নওগাঁয় নির্মম হত্যাকাণ্ড: জমি বিরোধ ও পূর্বশত্রুতার সন্দেহে চার সদস্যের পরিবার নিহত
নওগাঁ জেলার নিয়ামতপুর উপজেলায় এক দম্পতি ও তাদের দুই ছেলেমেয়েকে হত্যার পেছনে জমিজমা নিয়ে বিরোধ এবং পূর্বশত্রুতা থাকার সম্ভাবনা উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দা, স্বজন এবং পুলিশের ধারণা অনুযায়ী, এই ভয়াবহ ঘটনার মূল কারণ হিসেবে জমি সংক্রান্ত বিবাদ ও পুরনো শত্রুতাকে চিহ্নিত করা হচ্ছে। ঘটনায় জড়িত সন্দেহে নিহত হাবিবুর রহমানের ভাগনে সবুজ হোসেনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে, যদিও এখনও আনুষ্ঠানিক মামলা দায়ের করা হয়নি।
গ্রেপ্তার ও হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত বিবরণ
মঙ্গলবার বেলা সাড়ে এগারোটার দিকে বাহাদুরপুর গ্রাম থেকে সবুজ হোসেনকে আটক করা হয়। তিনি নিহত হাবিবুর রহমানের ভাগনে এবং মান্দা উপজেলার পারনপুর গ্রামের আব্দুস সামাদের পুত্র। এর আগে, সোমবার মধ্যরাতে নিয়ামতপুর উপজেলার বাহাদুরপুর ইউনিয়নের বাহাদুরপুর গ্রামে হাবিবুর রহমানসহ তার পরিবারের চার সদস্যকে গলা কেটে হত্যা করা হয়। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন হাবিবুর রহমানের স্ত্রী পপি সুলতানা, তাদের নয় বছরের ছেলে পারভেজ রহমান এবং তিন বছরের মেয়ে সাদিয়া খাতুন। মঙ্গলবার সকালে তাদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
হত্যাকাণ্ডের পটভূমি ও সম্ভাব্য কারণ
স্থানীয় সূত্র এবং পুলিশের সঙ্গে আলোচনা থেকে জানা যায়, সোমবার রাতের কোনো এক সময়ে দুর্বৃত্তরা বাড়ির ভেতরেই পরিবারের সদস্যদের ওপর হামলা চালায়। ফজরের নামাজের পর প্রতিবেশীরা দরজা খোলা দেখে ভেতরে প্রবেশ করলে মরদেহগুলো দেখতে পান। পুলিশকে খবর দেওয়ার পর তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশ উদ্ধার করে। হাবিবুর রহমান একজন গরু ব্যবসায়ী ছিলেন, যিনি মান্দার চৌবাড়িয়া হাটে গরু বিক্রি করে সোমবার রাত আটটার দিকে বাড়ি ফিরেছিলেন। তার কাছে গরু বিক্রির প্রাপ্ত দুই লাখ আশি হাজার টাকা ছিল বলে জানা গেছে। পুলিশ ও প্রতিবেশীরা ধারণা করছেন, দুর্বৃত্তরা এই টাকা লুটের উদ্দেশ্যে অথবা জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের জেরে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে থাকতে পারে।
পরিবারের স্বজনদের বেদনাদায়ক বর্ণনা
বাহাদুরপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, নিহতদের মরদেহ বাড়ির আঙিনায় ঢেকে রাখা হয়েছে। নিহত পপি সুলতানার মা সাবিনা বেগম মেয়ে, জামাতা ও দুই নাতি-নাতনির মরদেহের পাশে বসে আহাজারি করছেন। তিনি বলেন, ‘জমির ভাগাভাগি নিয়ে ওরা পাঁচ বোন মিলেই মেয়ে, জামাই, নাতি-নাতনিকে মেরে ফেলছে।’ পপির বাবা মোয়াজ্জেম হোসেন কাঁদতে কাঁদতে বলেছেন, ‘আমি এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত সবার ফাঁসি চাই। আমার তিন বছরের নাতনিকেও তারা ছাড়েনি। বাড়ির জমিজমা নিয়ে বিরোধে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।’
নিহতের পিতার মর্মস্পর্শী সাক্ষাৎকার
নিহত হাবিবুরের বাবা নমির উদ্দিন বলেন, ‘জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধে এমন ঘটনা ঘটতে পারে। আমার মেয়ে, মেয়ের জামাই ও নাতিরা এ ঘটনায় জড়িত থাকতেও পারে। তারা বিভিন্ন সময়ে আমার ছেলেসহ পরিবারের সবাইকে হত্যার হুমকি দিয়ে আসছিল। পুলিশ ঘটনার তদন্ত করলে আসল রহস্য জানা যাবে।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘আমার ছেলে, বউমা আর দুই নাতি-নাতনি রাতে একই ঘরে ঘুমাইছিল। আমি অন্য ঘরে ঘুমাইছিলাম। কখন তাদের মাইরে গেছে, আমি কিছুই জানতে পারিনি। সকালে বাড়ির বাইরের দরজা খোলা দেখে এক প্রতিবেশী বাড়িত ঢুকে প্রথমে আঙিনায় বউমার লাশ দেখে চিৎকার করে ওঠে। তার চিৎকার শুনে আমার ঘুম ভাঙে। উঠে দেখি, আঙিনায় বউমার রক্তাক্ত লাশ। আর ঘরের ভেতর ছেলে ও নাতি-নাতনির লাশ। আমার ছেলে ও তার পরিবারকে শেষ করে দিছে। এমন নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিচার চাই আমি।’
পুলিশের তদন্ত ও পদক্ষেপ
নিয়ামতপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান জানান, নিহতদের প্রত্যেকের মাথায় ভারী কিছু দিয়ে আঘাত করা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, মাথায় আঘাত করার পর হাবিবুর ও দুই সন্তানকে গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে। হাবিবুরের স্ত্রী দৌড়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে বাড়ির আঙিনায় তাকেও মাথায় আঘাত ও গলা কেটে হত্যা করা হয়। ময়নাতদন্তের জন্য লাশগুলো নওগাঁ জেনারেল হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ‘এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিহত হাবিবুরের ভাগনে সবুজ হোসেনকে আটক করে থানায় নেওয়া হয়েছে। প্রাথমিকভাবে পূর্বশত্রুতার জেরে হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে ধারণা করছে পুলিশ। ঘটনার তদন্ত চলছে। তদন্তে যাদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যাবে, তাদের সবাইকে আটক করা হবে।’
উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন
নওগাঁর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম বলেন, ‘মামলার প্রক্রিয়া চলছে। সেইসঙ্গে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ), জেলা গোয়েন্দা শাখা এবং নিয়ামতপুর থানা পুলিশের সমন্বয়ে তিনটি পৃথক দল হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে কাজ করছে।’ এই পদক্ষেপগুলি ঘটনার গভীর তদন্ত এবং দোষীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে।



