ছেলের হাতে মারধর হওয়া বৃদ্ধ মায়ের বিচার, গলায় কলস ঝুলিয়ে বাজারে ঘোরানো
নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলায় এক মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে, যেখানে এক বৃদ্ধা মা সেহরির সময় ছাগলের মাংস চাইলে নিজের ছেলে তাকে মারধর করেন। পরবর্তীতে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের সালিশে অভিযুক্ত ছেলের গলায় পানিভর্তি কলস ঝুলিয়ে স্থানীয় বাজারে ঘোরানো হয়। এই ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে, যা সমাজে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ
রবিবার (১৬ মার্চ) ভোরবেলা নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলার ছাতারপাইয়া ইউনিয়নের একটি গ্রামে এই ঘটনা ঘটে। বৃদ্ধা মা সেহরি খাওয়ার সময় ছেলের ঘরে রান্না করা ছাগলের মাংসের এক টুকরো খেতে চাইলে ছেলে (৩৬) মাংস না দিয়ে উল্টো মাকে মারধর শুরু করেন। লাথি ও ধাক্কার শিকার হয়ে মা কাঁদতে কাঁদতে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুর রহমানের বাড়িতে হাজির হন এবং বিচার চান।
চেয়ারম্যান আবদুর রহমান গ্রাম পুলিশ পাঠিয়ে অভিযুক্ত ছেলেকে ধরে আনেন এবং ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্সের সামনে প্রকাশ্য সালিশের আয়োজন করেন। সালিশে ছেলের গলায় পানিভর্তি একটি কলস ঝুলিয়ে দেওয়া হয় এবং তাকে স্থানীয় বাজারে ঘোরানো হয়, যা একটি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
চেয়ারম্যান ও পুলিশের বক্তব্য
চেয়ারম্যান আবদুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বৃদ্ধ মা ছেলের ঘরে ছাগলের মাংস রান্না হয়েছে শুনে গত শনিবার ভোরে সেহরি খাওয়ার সময় এক টুকরো মাংস চেয়েছিলেন। ছেলে মাংস তো দেয়নি, উল্টো মাকে মারধর করেছে। লাথির পর লাথি দিয়েছেন। ভোরে বাড়িতে এসে ঘটনাটি জানান ওই নারী। এরপর আজ সকালে গ্রামপুলিশ পাঠিয়ে ধরে এনে বিচারের ব্যবস্থা করেছি।’
তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘এ রকম কোনও ব্যক্তি যদি মাকে ভাত না দেয়, মারধর করে তাহলে বিচার নিয়ে আমাদের কাছে আসবেন, কোনও জেল-জুলুমের দরকার নাই। বিচার আমরা করবো।’ এই মন্তব্য ভিডিওতে শোনা গেছে, যা সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে।
অন্যদিকে, সেনবাগ থানার ওসি আবুল বাশার বলেন, ‘গ্রাম্য সালিশে আদালত করার তার অধিকার আছে। কিন্তু এ ধরনের বিচারব্যবস্থার কথা আগে তিনি শুনিনি। বিষয়টি দৃষ্টিকটু।’ তিনি মাকে মারধরের অভিযোগে ছেলেকে ধরে এনে সালিশে গলায় পানিভর্তি কলসি ঝুলিয়ে বাজারে ঘোরানোর ঘটনা শুনেছেন বলে জানান।
সামাজিক প্রতিক্রিয়া ও তাৎপর্য
এই ঘটনা সমাজে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে, যেখানে অনেকেই ইউনিয়ন পরিষদের এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থাকে সমর্থন করছেন, আবার অনেকে এটিকে আইনবহির্ভূত ও মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে দেখছেন। ভিডিওটি সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর নেটিজেনরা বিভিন্ন মতামত প্রকাশ করেছেন:
- কেউ কেউ বলছেন যে মায়ের প্রতি এমন আচরণ অক্ষম্য, এবং স্থানীয় সালিশ একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
- অন্যদিকে, আইন বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন যে এ ধরনের শাস্তি আইনি প্রক্রিয়ার বাইরে এবং এটি সংশোধন করা উচিত।
- স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এই ঘটনা গ্রামে ভয় ও সচেতনতা সৃষ্টি করেছে, বিশেষ করে বয়স্কদের প্রতি সন্তানদের দায়িত্ব সম্পর্কে।
ঘটনাটি নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলার একটি প্রত্যন্ত গ্রামে ঘটলেও, এটি দেশব্যাপী একটি সামাজিক বিতর্কের সূত্রপাত করেছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন যে গ্রাম্য সালিশের মাধ্যমে এ ধরনের শাস্তি কতটা ন্যায়সঙ্গত, এবং আইনি ব্যবস্থার পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করছেন।
