিতেন। সেই সময় বিশ্ববিদ্যালয় ছিল সত্যিকার অর্থেই মুক্তবুদ্ধিবৃত্তিক বিতর্কের প্রাণকেন্দ্র।

নৈতিক সাহস ও স্বাধীনতার গুরুত্ব

বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বের আরেকটি অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য হলো নৈতিক সাহস। একজন উপাচার্য যদি কেবল সরকারের নির্দেশ বাস্তবায়নকারী হন, তবে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত নেতৃত্ব দিতে পারেন না। ইতিহাসে বহু উদাহরণ আছে, যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতারা রাষ্ট্রের নীতির বিরুদ্ধেও অবস্থান নিয়েছেন—কারণ তাঁরা বিশ্বাস করেছেন যে জ্ঞানচর্চা ও সত্যের অনুসন্ধান কোনো রাজনৈতিক ক্ষমতার অধীন নয়।

বিশ্বের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যরা রাষ্ট্রের সমালোচক হিসেবেও পরিচিত। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য কিংবা ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্ব প্রায়ই সরকারের নীতির বিরুদ্ধে যুক্তি তুলে ধরে। কারণ, বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল কাজই হলো প্রশ্ন করা, সমালোচনা করা এবং নতুন চিন্তার পথ তৈরি করা। কিন্তু বাংলাদেশে এই জায়গাটি ক্রমে সংকুচিত হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে, ২০২৩-২৪ সালে গাজা যুদ্ধকে কেন্দ্র করে আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদের সময় অনেক উপাচার্য সরকারের অবস্থানের সঙ্গে সরাসরি একমত হননি।

আদর্শ উপাচার্যের মৌলিক বৈশিষ্ট্য

আদর্শ উপাচার্যের কিছু মৌলিক বৈশিষ্ট্য থাকা উচিত। প্রথমত, তাঁর গবেষণার একটি শক্তিশালী ট্র্যাক রেকর্ড থাকতে হবে। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত জার্নালে নিয়মিত প্রকাশনা, উল্লেখযোগ্য উদ্ধৃতির সংখ্যা এবং গবেষণায় নেতৃত্ব দেওয়ার অভিজ্ঞতা অপরিহার্য। দ্বিতীয়ত, তাঁর প্রশাসনিক দক্ষতা থাকতে হবে—কিন্তু সেই প্রশাসন হবে একাডেমিক মূল্যবোধের ওপর ভিত্তি করে। তৃতীয়ত, তাঁর নৈতিক অবস্থান দৃঢ় হতে হবে, যাতে তিনি রাজনৈতিক চাপের মুখেও বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন রক্ষা করতে পারেন।

গত এক দশকে আমরা দেখেছি, অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যরা প্রশাসনিক কর্তৃত্ব বজায় রাখতেই বেশি মনোযোগী হয়েছেন। ক্যাম্পাসে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত হয়েছে, শিক্ষক নিয়োগে দলীয় বিবেচনা এসেছে এবং গবেষণার পরিবেশ দুর্বল হয়েছে। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন রাজনৈতিক সংঘাতের কেন্দ্রেও পরিণত হয়েছে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল উদ্দেশ্য জ্ঞানচর্চা পিছিয়ে পড়েছে।

অতীতের গৌরব ও বর্তমানের চ্যালেঞ্জ

আজ থেকে চার-পাঁচ দশক আগে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নেতৃত্বের চরিত্র ছিল অনেকটাই ভিন্ন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর নেতৃত্বে তখন এমন ব্যক্তিরা ছিলেন, যাঁদের একাডেমিক অবদান ও নৈতিক অবস্থান সমাজে গভীর শ্রদ্ধার জায়গা তৈরি করেছিল। উদাহরণস্বরূপ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী শুধু প্রশাসনিক নেতৃত্বই দেননি; তিনি আন্তর্জাতিক পরিসরেও বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা রক্ষায় দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিলেন।

একইভাবে ড. মুজাফ্‌ফর আহমদ চৌধুরী বা ড. এ আর মল্লিক—তাঁদের মতো শিক্ষাবিদেরা ছিলেন গবেষণা, শিক্ষা ও নৈতিক নেতৃত্বের প্রতীক। তাঁরা দলীয় পরিচয়ের মাধ্যমে নয়; বরং তাঁদের বৌদ্ধিক অবদান ও একাডেমিক গ্রহণযোগ্যতার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বে আসতেন। সেই সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা রাষ্ট্রের সঙ্গে মতপার্থক্য প্রকাশ করতেও দ্বিধা করতেন না, কারণ তাঁরা বুঝতেন যে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাতন্ত্র্য ও বৌদ্ধিক স্বাধীনতা রক্ষা করা তাঁদের নৈতিক দায়িত্ব।

ভবিষ্যতের পথনির্দেশ

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে তার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওপর। কারণ, এখান থেকেই তৈরি হবে দেশের বিজ্ঞানী, চিন্তাবিদ, নীতিনির্ধারক ও সামাজিক নেতৃত্ব। যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্ব দুর্বল হয়, তবে সেই দুর্বলতা পুরো সমাজে ছড়িয়ে পড়বে। সময় এসেছে নতুন করে ভাবার। উপাচার্য পদটি কোনো রাজনৈতিক পুরস্কার নয়; এটি একটি জাতির জ্ঞানচর্চার সর্বোচ্চ দায়িত্ব।

এই পদে এমন ব্যক্তিদের প্রয়োজন, যাঁরা সত্যিকারের একাডেমিক নেতা—যাঁদের গবেষণা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত, যাঁদের নৈতিক সাহস আছে এবং যাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়কে সত্যিকার অর্থে জ্ঞানের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে পারেন। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আবারও সেই জায়গায় ফিরিয়ে নিতে হবে, যেখানে তাঁরা হবেন জ্ঞান, সততা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্বের প্রতীক। তখনই আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আবার জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক পুনর্জাগরণের কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারবে।