অধ্যাপক নিয়াজ আহমেদ খানের বিদায়ী বক্তব্য: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদে দেড় বছর
অধ্যাপক নিয়াজ আহমেদ খান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্ব থেকে বিদায় নিচ্ছেন। তিনি প্রায় দেড় বছর এই পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। মঙ্গলবার বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ বিভাগের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে তিনি তাঁর বিদায়ী বক্তব্য তুলে ধরেন। নতুন উপাচার্য হিসেবে অধ্যাপক এ বি এম উবায়দুল ইসলাম নিয়োগ দেওয়ার পরদিন এই ঘোষণা আসে।
রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার
অধ্যাপক নিয়াজ আহমেদ খান তাঁর কোনো রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নেই বলে দাবি করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমি দ্ব্যর্থহীনভাবে বলছি, আমার কোনো দলীয় রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নেই। বিনীতভাবে অনুরোধ করছি, কোনো সময়ে আমার কোনো দলীয় রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পেলে আমাকে জানান।’ উপাচার্যের দায়িত্ব পালনকালে তিনি কোনো ছাত্রসংগঠনকে সুবিধা দেননি বলে উল্লেখ করেছেন, যদিও জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল তাঁর বিরুদ্ধে ডাকসু নির্বাচনসহ বিভিন্ন সময়ে ইসলামী ছাত্রশিবিরকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ করেছে।
দায়িত্ব গ্রহণ ও পদত্যাগের পটভূমি
নিয়াজ আহমেদ খান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক। ২০২৪ সালের আগস্টের শেষ দিকে বেসরকারি ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশের (আইইউবি) ভারপ্রাপ্ত উপাচার্যের দায়িত্ব ছেড়ে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্ব নিয়েছিলেন তিনি। গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনের দুই দিন আগে তিনি সংবাদ সম্মেলন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্ব ছাড়তে চান বলে জানিয়েছিলেন। নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা বিএনপি সরকার গঠনের এক সপ্তাহ পর তিনি পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছিলেন।
আপৎকালীন সময়ে দায়িত্ব গ্রহণ
নিয়াজ আহমেদ খান বলেন, ‘একটি আপৎকালীন সময়ে দেশ ও জাতির স্বার্থে ছাত্রদের অনুরোধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব নিয়েছিলাম। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রম কার্যত বন্ধ ছিল, প্রশাসনিক কাঠামো অকার্যকর হয়ে পড়েছিল। সেই পরিস্থিতিতে প্রথম লক্ষ্য ছিল একাডেমিক কার্যক্রম পুনরায় শুরু করা এবং বিশ্ববিদ্যালয়কে স্থিতিশীলতায় ফেরানো। এখন আর সেই আপৎকালীন নাজুক পরিস্থিতি নেই।’ তিনি উপাচার্যের দায়িত্বটিকে একটি ‘আমানত’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং এটি ছিল উদ্ধারকারী মিশন, চাকরি নয় বলে উল্লেখ করেছেন।
অর্জন ও উন্নয়ন প্রকল্প
বিদায়ী বক্তব্যে নিয়াজ আহমেদ খান তাঁর দায়িত্বকালে নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগ ও অর্জনের কথা উল্লেখ করেন। সবচেয়ে বড় অর্জন হিসেবে তিনি প্রায় ২ হাজার ৮৪১ কোটি টাকার ‘অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্প’-এর কথা তুলে ধরেন। এই প্রকল্পের আওতায় একাধিক একাডেমিক ভবন, ছাত্রছাত্রীদের আবাসিক হল, শিক্ষক-কর্মকর্তাদের আবাসন, প্রশাসনিক ভবন, অবকাঠামো উন্নয়নসহ নানা কাজ বাস্তবায়নাধীন।
র্যাঙ্কিং ও গবেষণায় অগ্রগতি
টাইমস হায়ার এডুকেশন ও কিউএস র্যাঙ্কিংয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থানের উন্নতি হয়েছে বলে জানান তিনি। কিউএস ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র্যাঙ্কিং ২০২৬-এ বিশ্ববিদ্যালয় ৫৮৪তম স্থান অর্জন করেছে এবং বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক র্যাঙ্কিংয়েও একাধিক বিভাগ প্রথমবারের মতো অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
প্রশাসনিক সংস্কার ও শিক্ষার্থীদের কল্যাণ
প্রশাসনিক সংস্কারের ক্ষেত্রে নিয়োগে স্বচ্ছতা ও বিকেন্দ্রীকরণকে অন্যতম পদক্ষেপ হিসেবে দাবি করেন তিনি। সিনিয়র ম্যানেজমেন্ট টিম (এসএমটি) গঠন, সার্চ কমিটির মাধ্যমে নিয়োগ এবং অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সংস্কৃতি চালুর কথা উল্লেখ করেছেন। স্বচ্ছতা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে গত ১৭ মাসে ৬৯ জন লেকচারার (প্রভাষক) নিয়োগ করা হয়েছে বলে জানান।
শিক্ষার্থীদের কল্যাণে নেওয়া উদ্যোগের মধ্যে আবাসিক হলে ‘গণরুম প্রথা’ বিলুপ্তি, আসন বণ্টনে নীতিমালা প্রণয়ন, দরিদ্র শিক্ষার্থীদের আর্থিক সহায়তা, অনলাইন সেবা চালু এবং ক্যাম্পাসে শাটল পরিবহন চালুর বিষয়গুলো তুলে ধরেন। পাশাপাশি মেডিকেল সেন্টারের আধুনিকায়ন, কেন্দ্রীয় মসজিদ পুনর্নির্মাণ উদ্যোগ এবং পরিবেশ সংরক্ষণে নানা পদক্ষেপের কথাও বলেন।
ডাকসু নির্বাচন ও চ্যালেঞ্জ
ডাকসু নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে সম্পন্ন হয়েছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা নির্বিঘ্নে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছে। নতুন প্রশাসনের সামনে তিনটি প্রধান চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। এগুলো হলো অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে পেশাগত দক্ষতা বজায় রাখা, প্রশাসনিক সংস্কার কার্যক্রম চালু রাখা এবং আবাসিক হলে দখলদারত্ব ও গণরুম প্রথা পুনরায় ফিরে আসার প্রবণতা প্রতিরোধ করা।
বিদায় ও কৃতজ্ঞতা
সবশেষে নিয়াজ আহমেদ খান বলেন, ‘অনেক দিন কঠোর পরিশ্রম করেছি এখন আমার কিছু বিশ্রাম প্রয়োজন।’ সহকর্মী, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘নতুন উপাচার্য হিসেবে অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলামের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করতে যাচ্ছি।’ তিনি এখন তাঁর মূল পদে ফিরে যাচ্ছেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি স্থিতিশীল পর্যায়ে নিয়ে আসার দাবি করেছেন।
