বিআরটি প্রকল্প: অপরিকল্পিত বাস্তবায়নে জনদুর্ভোগ, এখনো আছে সমাধানের পথ
বিআরটি প্রকল্প: অপরিকল্পিত বাস্তবায়নে জনদুর্ভোগ

বিআরটি প্রকল্পের অপরিকল্পিত স্থাপনাগুলোর কারণে পাশের অসমাপ্ত সরু লেন দিয়েই বর্তমানে যাত্রীদের চলাচল করতে হচ্ছে। আর উড়ালসড়কে যানজট লেগেই থাকছে। ঢাকা থেকে গাজীপুর বাংলাদেশের অন্যতম ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ পরিবহন করিডর। দেশের শিল্প, অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসাব্যবস্থার সঙ্গে এ রুটের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। প্রতিদিন লাখ লাখ মানুষ নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজের জন্য এই সড়ক ব্যবহার করে। দীর্ঘদিনের যানজট নিরসন এবং দ্রুত, নিরাপদ ও আধুনিক গণপরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে শুরু হয় বিআরটি প্রকল্প। জনগণের ভাবনায় ছিল উন্নত বিশ্বের আদলে নির্ধারিত লেনে দ্রুতগতির বাস চলবে, ভ্রমণসময় কমবে এবং রাজধানীর উত্তর অংশের দীর্ঘস্থায়ী যানজট অনেকাংশে হ্রাস পাবে।

দীর্ঘ ১৩ বছরের নির্মাণকাজে জনদুর্ভোগ চরমে

কিন্তু দীর্ঘ প্রায় ১৩ বছরের নির্মাণকাজে গাজীপুর ও উত্তর ঢাকার মানুষকে অসহনীয় দুর্ভোগ সহ্য করতে হলেও, বাস্তবতা আজ এক ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে। প্রতিদিনের ধুলাবালি, তীব্র যানজট, দীর্ঘ খোঁড়াখুঁড়ি, কর্দমাক্ত রাস্তায় পথচারীদের চলাচল, দুর্ঘটনা, ব্যবসায়িক ক্ষতি এবং সময় অপচয় সাধারণ মানুষের জীবনকে কঠিন করে তুলেছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতাও মানুষের ক্ষোভ বাড়িয়েছে। বছরের পর বছর রাস্তা খোঁড়া অবস্থায় পড়ে থাকায় ধুলাদূষণ বেড়েছে, বর্ষাকালে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থেকে সাধারণ মানুষের কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়েছে। শিক্ষার্থী, শ্রমিক, অফিসগামী মানুষ ও রোগীদের জীবনযাত্রায় এর নেতিবাচক প্রভাব গভীরভাবে পড়েছে। এখনো প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটছে, মানুষ দুর্ভোগের মধ্যে রাস্তা পারাপার করছে, কিন্তু এসব বিষয়ে কার্যকর নজরদারি ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনা খুব একটা চোখে পড়ে না। নির্মাণকালীন দীর্ঘ ভোগান্তির পর এখন অনেকের মনে হচ্ছে, এই প্রকল্প মানুষের জীবন সহজ করার পরিবর্তে নতুন ধরনের কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে প্রকল্পটির পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পরিকল্পনার মৌলিক ত্রুটিই মূল সমস্যা

সাধারণভাবে একটি বিআরটি ব্যবস্থার মূল ভিত্তি হলো সুপরিকল্পিত প্রকল্প প্রস্তুতি, সম্ভাব্যতা যাচাই, যাত্রী চাহিদা বিশ্লেষণ, দক্ষ পরিচালনাগত নকশা এবং সমন্বিত নগর পরিবহন পরিকল্পনা। এর আওতায় সেবার ফ্রিকোয়েন্সি, যাত্রী ধারণক্ষমতা, রুট কাঠামো, স্টেশন পরিকল্পনা, ডেডিকেটেড মিডিয়ান লেন, টার্মিনাল এবং ইন্টারসেকশন ব্যবস্থাপনা নির্ধারণ করা হয়। পাশাপাশি অন্যান্য গণপরিবহনের সঙ্গে সমন্বয় এবং ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনার বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ঢাকা-গাজীপুর বিআরটি প্রকল্পে এসব মৌলিক বিষয়ে পর্যাপ্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে মনে হয় না। শুরু থেকেই পুরো করিডরকে একটি সমন্বিত নগর পরিবহনব্যবস্থার অংশ হিসেবে বিবেচনা না করে মূলত একটি অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্প হিসেবে দেখা হয়েছে। ফলে বাস্তবতার সঙ্গে প্রকল্পের সামঞ্জস্য অনেকাংশে হারিয়ে গেছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সংকীর্ণ সড়কে ডেডিকেটেড লেন: যানজটের নতুন মাত্রা

সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো এই করিডরের ভৌত অবস্থা। ঢাকা-গাজীপুর সড়ক আগে থেকেই অত্যন্ত চাপযুক্ত এবং দুই পাশ ঘনবসতিপূর্ণ ও বাণিজ্যিক এলাকায় পরিপূর্ণ। এমন একটি সড়কের মাঝখানে ডেডিকেটেড বিআরটি লেন নির্মাণ করতে গেলে পর্যাপ্ত বিকল্প রাস্তা, সার্ভিস রোড এবং শক্তিশালী ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা আগে থেকেই প্রস্তুত থাকা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু বাস্তবে সংকীর্ণ সড়কের মধ্যেই বিআরটি লেন স্থাপন করা হয়েছে। ফলে সাধারণ যানবাহনের চলাচলের জন্য কার্যকর লেন সংখ্যা কমে গেছে এবং যানজট আরও তীব্র হয়েছে।

মাঝের স্টেশন ও পথচারীর ঝুঁকি

আরও পড়ুন: ১৪ বছরে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা খরচা, এখন বিআরটি বাতিলের আলোচনা। বিআরটি স্টেশনগুলো সড়কের মাঝখানে স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে ডান দিকের দরজাবিশিষ্ট বিশেষ ধরনের বাস প্রয়োজন। মাঝের স্টেশনগুলোতে যাত্রীদের ওঠানামা করতে হবে এবং ডান বা বাঁ দিকে যাওয়ার জন্য রাস্তা পারাপার করতে হবে, যদিও ফুটওভার ব্রিজ রয়েছে, বাস্তবে সবাই তা ব্যবহার করে না, ফলে সার্ভিস লেনগুলোতে তীব্র যানজট থাকবে, এর পাশাপাশি বিআরটির কারণে পাশের সার্ভিস লেনগুলোও সংকীর্ণ হয়ে গেছে, বিষয়টিও বাস্তবসম্মতভাবে বিবেচনা করা হয়নি। আবার একক লেনে চলাচলরত কোনো বাস যান্ত্রিক ত্রুটিতে বন্ধ হয়ে গেলে পুরো করিডরে বড় ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।

দ্রুততা ও নিরবচ্ছিন্নতা বাস্তবায়নে বড় চ্যালেঞ্জ

একটি কার্যকর বিআরটি ব্যবস্থার মূল শক্তি হলো দ্রুততা, নির্ভরযোগ্যতা এবং নিরবচ্ছিন্ন চলাচল। কিন্তু ঢাকা-গাজীপুর করিডরে অসংখ্য ইউটার্ন, অনিয়ন্ত্রিত সংযোগ সড়ক, বাজার এলাকা, স্থানীয় যানবাহনের চাপ এবং দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার কারণে সেই নিরবচ্ছিন্ন গতি বাস্তবে নিশ্চিত করা কঠিন। একই করিডরে ট্রাক, বাস, প্রাইভেট কার, রিকশা, সিএনজি, মোটরসাইকেল এবং পথচারী চলাচল করে। ফলে এই সড়ককে একটি আদর্শ বিআরটি করিডর হিসেবে কার্যকর রাখা বাস্তবিক অর্থেই বড় চ্যালেঞ্জ।

বর্তমান বাস্তবতায় সমাধানের পথ

বর্তমান বাস্তবতায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—এই প্রকল্পের ভবিষ্যৎ কোন পথে এগোনো উচিত? বাস্তবতা মেনে বলতে হয়, এই করিডরে পূর্ণাঙ্গ বিআরটি ব্যবস্থা কার্যকরভাবে পরিচালনা করা অত্যন্ত কঠিন। তাই এখন প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক ও ব্যবহারযোগ্য সমাধান। শুধু ‘বিআরটি’ নাম ধরে রাখার জন্য একটি অকার্যকর ব্যবস্থা চালু রাখা হলে ভবিষ্যতেও জনদুর্ভোগ অব্যাহত থাকবে।

