লালমনিরহাটে ইউপি চেয়ারম্যানের আটক: ভিজিএফ চালের কল রেকর্ড ফাঁস ও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন
লালমনিরহাট জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার ২ নম্বর মদাতী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বিপ্লব সরকারকে সন্ত্রাস বিরোধী আইনে আটক করে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। পুলিশ তাকে সন্দেহভাজন আসামি হিসাবে গ্রেপ্তার করে এই ব্যবস্থা নেয়। তবে এই আটককে কেন্দ্র করে জেলাজুড়ে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে নানা ধরনের প্রশ্ন ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।
ভিজিএফ চাল নিয়ে কল রেকর্ড ফাঁস ও বিএনপি নেতাদের ভূমিকা
চেয়ারম্যান বিপ্লব সরকারকে আটকের পরপরই ভিজিএফ চাল বিতরণ নিয়ে একটি কল রেকর্ড ফাঁস হয়। এই রেকর্ডে ওই এলাকার সংসদ সদস্য রোকন উদ্দিন বাবুলের ৩০ পার্সেন্ট চাওয়া নিয়ে আলোচনা উঠে আসে। কল রেকর্ডে উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক শামসুজ্জামান সবুজ ও জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক বিধান চন্দ্র রায়ের সঙ্গে মদাতী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলম বিপ্লবের কথোপকথন শোনা যায়।
গত ১২ মার্চ ছড়িয়ে পড়া ওই কল রেকর্ডে সবুজ চেয়ারম্যান বিপ্লবকে জিজ্ঞাসা করেন, “এমপি সাহেবের থার্টি পার্সেন্ট আপনি বুঝিয়ে দিয়েছেন?” উত্তরে বিপ্লব জানান, “এ বিষয়ে আমরা মিটিং করেছি এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার প্রতিনিধি উপস্থিত থাকবেন।” এরপর সবুজ রাগান্বিত কণ্ঠে বলেন, “বিনা ভোটের এমপি যখন ছিলো তাদেরকে তো সুন্দরভাবে বুঝাইয়া দিছেন। আমরা কিন্তু বিনা ভোটে হই নাই। আমরা অতীত ভুলি নাই। আমাদের বরাদ্দ নিয়ে আপনি কীভাবে মিটিং করেন? এ হাজার তিনটি টোকেন বুঝিয়ে দেবেন।”
ভিজিএফ চালের বিষয়ে বিএনপি নেতা বিধান চন্দ্র রায়ের সঙ্গেও চেয়ারম্যান বিপ্লবের একই রকম আলাপচারিতা হয়। সেখানেও এমপির ৩০ পার্সেন্ট বুঝিয়ে দিতে চাপ দেওয়া হয়। এই কল রেকর্ড ফাঁসের পরই চেয়ারম্যানের আটক নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়।
পুলিশের বক্তব্য ও স্থানীয় কর্মকর্তাদের প্রতিক্রিয়া
কালিগঞ্জ থানার ওসি আবু সিদ্দিক বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, চেয়ারম্যান বিপ্লব পলাতক ছিলেন এমন দাবি করে তাকে আটক করা হয়েছে। তিনি বলেন, “বিধান ও সবুজের ফাঁস হওয়া ফোন কল রেকর্ডের সঙ্গে আটকের কোনও সম্পর্ক নাই। সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্য সন্ত্রাসীদের সুসংঘটিত করছিলেন তিনি। তাকে সন্ত্রাস বিরোধী আইনে আটক করা হয়েছে।”
আগে হওয়া মামলায় কত নম্বর আসামি বা পলাতক ছিলেন কি না এমন প্রশ্নে ওসি আরও বলেন, “চেয়ারম্যান বিপ্লব পলাতক ছিলেন। ওই মামলায় নামীয় আসামি নয়, সন্দেহভাজন হিসেবে তাকে আটক করা হয়েছে।” তবে ওসির এই দাবিকে সম্পূর্ণ মিথ্যা বলছেন ওই ইউনিয়ন পরিষদের সচিব মিনহাজ আলী। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “চেয়ারম্যান কখনও পলাতক, ছুটি কিংবা সাসপেন্ডে ছিলেন না। প্রতিদিন অফিস করেছেন। ৫ অগাস্ট পরবর্তী সময়ে অল্প কয়েকদিন ছুটিতে ছিলেন। তা ছাড়া কোনও অনুপস্থিতি নেই।”
লালমনিরহাটের স্থানীয় সরকার শাখার উপ পরিচালক রাজিব আহসানও একই ধরনের তথ্য দেন। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “মদাতীর ইউনিয়ন চেয়ারম্যান বিপ্লব আমার জানা মতে সাসপেন্ড বা পলাতক ছিলো না। আগামীকাল ডকুমেন্ট দেখে সঠিক তথ্য দিতে পারবো।”
বিএনপি নেতাদের অবস্থান ও বিভ্রান্তি
ভিজিএফ চালের ভাগাভাগিকে কেন্দ্র করে চেয়ারম্যানকে পুলিশ আটক করেছে এমন অভিযোগ নাকচ করেছেন উপজেলা বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক ও ফাঁস হওয়া রেকর্ডের একজন বিধান চন্দ্র রায়। তিনি বলেন, “ফোন রেকর্ড ফাঁস কিংবা চালের সঙ্গে আটকের কোনও সম্পর্ক নেই। ওর নামে মামলা ছিলো। পুলিশ তাকে আটক করেছে। এটা পুলিশ আর চেয়ারম্যান বুঝবে।”
ফাঁস হওয়া কল রেকর্ড সম্পর্কে বিএনপির স্থানীয় এই নেতা আরও বলেন, “এ আলাপে দোষের কিছু নাই। ওর সঙ্গে সম্পর্ক ভালো ছিলো, এখন ও বুঝবে।” তবে এই বক্তব্যে আটকের পেছনের কারণ নিয়ে আরও বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।
এই ঘটনায় স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। ভিজিএফ চাল বিতরণ, কল রেকর্ড ফাঁস এবং পুলিশের আটকের মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে। অনেকেই মনে করছেন, এই ঘটনা স্থানীয় সরকার ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার গুরুত্বকে আরও উজ্জ্বল করে তুলেছে।