এক্সপ্রেস আরবান করিডর: একটি কার্যকর বিকল্প

একটি কার্যকর বিকল্প হতে পারে বর্তমান করিডরকে পুনর্বিন্যাস করে ‘এক্সপ্রেস আরবান করিডর’ হিসেবে উন্নয়ন করা। এই ব্যবস্থায় মাঝখানের ডেডিকেটেড বিআরটি স্টেশনগুলো অপসারণ করে মাঝবরাবর সুশৃঙ্খল ডিভাইডারসহ এক্সপ্রেস লেন তৈরি করা যেতে পারে, যা দ্রুতগতির মোটরচালিত যানবাহনের জন্য ব্যবহৃত হবে। দুই পাশে সার্ভিস রোড রাখা যেতে পারে স্থানীয় যানবাহন, দোকানপাটে প্রবেশ এবং স্বল্প দূরত্বের যাতায়াতের জন্য। এ ধরনের করিডরে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা তুলনামূলক সহজ হবে। দ্রুতগতির যানবাহন মাঝের লেন ব্যবহার করবে এবং স্থানীয় যানবাহন পাশের সার্ভিস রোড ব্যবহার করবে। এতে যানজট কমবে এবং সড়কের কার্যকারিতা বাড়বে। একই সঙ্গে অ্যাম্বুলেন্স ও ফায়ার সার্ভিসের মতো জরুরি যানবাহনের দ্রুত চলাচল নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

পথচারী নিরাপত্তা ও আধুনিক ফুটওভারব্রিজ

পথচারীদের নিরাপত্তাকেও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। বর্তমানে ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পারাপারের কারণে দুর্ঘটনা বাড়ছে। তাই গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পর্যাপ্ত ফুটওভারব্রিজ নির্মাণ করতে হবে। যেসব স্থানে যাত্রী চাপ বেশি, সেখানে এস্কেলেটর, লিফটসহ আধুনিক ফুটওভারব্রিজ নির্মাণ করা যেতে পারে, যাতে নারী, শিশু, বৃদ্ধ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরাও সহজে ব্যবহার করতে পারেন। শুধু অবকাঠামো নির্মাণ নয়, সেগুলোর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণও নিশ্চিত করতে হবে।

গণপরিবহন ব্যবস্থার সংস্কার

এর পাশাপাশি গণপরিবহনব্যবস্থাকে নতুনভাবে সাজানো জরুরি। এলোমেলো বাস চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে রুট রেশনালাইজেশন, নির্দিষ্ট স্টপেজ, ই-টিকেটিং, ডিজিটাল ট্রাফিক সিগন্যাল এবং বাস ফ্রিকোয়েন্সি ব্যবস্থাপনা চালু করতে হবে। সড়কের পাশে পর্যাপ্ত ফুটপাত, ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং সবুজায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করলে নগর পরিবেশও উন্নত হবে।

ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষা

আরও পড়ুন: সরকারকে সাহসী ও যৌক্তিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ভবিষ্যতের প্রকল্পগুলোতে বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। শুধু বিদেশি মডেল অনুকরণ করলেই হবে না; বাংলাদেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও ভৌগোলিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরিবহনব্যবস্থা পরিকল্পনা করতে হবে। কারণ, পরিবহন প্রকল্প শুধু কংক্রিটের অবকাঠামো নয়, এটি মানুষের জীবনযাত্রা, অর্থনীতি এবং নগর ব্যবস্থাপনার অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই পরিকল্পনার প্রতিটি ধাপে ট্রাফিক বিশেষজ্ঞ, নগর পরিকল্পনাবিদ, পরিবেশবিদ এবং স্থানীয় জনগণের মতামতকে সমান গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

ঢাকা-গাজীপুর বিআরটি প্রকল্প বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, দুর্বল ট্রাফিক পরিকল্পনা এবং দীর্ঘসূত্রতার কারণে একটি সম্ভাবনাময় উদ্যোগ জনদুর্ভোগের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। তবে এখনো সময় আছে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নেওয়ার। সঠিক পরিকল্পনা, কার্যকর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং মানুষের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিয়ে নতুনভাবে চিন্তা করা গেলে এই করিডরকে একটি কার্যকর, নিরাপদ ও আধুনিক নগর পরিবহন ব্যবস্থায় রূপান্তর করা সম্ভব।

ইকবাল আহমেদ, কানাডাপ্রবাসী প্রফেশনাল ইঞ্জিনিয়ার। মতামত লেখকের নিজস্ব।